লোহিত সাগরের ঢেউয়ে দুলছে সৌদি নারীদের স্বপ্ন

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

লোহিত সাগরের উপকূলে ঢেউয়ের চেয়ে যেন স্বপ্নই বেশি উঁচু হয়ে ওঠে! সেখানে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে সৌদি নারীদের এক নতুন

2026-04-03T01:39:28+00:00
2026-04-03T01:40:01+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
বালুকাবেলা থেকে বিশ্বমঞ্চ
লোহিত সাগরের ঢেউয়ে দুলছে সৌদি নারীদের স্বপ্ন
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬, ১:৩৯ এএম  আপডেট: ০৩.০৪.২০২৬ ১:৪০ এএম
লামার আলকারনি। ছবি : সংগৃহীত
লোহিত সাগরের উপকূলে ঢেউয়ের চেয়ে যেন স্বপ্নই বেশি উঁচু হয়ে ওঠে! সেখানে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে সৌদি নারীদের এক নতুন পরিচয়। বিদেশি উপকূলে শেখা দক্ষতা, নিজেদের সংস্কৃতির ভেতর থেকে উঠে আসা সাহস, আর পরিবর্তনের এক অদৃশ্য স্রোত- সব মিলিয়ে তারা তৈরি করছেন এক অনন্য যাত্রাপথ। এটি শুধু খেলাধুলার গল্প নয়; এটি স্বাধীনতা, আত্মপরিচয় আর ভবিষ্যৎকে নতুন করে লেখার গল্প। এর সূচনা বালুকাবেলায়, কিন্তু তা প্রবহমান। ধীরে ধীরে যেন পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বমঞ্চে!

ভোরের সময়টায় সবকিছু একটু আলাদা লাগে। আলো পুরোপুরি ছড়ায় না, আবার অন্ধকারও থাকে না। এই সময়েই লোহিত সাগরের তীরে দেখা যায় একদল নারীকে। তারা দ্রুত হাতে বোর্ড নিয়ে প্রস্তুতি নেয়। কেউ বোর্ডে মোম লাগাচ্ছে, কেউ দড়ি ঠিক করছে। সবকিছু যেন এক অভ্যাস, এক ছন্দ। তারপর ধীরে ধীরে তারা জলের দিকে হাঁটে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই সমুদ্র সবসময় ঢেউ দেয় না। 

বছরের বেশিরভাগ সময়ই পানি শান্ত থাকে। এই উপকূল দীর্ঘদিন ধরে ডুবুরি আর নাবিকদের কাছে পরিচিত ছিল। কিন্তু সার্ফিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ঢেউ এখানে খুবই কম। তবু গত কয়েক বছরে কিছু মানুষ এই খেলাটিকে বেছে নিয়েছে। আর তাদের মধ্যেই আছে এই নারীরা।

তাদের অনেকেই দেশের বাইরে গিয়ে শিখেছে। কেউ বালি, কেউ শ্রীলঙ্কা, কেউ মরক্কো বা ফিলিপাইনে গিয়ে প্রথম ঢেউ ধরেছে। কেউ আবার ইউরোপের কৃত্রিম তরঙ্গ পুলে অনুশীলন করেছে। অন্য দেশে তারা শুধু খেলা শেখেনি, শিখেছে সংস্কৃতিও। 

ভোরে উঠে সমুদ্রে যাওয়া, নিয়ম মেনে লাইনে দাঁড়ানো, ঢেউয়ের ভাষা বোঝা; সবই তারা নিয়ে এসেছে নিজের দেশে। কিন্তু সৌদি আরবে গল্পটা উল্টোভাবে শুরু হয়েছে। এখানে আগে এসেছে সংস্কৃতি, পরে আসছে অবকাঠামো। ঢেউয়ের অভাব থাকলেও মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে আগে। তারপর ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে সেই পরিবেশ।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে আছে কয়েকজন নারী। তারা একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। একসঙ্গে গড়ে তুলেছে দেশের প্রথম সার্ফিং দল। ছোট একটি দল, কিন্তু তাদের প্রভাব বড়। তারা শুধু খেলোয়াড় নয়, এক ধরনের পথপ্রদর্শকও। 

লামার আলকারনি ও লায়লা জাহিদ বলেন, আগে এই খেলাটি অনেক দূরের কিছু মনে হতো। নিজের জীবনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই মনে হতো। কিন্তু যখন তারা একে অপরকে খুঁজে পেল, তখন সেই দূরত্ব কমে গেল। এখন তারা শুধু ঢেউ ধরছে না, বরং অন্যদের জন্য দরজা খুলে দিচ্ছে।

সার্ফিং এমন একটি খেলা, যেখানে শুধু প্রতিযোগিতা নয়, সংস্কৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। পোশাক, জীবনযাপন, ভাবনা- সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি আলাদা জগৎ। এই জগৎ এখন সৌদি আরবে নতুনভাবে গড়ে উঠছে। এখানে স্থানীয় মূল্যবোধের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে এই সংস্কৃতি। 

অতিথিপরায়ণতা, একসঙ্গে থাকার অনুভূতি- এসবই নতুনভাবে প্রকাশ পাচ্ছে জলের ওপর। দেশটির দীর্ঘ উপকূল থাকলেও নিয়মিত ঢেউ খুব কম জায়গায় পাওয়া যায়। এই সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিন ধরে এই খেলাটিকে পিছিয়ে রেখেছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। নতুন কৃত্রিম তরঙ্গ কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে, যেখানে নিয়ন্ত্রিতভাবে ঢেউ তৈরি করা যায়। এর ফলে নতুনরা সহজে শিখতে পারছে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মানুষের ভেতরে। লামার আলকারনি বলেন, তিনি যখন প্রতিযোগিতায় অংশ নেন, তখন তিনি শুধু নিজেকে নয়, পুরো দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন। তার পোশাক, তার উপস্থিতি- সবকিছু মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনেকেই জানতে চায়, কীভাবে তিনি এই খেলাটি করছেন। 

লায়লা জাহিদ বলেন, তাদের দেশে এই খেলাটির জন্য একটি আরবি শব্দ আছে, কিন্তু খুব কম মানুষ তা জানে। তাই তাকে প্রায়ই বুঝিয়ে বলতে হয়- তিনি ঢেউয়ের ওপর চলেন। এই ব্যাখ্যা দিতে তার ভালো লাগে। কারণ এর মাধ্যমে তিনি নতুন মানুষকে এই জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। এই দৃশ্যমানতা অন্যদের জন্য পথ খুলে দিচ্ছে। অনেক মেয়ে এখন এই খেলায় আগ্রহ দেখাচ্ছে। কেউ কেউ পরিবারের অনুমতিও পাচ্ছে, যা আগে কল্পনাও করা যেত না। লামার আলকারনি বলেন, তিনি প্রায়ই বার্তা পান- অনেক মেয়ে তার মতো হতে চায়।

এই পরিবর্তন শুধু খেলাধুলায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি এক ধরনের সামাজিক পরিবর্তনও। রমাস আলহাজমি বলেন, তিনি যখন নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দেন, তখন মনে হয় তিনি এমন কিছু করছেন, যা তার আগের প্রজন্ম করতে পারেনি। তার কাছে এটি শুধু খেলা নয়, বরং একটি দায়িত্ব। তারা জানে, এই পথ সহজ নয়। 

কিন্তু তারা এটাও জানে, এই পথেই নতুন কিছু তৈরি হবে। তাদের লক্ষ্য শুধু পদক জেতা নয়। বরং তারা চায়, এই যাত্রায় তারা নতুন পথ তৈরি করুক। এখন তারা বড় প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের তুলে ধরবে। এর জন্য কঠোর অনুশীলন চলছে। নতুন অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, সুযোগ বাড়ছে।

লায়লা জাহিদ বলেন, সমুদ্রে নামলে মনে হয়, আপনি নিজের চেয়ে বড় কিছুর অংশ। সমুদ্র আপনাকে সহজে কিছু দেয় না। আপনাকে তা অর্জন করতে হয়।

প্রতিটি সংস্কৃতিরই একটা শুরু থাকে। ছোট একটি দল, যারা প্রথম এগিয়ে যায়। সৌদি আরবের এই নারীরাও তেমনই। তারা প্রথম ঢেউ ধরেছে, যখন বাকিরা এখনও অপেক্ষায়। সমুদ্রের ওপর ছোট একটি ঢেউ উঠছে। তারা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হয়তো ঢেউটি বড় নয়, কিন্তু এর ভেতরেই আছে এক নতুন ইতিহাসের শুরু।

সময়ের আলো/কেএইচও 


  বিষয়:   বালুকাবেলা  বিশ্বমঞ্চ  লোহিত সাগর  ঢেউ  সৌদি নারী  স্বপ্ন 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: