হাসান হাফিজুর রহমান স্বতন্ত্র আলোর উজ্জ্বল মুখ

ফরিদ আহমদ দুলাল

সাহিত্য

এ বঙ্গে পঞ্চাশ দশকের কবিতা নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। যারা পঞ্চাশের কবি তাদের সবারই জন্ম ১৯৪৭-এর আগে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রের জন্মের

2026-04-03T12:27:21+00:00
2026-04-03T12:27:21+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
হাসান হাফিজুর রহমান স্বতন্ত্র আলোর উজ্জ্বল মুখ
ফরিদ আহমদ দুলাল
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:২৭ পিএম 
হাসান হাফিজুর রহমান স্বতন্ত্র আলোর উজ্জ্বল মুখ। ছবি : সংগৃহীত
এ বঙ্গে পঞ্চাশ দশকের কবিতা নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। যারা পঞ্চাশের কবি তাদের সবারই জন্ম ১৯৪৭-এর আগে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রের জন্মের পূর্বে; সংগত কারণেই তাদের মননে পাকিস্তান জন্মের ডামাডোল প্রভাব বিস্তার করার কথা। অন্যদিকে পাকিস্তান জন্মের পরই আশাহত বাঙালি ভাষার প্রশ্নে দ্রোহী হয়ে ওঠে, সে চেতনার সঙ্গে একীভূত হওয়ার স্পর্ধা ধারণ পঞ্চাশের কবিদের ব্রত হওয়ার সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা তাদের করেছে সংশপ্তক। স্বস্তির কথা আমাদের পঞ্চাশের কবিদের প্রায় সবাই যুক্ত হয়েছিলেন ভাষা আন্দোলন এবং আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে।

এ সত্যের কথা মনে করে আজ আমরা অহংকার করতে পারি; কারণ ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকেই অঙ্কুরিত হয়েছিল বাঙালির স্বশাসিত হওয়ার আকাক্সক্ষা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় আমাদের পঞ্চাশের কবিদের দুয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই ভাষা আন্দোলন থেকে বাঙালির প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেদের সম্পৃক্ত রেখেছেন। বাঙালির সেসব আন্দোলন-সংগ্রামে কবিদের মধ্যে যারা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন তাদেরই পুরোধা ব্যক্তিত্ব হাসান হাফিজুর রহমানকে নিয়েই আমার আলোচনা। যৌবনে হাসান হাফিজুর রহমান ‘একুশের কবিতা’ সংকলনের সম্পাদনা থেকে শুরু করে পরিণত বয়সে মহান ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলপত্র’ সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব পালন করে স্মরণীয় হয়েছেন। ১৯৫৩-তে প্রকাশিত মহান একুশের প্রথম কবিতা সংকলনে হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় পত্রস্থ হয়েছেন এ বাংলার পঞ্চাশের কবিদের প্রায় সবাই এবং গৌরবের কথা, তাদের সেসব কবিতার সবই প্রায় ছিল বহুল পঠিত এবং সমাদৃত। সহজেই আমরা স্মরণ করতে পারি আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ প্রমুখের কথা যাদের একুশের কবিতা বছরের পর বছর ধরে ছেলেমেয়েরা আবৃত্তি করে একুশের চেতনাকে উজ্জীবিত রেখেছে; সে তালিকায় হাসান হাফিজুর রহমানের একটি কবিতা আছে। যে কারণে হাসান হাফিজুর রহমান কিশোর বয়স থেকেই আমাদের স্বপ্নের কবি হয়ে আছেন। এ সুযোগে আমরা তার সে কবিতাটির কয়েকটি পঙ্ক্তি পাঠ করে নিতে পারি-
আম্মা তার নামটি ধরে একবারও ডাকবে না তবে আর
ঘূর্ণিঝড়ের মতো সেই নাম উন্মথিত মনের প্রান্তরে
ঘুরে ঘুরে জাগবে, ডাকবে,
দুটি ঠোঁটের ভেতর থেকে মুক্তোর মতো গড়িয়ে এসে
একবারও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে না, সারাটি জীবনেও না? তবে হার?
কী করে এই গুরুভার সইবে তুমি, কতদিন?
আবুল বরকত নেই : সেই অস্বাভাবিক বেড়ে ওঠা
বিশাল শরীর বালক, মধুর স্টলের ছাদ ছুঁয়ে 
হাঁটত যে
তাকে ডেকো না;
আর একবার ডাকলে ঘৃণায় তুমি কুঁচকে উঠবে;
সালাম, রফিক উদ্দিন, জব্বার কী বিষণ্ন থোকা থোকা নাম;

(অমর একুশে॥ হাসান হাফিজুর রহমান)

পঞ্চাশের সেই তরুণ বয়স থেকেই হাসান হাফিজুর রহমান হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গজনপদের কাব্য আন্দোলন এবং কবিকুলের পুরোধা পুরুষ।

হাসান হাফিজুর রহমানের জন্ম বৃহত্তর ময়মনসিংহের জামালপুর জেলার কুলকান্দি গ্রামের মাতুলালয়ে। কবি-সাংবাদিক-সমালোচক হাসান হাফিজুর রহমানের পেশাগত জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়; ‘সাপ্তাহিক বেগম’ পত্রিকা থেকে শুরু করে দৈনিক পাকিস্তানের সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে দৈনিক বাংলায় সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি নিযুক্ত হন। এসব প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দায়িত্বের বাইরে তিনি প্রথম একুশের কবিতা সংকলনসহ সাহিত্যের বেশ কিছু কাগজ সম্পাদনা করেন এবং সম্পাদনা কাজের মাধ্যমে তিনি পরবর্তী প্রজন্মের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কবিকে কবিতায় ব্রতী করে তোলেন; আমার বিশ্বাস সম্পাদনা কাজের মাধ্যমে নিজেকে তিনি ‘আইকনিক’ উচ্চতায় নিয়ে যান। পরবর্তীকালে যখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও দলিল সম্পাদনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন, তাকে নিয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করার স্পর্ধা দেখাননি এবং সে কাজে তার যে নিষ্ঠা এবং মনোযোগ, তা-ই তাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখেছে।

জীবনানন্দ দাশের মতো অন্তর্মুখী স্বভাবের না হলেও হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন প্রধানত বিষাদের কবি; জীবনের গভীরতম বিষাদের কথা উচ্চারণ করেছেন তিনি তার কবিতায়। সজ্জন কবি কখনো তার কবিতায় হঠকারী হয়ে ওঠেননি; কিন্তু নিজস্ব বেদনার কথাটি উচ্চারণ করেছেন গভীর মমতায়। হাসান হাফিজুর রহমানের তেমনি এক বিরহ এবং মনস্তাপের কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি নিচে উচ্চারণ করতে চাই-
একদিন ভালোবাসা ছিল, কণ্ঠে
হৃদপিণ্ডের দুন্দুভি ছিল, ঐক্যতানে
উঠেছি বেজে ‘স্বাধীনতা স্বাধীনতা’ বলে,
তরঙ্গে হয়েছি খলখল ‘দেশ দেশ’ শব্দের করতালে,
ছিল ক্রোধ, ছিল ঘৃণা, ছিল প্রতিরোধ, বিদ্বেষ,
ভালোবাসা ছিল ভয়ানক আক্রোশ ছিল,
ভালোবাসা ছিল, ঈর্ষা ছিল, রক্ত ছিল দারুণ খরতাজ;
ভুল ছিল কান্না ছিল তবু তীরের মতো শরীর ছিল ভীষণ লক্ষ্যমুখী
আজ ক্রোধ নেই ক্ষোভ নেই
ঘরহারা লক্ষজন পথের ওপর উঠে আসে, 
আজ তাতে
বিকার নেই মাছির মতো মানুষ মরে যায়, 
আজ তার
দুর্গন্ধ নেই, প্রতিরোধ নেই,
পিঠের ওপর পায়ের দাগ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়,
শরীরে রিরি নেই, আজ অপমানে লাঞ্ছনা নেই...

(আজ ভালোবাসা নেই॥ হাসান হাফিজুর রহমান)

স্বল্পবাক, মৃদু কণ্ঠের বিষণ্ন কবি হাসান হাফিজুর রহমান কবিতায় বিষাদ ছড়িয়েও ভেতর থেকে আদর্শ এবং চেতনায় দৃঢ়চিত্ত, তা আমরা প্রত্যক্ষ করি তার কর্মকুশলতায় এবং কোনো কোনো কবিতায়; দৃঢ়চিত্ত না হলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও দলিল সম্পাদনার মতো স্পর্শকাতর একটি কাজ বিপক্ষ স্রোতে দাঁড়িয়ে বাস্তবায়ন করতে পারতেন না। ব্যক্তিগত জীবনে সবার সঙ্গে আমিও তার ‘অমর একুশে’ কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি; কিন্তু তার ‘আমার ভেতরের বাঘ’ নামের কিঞ্চিত দীর্ঘ কবিতাটি আমাকে কবির প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে; যত দূর মনে পড়ছে এক-ই শিরোনামে তার একটি কাব্যগ্রন্থ আছে, যা একসময় আমার নিয়মিত পাঠ্যসূচিতে ছিল; দুঃখের কথা নিজস্ব সংগ্রহশালা থেকে আজ আর বইটি উদ্ধার করা গেল না! তাই বিকল্প ব্যবস্থায় কবিতাটি সংগ্রহ করে নিচে তা থেকে কতিপয় পঙ্ক্তি উপস্থাপন করছি-
আমাকে বলেছিলাম, ধ্বনি হ’য়ে যা,
গাছের শরীর থেকে পাতা-পতনের যে শব্দ ঝরে
সেই অস্ফুটকেও টঙ্কার করে তোল,
আমাকে বলেছিলাম, স্রোত হ’য়ে যা,
লক্ষকোটি তরঙ্গের গতি শুষে নিয়ে ফুলে ওঠ তুই।


আমাকে বলেছিলাম, তুই গান হ’য়ে যা, তুই সংগ্রাম হ’য়ে যা, তুই আনন্দ হ’য়ে যা।
যত সুন্দর তুই খুঁজে পেতে নিয়ে আয় এক ঘরে।
পৃথিবীতে এত পাতা ঝরে, এত স্রোত নদী ও নালাতে
তবু ‘শব্দ কই, শব্দ কই’ বলে শয্যা ছেড়ে ছটফট
উঠি মধ্যরাতে, কখনো বা আকুল দুহাতে
দেয়াল হাতড়ে বলি, ‘পথ দাও, পথ দাও’ যাবো
নরম জোছনার ঘরে, যাবো দারুণ রৌদ্রের কলস্বরে,
যতদূর ইচ্ছে হয় যাবো দূর-দূরান্তরে।

(আমার ভেতরের বাঘ॥ হাসান হাফিজুর রহসান)

বাঙালির ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, দুর্যোগ থেকে সংগ্রাম প্রতিটি পর্যায়ে যিনি জাতির পাশে থেকে চেতনার বাতি জ্বালিয়ে রাখতে সাহস জুগিয়েছেন, তিনি হাসান হাফিজুর রহমান। তিনি কেবল নিজেকে নিজের কর্মে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিতই করেননি; বরং নিজের নিষ্ঠা ও যোগ্যতায় আমাদের পথ দেখিয়ে গেছেন; তার দেখানো পথেই আমরা তাকে দশক থেকে দশকের মাঠে আবিষ্কার করেছি। তার সময়ের অন্য পাঁচজন প্রমুখ কবির পাশে তাকে দাঁড় করিয়ে স্বতন্ত্র আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখেছি বারবার।

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   হাসান হাফিজুর রহমান  কবিতা  কবি  সাহিত্য  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: