গ্রীষ্মের তীব্র প্রবাহে দেশে দিন দিন বাড়ছে তাপমাত্রা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতি বছরই তাপপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র হচ্ছে। এর ফলে ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, ক্লান্তি- এসব সাধারণ সমস্যার পাশাপাশি সবচেয়ে মারাত্মক ঝুঁকি হয়ে উঠছে হিটস্ট্রোক। সময়মতো সচেতনতা না থাকলে এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে। তাই হিটস্ট্রোক সম্পর্কে সঠিক ধারণা, ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী, লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায় জানা অত্যন্ত জরুরি।
হিটস্ট্রোক কী?
হিটস্ট্রোক হলো একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত অবস্থা, যখন শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে ৪০ সিলসিয়াস বা তার বেশি হয়ে যায় এবং শরীর নিজে থেকে তাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। এ অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা না দিলে মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, কিডনি ও পেশিতে গুরুতর ক্ষতি হতে পারে।
হিটস্ট্রোকের পরিসংখ্যান
প্রতি বছর বিশ্বে তাপপ্রবাহের কারণে হাজার হাজার মানুষ অসুস্থ হয়, যার একটি বড় অংশ হিটস্ট্রোক। গবেষণায় দেখা যায়, পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ, কারণ তারা বেশি সময় বাইরে কাজ করে।
নারীদের আক্রান্তের হার প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ, তবে গর্ভবতী ও গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত নারীরা ঝুঁকিতে থাকেন।
শিশুদের মধ্যে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ, কারণ তাদের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিকশিত নয়।
বয়স্কদের (৬০+) মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি, মোট মৃত্যুর প্রায় ৫০ শতাংশ এই বয়সিদের মধ্যে ঘটে। তাপপ্রবাহের সময় হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ২০-৩০ শতাংশ তাপজনিত অসুস্থতায় ভোগেন।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে (বাংলাদেশসহ) গ্রীষ্মকালে হিটস্ট্রোকের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
হিটস্ট্রোকের কারণ
হিটস্ট্রোক সাধারণত কয়েকটি কারণে হয়ে থাকে- অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও তাপপ্রবাহ, দীর্ঘ সময় রোদে থাকা বা কাজ করা, পর্যাপ্ত পানি পান না করা (ডিহাইড্রেশন), ভারী বা আঁটসাঁট পোশাক পরা, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম, বদ্ধ ও গরম পরিবেশে অবস্থান, শিশু ও বয়স্কদের দুর্বল তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ।
হিটস্ট্রোকের প্রকারভেদ
ক্লাসিক্যাল হিটস্ট্রোক : বয়স্ক, শিশু বা অসুস্থ ব্যক্তিদের বেশি হয় , দীর্ঘ সময় গরম পরিবেশে থাকার ফলে ঘটে ।
এক্সটারশনাল হিটস্ট্রোক : যারা কঠোর শারীরিক
পরিশ্রম করেন, অল্প সময়ের মধ্যেই শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়।
হিটস্ট্রোকের লক্ষণ
শরীরের তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে যাওয়া, ত্বক গরম ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা ও ঝিমঝিমভাব, বমি বা বমি বমিভাব, দ্রুত হৃদস্পন্দন, শ্বাস নিতে কষ্ট, পেশিতে খিঁচুনি বা দুর্বলতা, বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া । জটিলতা মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, কিডনি বিকল হওয়া, লিভারের ক্ষতি, পেশি ভেঙে যাওয়া। এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
প্রাথমিক করণীয়
রোগীকে দ্রুত ছায়াযুক্ত বা ঠান্ডা স্থানে নিয়ে যান, কাপড় ঢিলা করে দিন, ঠান্ডা পানি বা ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছুন, মাথা, বগল ও কুঁচকিতে ঠান্ডা সেঁক দিন, রোগী সচেতন থাকলে পানি বা স্যালাইন দিন, দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
ঘরোয়া প্রতিরোধমূলক পরামর্শ
পর্যাপ্ত পানি পান, দিনে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন, ডাবের পানি, লেবুর শরবত, তেঁতুলের শরবত গ্রহণ করুন।
প্রাকৃতিক পানীয় গ্রহণ কাঁচা আমের শরবত, লেবু-পুদিনা পানি, মাঠা বা দই, আখের শরবত।
খাদ্যাভ্যাসে সতর্কতা
তেল-চর্বিযুক্ত খাবার কম খান, ফাস্টফুড ও স্ট্রিট ফুড এড়িয়ে চলুন, হালকা ও সহজপাচ্য খাবার খান।
পোশাক নির্বাচন ঢিলেঢালা ও হালকা রঙের পোশাক পরুন, সুতি কাপড় ব্যবহার করুন। বাইরে চলাচলে সতর্কতা, দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টার মধ্যে বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলুন। ছাতা, ক্যাপ বা সানগ্লাস ব্যবহার করুন।
শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ যত্ন
রোদে বেশি সময় থাকতে দেবেন না, নিয়মিত পানি পান করান, অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
যা এড়িয়ে চলবেন
অতিরিক্ত সফট ড্রিঙ্কস বা কোল্ড ড্রিঙ্কস, অপরিষ্কার বা দূষিত পানি, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম, দীর্ঘ সময় রোদে থাকা, ভুলভাবে স্যালাইন গ্রহণ।
সচেতনতার গুরুত্ব
হিটস্ট্রোক সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য একটি সমস্যা। সামান্য সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের মাধ্যমে এর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের প্রতি বাড়তি নজর দেওয়া জরুরি।
হোমিও সমাধান-হোমিওপ্যাথির মূলনীতি হলো- ‘রোগ নয়, রোগীর চিকিৎসা করা হয়।’ তাই হিটস্ট্রোকের ক্ষেত্রে কেবল রোগের নাম দেখে নয়, বরং রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ, শারীরিক অবস্থা, মানসিক উপসর্গ এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। এ
কজন অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক যদি সঠিকভাবে রোগীর পূর্ণাঙ্গ লক্ষণসমষ্টি নির্বাচন করতে পারেন, তা হলে আল্লাহর রহমতে হোমিওপ্যাথিতে ভালো ফলাফল পাওয়া সম্ভব।
হিটস্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে যেসব হোমিওপ্যাথিক ওষুধ লক্ষণ অনুযায়ী বিবেচনা করা হয়ে থাকে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বেলেডোনা, গ্লোনিয়ম, আর্সেনিক অ্যালবাম, ব্রায়োনিয়া, ক্যালকেরিয়া কার্ব, ক্যালকেরিয়া সালফ, ডালকামারা, হিপার সালফ, কালি আয়োড, মার্কিউরাস সলিউবিলিস, চায়না, ন্যাট্রাম মিউর, জেলসেমিয়াম, ন্যাট্রাম সালফ এবং নাক্স ভমিকা প্রভৃতি। তবে এসব ওষুধের প্রয়োগ সম্পূর্ণই রোগীর লক্ষণভিত্তিক। তাই সবার ক্ষেত্রে একই ওষুধ প্রযোজ্য নয়।
অতএব, নিজে নিজে ওষুধ সেবন না করে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। এতে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে। বর্তমান সময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হিটস্ট্রোক একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে।
তাই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ- সবস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় চিকিৎসা। সঠিক অভ্যাস ও সচেতনতার মাধ্যমে আমরা নিজেদের এবং প্রিয়জনদের এই মারাত্মক ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারি।
লেখক ও গবেষক
সময়ের আলো/আআ