ইরান-ইসরাইল সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলপিজি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। তার প্রভাব থেকে আমরাও মুক্ত নই। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে রান্নার কাজে গ্যাস, বিদ্যুৎ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু সম্প্রতি এই জ্বলজ্বলে অঙ্গগুলোই যেন অন্ধকারে ডুবে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক দামের বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গভীর উদ্বেগের কারণ।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- এলপিজির অপ্রতিরোধ্য মূল্যবৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রায় মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলছে। বাধ্য হয়ে অনেক গৃহিণী ইনডাকশন চুলা কিনছেন, কিন্তু এর ফলে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল, রান্নার সময়ের ব্যয় ও নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়ে গেছে। সাধারণ মানুষ যেমন রান্নার জন্য আগের চেয়ে বেশি খরচ করছে, তেমনি তাদের জীবনযাত্রার মানও ব্যাহত হচ্ছে। বাজারে সিলিন্ডারের দাম আকাশচুম্বী, অথচ সরকারি দামের সঙ্গে বাস্তব দামের বিস্তর ফারাক। ফলে ভোক্তারা পড়েছে অসহনীয় পরিস্থিতিতে।
অপরদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন-বিউটেনের দাম বৃদ্ধির প্রভাব দেশে এসে পড়েছে সরাসরি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন কম, ফলে আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি ও পরিবহন ব্যয়ের জন্য আন্তর্জাতিক দামে অস্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে দেশের বাজারে এলপিজির দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাচ্ছে। তবে বাজারে সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই বলে দাবি করলেও, দাম বাড়ার পেছনে তদারকির অভাব বড় কারণ।
সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তৎপরতা প্রয়োজন। এ বিষয়ে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমতুল্লাহ যেমন বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও তদারকি থাকলে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। অন্যদিকে ভোক্তাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে, কারণ তারা দেখতে পাচ্ছে, বাজারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতাদেরও অভিযোগ, তারা বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছে, তাই কম দামে বিক্রি করতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ নানা উপায় খুঁজছে- কেউ রান্নার গতি কমিয়ে দিচ্ছে, কেউ বিকল্প হিসেবে ইনডাকশন চুলায় ঝুঁকছে।
এই অস্থিরতা কতটুকু স্থায়ী হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আমাদের জন্য প্রয়োজন এ অস্থিরতা মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা থাকলেও, দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ও তদারকির ক্ষেত্রে দক্ষতা ও সমন্বয় বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে দাম নিয়ন্ত্রণে কঠোর মনিটরিং ও আইনশৃঙ্খলা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনার দিকে মনোযোগী হতে হবে।
সর্বোপরি এই সংকটময় পরিস্থিতি আমাদের ভাবতে হবে, স্বাধীন ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ছাড়া স্বস্তি আসবে না। দেশের উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক পরিকল্পনা, সুদৃঢ় মনিটরিং এবং জনগণের স্বার্থে কার্যকর পদক্ষেপ। না হলে এই জ্বলজ্বলে আলোই যেন অন্ধকারে পরিণত হতে বাধ্য। এ সমস্যা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ যে শুধু আমাদের জ্বালানি সংকটকে ব্যাহত করেছে, তা নয়; বিশ্বজুড়ে এর প্রভাব পড়েছে।
এদিক বিবেচনায় এনে যত শিগগির আন্তর্জাতিকভাবে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগোনো যায় ততই দেশের জন্য মঙ্গল। নতুন সরকারকে এ ব্যাপারে তীক্ষè দৃষ্টি রাখতে হবে। আপাতত দেশীয় বাজারের ওপর কঠিন নজরদারি দরকার। যাতে মজুদ এলপিজি গ্যাসের দাম নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের আর্থিক মুনাফা লুটতে না পারে। তা হলে হয়তো রান্নাঘরের আঁচ কিছুটা কমতে পারে। জনজীবনে স্থিরতা ফিরে আসুক- এটাই সবার প্রত্যাশা।
সময়ের আলো/আআ