ষোড়শ শতাব্দীর কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী লিখেছিলেন, ‘ধন্য ধন্য কলিযুগে নদের গঠন।’ নদীমাতৃক এই বদ্বীপের ধমনি হলো তার খাল-বিল। ২০২৬ সালের বাংলাদেশে ইতিহাসে এক নবদিগন্তের সূচনা হলো- যখন আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণাকে পাথেয় করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেতা তারেক রহমান তার পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন।
এই উদ্যোগ কেবল একটি খননকাজ নয়, বরং এটি মৃতপ্রায় জলপথের হৃৎপিণ্ডে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস প্রদানের মাধ্যমে একটি জাতির পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক পুনর্জন্মের মহাপ্রয়াস। বিজ্ঞানের নিরিখে এই মহাযজ্ঞের গভীরতা অপরিসীম, যা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই বাস্তুসংস্থান নিশ্চিত করার অঙ্গীকার বহন করে।
জলবিদ্যার সূত্রানুসারে একটি খালের প্রধান কাজ হলো- ভূ-উপরিস্থ পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা। বর্তমানে বাংলাদেশের খালগুলো পলি জমে এবং অবৈধ দখলে সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় পানির স্বাভাবিক সঞ্চালন ব্যাহত হচ্ছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খননের মাধ্যমে খালের গভীরতা ও প্রশস্ততা বৃদ্ধি করলে পানির ধারণক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি কেবল বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির চাপ সামাল দেয় না, বরং শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ কমিয়ে এক ধরনের হাইড্রোলজিক্যাল ভারসাম্য বজায় রাখে।
পরিবেশ বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস’। যখন একটি খাল তার নাব্যতা ফিরে পায়, তখন সেখানে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের একটি সুশৃঙ্খল আবাসস্থল তৈরি হয়। মৎস্যশূন্য জলাধারগুলো পুনরায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, যা স্থানীয় পুষ্টিচক্রকে সচল রাখে। জীবনানন্দ দাশের ভাষায়, ‘আবার আসিব ফিরে
ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায়’- এই আকুলতা বাস্তবে রূপ পায় তখনই, যখন জীববৈচিত্র্য তার হারানো নীড় খুঁজে পায়। খালের স্বচ্ছ পানি ও চারপাশের বনায়ন বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কৃষি বিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে খাল খনন হলো উর্বরতার চাবিকাঠি। পলিমুক্ত খালগুলো যখন সেচের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়ায়, তখন রাসায়নিক সার ও পাম্পনির্ভর সেচের প্রয়োজন কমে আসে।
খালের তলদেশের পলি মাটিতে মিশে গিয়ে মাটির পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি করে। এতে খরার প্রকোপ কমে এবং ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি পায়। বিকল্প সেচ ব্যবস্থার এই বৈজ্ঞানিক সংস্থান গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্বয়ম্ভর করে তোলে, যা টেকসই উন্নয়নের অন্যতম লক্ষ্য।’
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি হলো মহামারির আঁতুড়ঘর। প্রবাহহীন খালে কচুরিপানা ও বর্জ্য জমে যে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়, তা বায়ু দূষণের কারণ। খননের ফলে পানির গতিশীলতা ফিরে এলে প্রাকৃতিক ‘সেলফ-পিউরিফিকেশন’ বা স্বতঃশোধন প্রক্রিয়ায় পানি পরিষ্কার থাকে। এটি জলবাহিত রোগের প্রকোপ কমিয়ে জনস্বাস্থ্যের মানোন্নয়ন ঘটায়। পরিচ্ছন্ন জলরাশি দেখে রবীন্দ্রনাথের সেই পঙক্তি মনে পড়ে, ‘স্বচ্ছ সলিল শান্ত অতি, স্নিগ্ধ সুধা সম।’
ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। খাল খননের ফলে মাটির ভেতরে পানির অনুস্রবণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়, যা ভূগর্ভস্থ একুইফার রিচার্জ করতে সাহায্য করে। এটি দীর্ঘমেয়াদে মরুকরণ প্রক্রিয়া রোধে এক শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। পানির এই আধারগুলো ভবিষ্যতের পানি নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে বিবেচিত।
নৌপথের উন্নয়ন কেবল যাতায়াত নয়, বরং লজিস্টিক সায়েন্সের অংশ। সড়কপথের তুলনায় নৌপথে পণ্য পরিবহন অনেক বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। খালগুলোর নেটওয়ার্ক পুনরায় জালের মতো বিস্তৃত হলে গ্রামীণ পণ্য সরাসরি নগরে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এটি কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানে খাল খননকে ‘অ্যাডাপ্টেশন স্ট্র্যাটেজি’ হিসেবে দেখা হয়। আকস্মিক বন্যা বা ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’ মোকাবিলায় গভীর খালগুলো ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে। শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে এবং বন্যার প্রকোপ কমাতে এই জলপথগুলো প্রাকৃতিক বাফার হিসেবে কাজ করে, যা জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে কমিয়ে দেয়।
খনন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা একটি বিশেষায়িত ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞান। অতীতে ‘খাল শেপ’ করার নামে যে দুর্নীতি হয়েছে, তা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ছিল এক চরম কারিগরি অপচয়। আধুনিক প্রযুক্তির জিপিএস ম্যাপিং এবং ড্রোন সার্ভের মাধ্যমে এখন খালের আদি সীমানা নির্ধারণ করা সম্ভব। দুর্নীতিমুক্ত তদারকির মাধ্যমে প্রকৌশলগত মান বজায় রাখলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।
গবাদিপশুর পানীয়জলের সংস্থান এবং গ্রামীণ গৃহস্থালি কাজে খালের পানির ব্যবহার গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘রুরাল লাইভলিহুড সিকিউরিটি’। দূষণমুক্ত স্বচ্ছ পানি যখন গৃহস্থালির প্রয়োজনে সহজলভ্য হয়, তখন গ্রামীণ নারীদের জীবনমান উন্নত হয় এবং শ্রমের সাশ্রয় ঘটে। এটি সামাজিকবিজ্ঞানের একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।
বনায়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় খাল খনন কর্মসূচির সঙ্গে বৃক্ষরোপণ অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। খালের পাড়ে লাগানো গাছগুলো মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং স্থানীয় জলবায়ুকে শীতল রাখে। গাছের শিকড় মাটির গঠন মজবুত করে, যা পাড় ধসে পড়া রোধ করে। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় প্রাকৃতিক প্রকৌশল ব্যবস্থা, যা বছরের পর বছর খালকে কর্মক্ষম রাখে।
পলি অপসারণ কেবল গভীরতা বাড়ায় না, এটি মাটির ভৌত ও রাসায়নিক গুণাগুণ বিশ্লেষণেও সহায়তা করে। খালের তলদেশ থেকে উত্তোলিত মাটি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে নিচু জমি ভরাট বা বাঁধ নির্মাণ করা যায়। এটি ভূমি ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানের একটি অংশ, যা সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে খালের গুরুত্ব অপরিসীম। পরিযায়ী পাখি থেকে শুরু করে বিরল প্রজাতির মাছ- সবার জন্যই পানির প্রবাহ অপরিহার্য। যখন একটি খাল তার অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, তখন পুরো খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। বৈজ্ঞানিক খনন এই শৃঙ্খলকে পুনরায় জোড়া লাগিয়ে প্রকৃতির হারানো সুর ফিরিয়ে আনে। শেখ সাদীর উপমায় বলতে গেলে,
‘প্রকৃতি হলো আল্লাহর আয়না,’ আর সেই আয়নাকে ধুলোমুক্ত করাই এই খনন কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
অস্তিত্ব সংকটে পড়া খালগুলোকে উদ্ধার করা একটি দেশপ্রেমিক দায়িত্ব। বিজ্ঞান বলে, যে জাতি তার প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে পারে না, তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগ কেবল মাটির কর্তন নয়, বরং এটি একটি জাতির শিকড়ের অনুসন্ধান। প্রতিটি কোদালের কোপ যেন দুর্নীতির দেয়াল ভেঙে স্বচ্ছতার এক নতুন ইতিহাস রচনা করে।
পানির আধার তৈরি করার মাধ্যমে আমরা মূলত একটি ‘ওয়াটার ব্যাংক’ তৈরি করছি। ভবিষ্যতের যুদ্ধে পানি হবে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
বিজ্ঞানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সুপেয় পানির সংকট চরমে পৌঁছাবে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের খাল খনন কর্মসূচি একটি দূরদর্শী বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত, যা আমাদের পানিনির্ভর সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে। জলাভূমি সংকোচন রোধ করার মাধ্যমে আমরা মূলত আমাদের ফুসফুসকে রক্ষা করছি। প্রতিটি ভরাট হওয়া খাল ছিল এক একটি রুদ্ধশ্বাস ইতিহাস। আজ সেই রুদ্ধশ্বাস অবস্থা থেকে মুক্তির দিন। বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ১-২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে।
দুর্নীতিমুক্ত প্রকল্প বাস্তবায়নই বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ নৈতিকতা। যখন প্রকৌশলবিদ্যা ও দেশপ্রেম একীভূত হয়, তখন আর কোনো খাল ‘শেপ’ করে অর্থ আত্মসাৎ করা সম্ভব হয় না। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই কর্মসূচি একটি আদর্শ মডেলে পরিণত হতে পারে, যা বিশ্বের অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অনুকরণীয় হবে।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এই মহতী উদ্যোগ বাংলাদেশের মানচিত্রকে পুনরায় সবুজ-শ্যামলে ভরিয়ে তুলবে। বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা- সেটি পরিবেশ হোক, কৃষি হোক বা অর্থনীতি- এই খাল খননের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। তারেক রহমানের এই সাহসী পদক্ষেপ কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি একটি বিজ্ঞানমনস্ক জাতির বাঁচার লড়াই। কাজী নজরুলের ভাষায়, ‘মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত, আমি সেই দিন হব শান্ত’- যেদিন বাংলার প্রতিটি খাল তার স্বচ্ছ সলিল নিয়ে কলকল ধ্বনিতে বয়ে চলবে। এই প্রকল্প সফল হোক, দুর্নীতিমুক্ত হোক এবং বাংলাদেশের প্রতিটি ধমনি পুনরায় সচল হয়ে উঠুক- এটাই আজকের প্রত্যাশা।
প্রাবন্ধিক
সময়ের আলো/ আআ