যুবশক্তির কর্মসংস্থানেই বদলাবে বাংলাদেশ

অঞ্জন মজুমদার

মতামত

বাংলাদেশ আজ এমন একটি জনসংখ্যাগত পর্যায়ে অবস্থান করছে, যেখানে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বাস্তবায়নের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের

2026-04-06T06:18:32+00:00
2026-04-06T06:18:32+00:00
 
  শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
মতামত
যুবশক্তির কর্মসংস্থানেই বদলাবে বাংলাদেশ
অঞ্জন মজুমদার
প্রকাশ: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:১৮ এএম   (ভিজিট : ৫৯)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বাংলাদেশ আজ এমন একটি জনসংখ্যাগত পর্যায়ে অবস্থান করছে, যেখানে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বাস্তবায়নের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি, আশার দিক হলোÑ যার মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ কর্মক্ষম বয়সের (১৫-৬৪ বছর) মানুষ এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ (১৫-৩৫ বছর), এই বিপুল যুবশক্তি যদি সঠিকভাবে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদে ত্বরান্বিত করতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬-৭ শতাংশ এর মধ্যে থাকলেও দক্ষ মানব সম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে এটি আরও উচ্চমাত্রায় উন্নীত করা সম্ভব।

বাংলাদেশের যুবসমাজ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ কর্মীর একটি বড় অংশ তরুণ, যা দেশের মোট রফতানির প্রায় ৮০ শতাংশ জোগান দেয়। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রায় ৬-৭ লাখ ফ্রিল্যান্সার কাজ করছে, যেখানে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ ফ্রিল্যান্সিং দেশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। কৃষি খাতেও নতুন প্রজন্মের ‘কৃষি-উদ্যোক্তা’ তৈরি হচ্ছে, যারা আধুনিক প্রযুক্তি, প্রসেসিং ও ভ্যালু চেইন উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে, পোলট্রি শিল্প খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত আছে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ এবং অধিকাংশই যুবশক্তি, তবু সামগ্রিকভাবে সঠিক নীতি পলিসির কারণে যুবশক্তির পূর্ণ সম্ভাবনা এখনও কাজে লাগানো যায়নি।

বিশ্বের অন্য দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়, ভারত তার প্রায় ৬৫ শতাংশ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক কৃষি, আইটি ও স্টার্টআপ খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। ভারতের আইটি খাত বছরে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করছে এবং অনেকগুলো আইটি হাব এস্টাবলিশমেন্টের মাধ্যমে কোটি তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। ‘স্টার্টআপ ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের মাধ্যমে এক লাখেরও বেশি স্টার্টআপ গড়ে উঠেছে। 

তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশে স্টার্টআপ সংখ্যা ও বিনিয়োগ বাড়লেও তা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে নতুন গড়ে ওঠা তরুণদের স্টার্টআপগুলো চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে।চীন কয়েক দশকের ধারাবাহিকতায় তাদের যুবশক্তিকে উৎপাদনমুখী শিল্পে দক্ষভাবে ব্যবহার করে বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক দশকে চীন প্রায় ৮০ কোটির বেশি মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে উত্তরণ করেছে, যার পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল দক্ষ শ্রমশক্তি ও শিল্পায়ন। টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ করে তারা ‘ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টরি’ বা বৈশ্বিক শিল্প হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। 

বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা- শুধু একটি খাত নির্ভর না থেকে বহুমুখী শিল্পায়ন জরুরি, প্রয়োজন রফতানি বহুমুখী করা। দক্ষিণ কোরিয়া একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে ১৯৬০-এর দশকে দারিদ্র্যপীড়িত দেশ থেকে তারা প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তাদের গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় জিডিপির প্রায় ৪-৫ শতাংশ, যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ, এর ফলে তারা সেমিকন্ডাক্টর, অটোমোবাইল ও ইলেকট্রনিকসেও বিশ্বনেতা। শিল্পায়নের এই প্রতিযোগিতার যুগে বাংলাদেশে আরঅ্যান্ডডি ব্যয় এখনও ১ শতাংশেরও কম, যা উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে।

অন্যদিকে জাপান দেখিয়েছে যে জনসংখ্যা কম হলেও দক্ষতা ও কর্মসংস্কৃতি থাকলে উন্নয়ন সম্ভব। তাদের শ্রমশক্তি অত্যন্ত দক্ষ, উৎপাদনশীলতা উচ্চ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে অগ্রগামী, তবে গবেষকদের ধারণা জাপানে মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশের বয়স ৬০-এর ওপর অর্থাৎ প্রতি তিনজনে একজন বয়স্ক এই হার আগামী ২০৪০ সালে ৩৪-৩৫ শতাংশ হবে। 
এটা পরিষ্কার আগামী দশকগুলোতে জাপানের কর্মক্ষেত্রে অনেক কম হারে যুবশক্তির জোগান পাবে। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বেশি হলেও শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা তুলনামূলকভাবে কম, যা উন্নয়নের পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ অথচ পৃথিবীর অনেক দেশে যখন যুবশক্তি ক্রম হ্রাস পাবে তখন বাংলাদেশ শুধু যুবশক্তির পর্যাপ্ত জোগানের কারণে বিদেশি বিনিয়োগ ও শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীর সম্ভাব্য গন্তব্য হবে।

বর্তমান বাংলাদেশের যুবশক্তির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বেকারত্ব। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী যুব বেকারত্বের হার প্রায় ১০-১২ শতাংশের মধ্যে, যা সাধারণ বেকারত্বের হারের চেয়ে বেশি। অন্যদিকে প্রতি বছর প্রায় ২০-২২ লাখ নতুন তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না।

এ ছাড়া ‘স্কিল গ্যাপ’ বা দক্ষতার ঘাটতি একটি বড় সমস্যা- শিক্ষাব্যবস্থায় অর্জিত জ্ঞান ও শিল্প খাতের চাহিদার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে, এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। প্রথমত কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বর্তমানে মোট শিক্ষার্থীর মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ টেকনিক্যাল শিক্ষায় যুক্ত, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম, এই হার কমপক্ষে ৩০-৪০ শতাংশ এ উন্নীত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত আইটি ও ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে তরুণরা বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে।

তৃতীয়ত উদ্যোক্তা উন্নয়নে বাস্তবসম্মত সহায়তা প্রয়োজন; সহজ শর্তে ঋণ, স্টার্টআপ ফান্ড, ইনকিউবেশন সেন্টার এবং মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে, বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ এবং এগ্রো-প্রসেসিং খাতে যুব উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে, এমন পরিকল্পিত উদ্যোগ- যেমন পারিবারিক পোলট্রি, গ্রামীণ উৎপাদন ও ভ্যালু চেইন উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

চতুর্থত শিল্পায়নের বহুমুখীকরণ জরুরি- তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিকস, ফুড প্রসেসিং, ব্লু ও গ্রিন ইকোনমি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। 
এতে করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং ভবিষ্যতে অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে; বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করে ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ’ তৈরি করতে হবে, যাতে গবেষণার ফল বাস্তব খাতে প্রয়োগ করা যায়।
বাংলাদেশের যুবশক্তি একটি বিশাল সম্ভাবনা ও আগামীর অগ্রগতির জন্য বাস্তব শক্তি, তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাফল্যে রূপ নেবে না। 

সঠিক নীতি, পরিকল্পনা এবং  রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে এই শক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের অভিজ্ঞতা দেখায়- যুবশক্তিকে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। কল্যাণ রাষ্ট্র ভাবনা থেকে সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার যুবশক্তিকে কাজে লাগিয়ে আগামী দশকে একটি শক্তিশালী, উদ্ভাবনী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।

গ্রিন সার্কুলার ইকোনমি বিশেষজ্ঞ

সময়ের আলো/আআ


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: