বাংলাদেশে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় দেড় মাস হতে চলেছে। নতুন এই সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই পুরো বিশ্ব অস্থির হয়ে ওঠে ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশও ভোগান্তিতে পড়েছে জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখতে। তা ছাড়া বেশ কিছু জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। চারটি মূল চাপের মুখে দেশটি- একদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকট, অন্যদিকে হামের প্রাদুর্ভাব, বিরোধী দলের আন্দোলন এবং আন্তর্জাতিক চাপ।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- বৈশ্বিক পরিস্থিতি দেশকে গভীর সংকটে ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ইরানসহ অন্যান্য দেশ থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহের ঘটনা ঘটছে, যার ফলে পরিবহন ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, সংকট চলছে, সরকার তা মোকাবিলা করছে। কিন্তু বিরোধী দল বলছে, সংকট থাকলে তা পরস্পরের মধ্যে আলোচনা করে সমাধান করা প্রয়োজন। জনগণ বিএনপিকে সরকারে বসিয়েছে, তাদের সেবা নিশ্চিত করতে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তেল ও হামসহ প্রতিটি সমস্যাই স্বাভাবিক। বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মানুষের আতঙ্কও কমবে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি নেই বললেও বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও বিকল্প উৎসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মূল্যবৃদ্ধি ও মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে সময়মতো হামের টিকা নিশ্চিত করা হয়নি। বর্তমান সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং আমরা সে বিষয়ে অবহিত করেছি। স্বাস্থ্য খাত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। হামের বিস্তার রোধে দ্রুত টিকা সরবরাহের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু টিকাদান কর্মসূচির স্থবিরতা ও অপপ্রচারে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে গেছে। চিকিৎসকরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, সরকারের উদ্যোগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। আশার কথা যে, বর্তমান সরকার হামের বিস্তার রোধে গতকাল থেকে হামের টিকা দেওয়া কর্মসূচি শুরু করেছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংবিধান সংস্কার ইস্যু পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। বিরোধী দলগুলো দাবি করছে, জনগণের ইচ্ছার বিপরীতে সরকার সংবিধানে পরিবর্তন আনতে চাইছে। বিক্ষোভ, সমাবেশ ও আন্দোলনের মাধ্যমে তারা এই দাবি জোরালো করছে। সরকার বলছে, তারা জনগণের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সংশোধন করছে। তবে এই দ্বন্দ্ব দেশকে অস্থিরতার পথে ঠেলে দিতে পারে। এ বিষয়ে সরকারকে সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কম। তাই বিষয়টি কোনো অস্থিরতা ব্যতীত রাজনৈতিকভাবে সমাধান দেশের মানুষ আশা করে।
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে সরকার। জাতিসংঘ ও ভারতের পক্ষ থেকে চাপের খবর পাওয়া গেলেও সরকারিভাবে কিছু বলা হয়নি। এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট এখন আন্তর্জাতিক বাস্তবতা। তার মতে, সরকার কিছুটা চাপের মুখে থাকলেও এসব সমস্যা সমাধানযোগ্য এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চাপ অনেকটাই কমে আসবে।
তারপরও এই চাপ মোকাবিলায় সরকারের সুস্পষ্ট রূপরেখা ও স্পষ্টতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে সংকট মোকাবিলা করলে তা দেশের জন্য মঙ্গল হবে।
সাধারণভাবে দেখা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে সরকারের দৃঢ় অবস্থান ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই সংকটগুলো সমাধান সম্ভব। মনে রাখতে হবে নতুন সরকার দেড় মাস হয় রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক সমস্যা ব্যতিরেকে অনেক সমস্যা সমাধানে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণে ইতিমধ্যে সফলতায় দেশের মানুষ আশান্বিত হয়েছে। তাই এ সমস্যাগুলো সমাধানে দেশের স্বার্থে সবাই মিলে কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ যতই থাকুক, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি উন্নতি হবে- এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।
সময়ের আলো/আআ