পাহাড়ে আঙুর চাষে বাজিমাত সালাউদ্দিনের

দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি

সারাদেশ

পাহাড় মানেই একসময় ছিল জুম চাষ, হলুদ কিংবা আদার খেত। সময়ের পরিক্রমায় সেখানে যুক্ত হয়েছে আম, লিচু ও মাল্টার বাগান।

2026-04-06T18:36:10+00:00
2026-04-06T18:51:05+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
পাহাড়ে আঙুর চাষে বাজিমাত সালাউদ্দিনের
দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:৩৬ পিএম  আপডেট: ০৬.০৪.২০২৬ ৬:৫১ পিএম
পাহাড়ে আঙুর চাষী মো. সালাউদ্দিন। ছবি : সময়ের আলো
পাহাড় মানেই একসময় ছিল জুম চাষ, হলুদ কিংবা আদার খেত। সময়ের পরিক্রমায় সেখানে যুক্ত হয়েছে আম, লিচু ও মাল্টার বাগান। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় সমতল বা শীতপ্রধান দেশের আঙুর ফলবে— এমন কথা আগে কেউ কল্পনাও করেনি।

সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার এক অদম্য উদ্যোক্তা মো. সালাউদ্দিন। খাগড়াছড়ির মাটিকে আঙুর চাষের উপযোগী প্রমাণ করে তিনি পাহাড়ের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছেন।

উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের ভূইয়াছড়ি এলাকার বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সি মো. সালাউদ্দিন। পেশায় সাধারণ একজন মানুষ হলেও নেশা ছিল নতুন কিছু করার। সেই নেশাই তাকে নিয়ে গেছে সফলতার শীর্ষে। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে বিদেশি আঙুর চাষ দেখে তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সেই আগ্রহ থেকেই অনলাইনে ইউক্রেনের বিখ্যাত ‘বাইকুনুর’ জাতের মাত্র দুটি চারা ১৪০০ টাকা দিয়ে সংগ্রহ করেন।

শুরুতে পাড়া-প্রতিবেশী ও পরিচিতজনরা পাহাড়ের তপ্ত মাটিতে আঙুর হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সালাউদ্দিনের দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের কাছে সেই সংশয় ধোপে টেকেনি। মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে তার ১৫ শতক জমির বাগান এখন থোকায় থোকায় রঙিন আঙুরে ভরে উঠেছে।

সালাউদ্দিনের বাগানে প্রবেশ করলে মনে হবে এটি কোনো সাধারণ বাগান নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আঙুরের একটি সংগ্রহশালা। তার বাগানে বর্তমানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ৬০টি উন্নত জাতের আঙুর রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে তিনি সরাসরি রাশিয়া, ইউক্রেন, চীন ও মালয়েশিয়া থেকে চারা ও কলম সংগ্রহ করেছেন।

তার বাগানে শোভা পাচ্ছে- ইউক্রেনের বাইকুনুর, বাইকিং, ডিক্সন, গ্লুরি ও দাসোনিয়া; চীনের চ্যাং ফিঙ্গার (যা দেখতে আঙুলের মতো লম্বা); অন্যান্য জাতের মধ্যে রয়েছে- মালয়েশিয়ার গ্রিন লং, ইতালির ব্ল্যাক ম্যাজিক, সিসিলি, রেড গ্লোব, আইসবার্গ, আর্লি, রেড, এলব্রোস এবং রেড রোজ।

প্রতিটি জাতের স্বাদ, বর্ণ এবং আকৃতি একে অপরের থেকে ভিন্ন। কোনোটি কুচকুচে কালো, কোনোটি টকটকে লাল, আবার কোনোটি লম্বাটে সবুজ। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিদেশি জাতের এই আঙুরগুলো দেশের প্রচলিত টক আঙুরের তুলনায় অত্যন্ত মিষ্টি ও রসালো।


সালাউদ্দিন কেবল আঙুর ফল উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই সম্ভাবনাময় ফসলকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে হলে চারার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। তাই তিনি গ্রাফটিং (কলম) ও রুট পদ্ধতিতে চারা তৈরি শুরু করেন।

তিনি জানান, প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আঙুর চারার ব্যাপক চাহিদা থাকে। অনলাইনের মাধ্যমে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চারা সরবরাহ করছেন। মানভেদে প্রতিটি চারা ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। প্রতি মৌসুমে তিনি প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার চারা বিক্রি করে কয়েক লাখ টাকা আয় করছেন। চলতি বছর তার বাগান থেকে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি আঙুর বাজারজাত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

পাহাড়ের চূড়ায় বাগান হওয়ায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সেচ ব্যবস্থা। খরার মৌসুমে পাহাড়ের চূড়ায় পানি তোলা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। সালাউদ্দিন বলেন, অনেকের ধারণা আঙুর চাষ অনেক কঠিন। কিন্তু সঠিক পদ্ধতি ও পরিচর্যা জানলে আমাদের পাহাড়ি মাটিতেও এটি সম্ভব। আমি মূলত জৈব সার ব্যবহার করি। তবে পানির সংকটটা যদি কাটিয়ে ওঠা যায়, তবে পাহাড়ের প্রতিটি চূড়ায় আঙুর বাগান করা সম্ভব।

সালাউদ্দিনের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করছেন। পর্যটন নগরী খাগড়াছড়িতে এটি এখন একটি নতুন দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। বাগান দেখতে আসা মো. আব্দুল্লাহ খান উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, পাহাড়ের চূড়ায় আঙুর ঝুলছে— এটি দেখতেই অসাধারণ লাগে। আঙুরগুলো খুবই মিষ্টি। আমি নিজে বাড়ির জন্য ইউক্রেনের বাইকুনুর জাতের চারা নিয়ে যাচ্ছি।

স্থানীয় কৃষকরাও সালাউদ্দিনের এই সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। আগে যারা কেবল তামাক বা জুম চাষ করতেন, তারা এখন আঙুর চাষের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছেন।


দীঘিনালা উপজেলা কৃষি বিভাগ সালাউদ্দিনের এই উদ্যোগকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, সালাউদ্দিন একজন অত্যন্ত সাহসী ও সৃজনশীল উদ্যোক্তা। পাহাড়ের মাটিতে আঙুর চাষের যে সফল দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা অভাবনীয়। আমরা তার বাগান নিয়মিত পরিদর্শন করছি এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দিচ্ছি।

তিনি আরও যোগ করেন, পাহাড়ে আঙুর চাষের ব্যাপক প্রসারের জন্য তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠাবেন। যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সেচ সুবিধার ব্যবস্থা করা যায়, তবে পাহাড়ের এই ঊষর মাটি হয়ে উঠতে পারে ‘আঙুরের ভ্যালি’, যা প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   পাহাড়  আঙুর চাষ  সালাউদ্দিন  খাগড়াছড়ি  দীঘিনালা উপজেলা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: