ভূরাজনীতি : ইরান কি ভিন্ন পরিণতির পথে?

আমানুল্লাহ ইসলাম নাইম

মতামত

একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে আজ মধ্যপ্রাচ্য এক মহাকাব্যিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আমেরিকার ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ও ইসরাইলের ‘অপারেশন রোরিং

2026-04-07T15:32:22+00:00
2026-04-07T15:32:39+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
ভূরাজনীতি : ইরান কি ভিন্ন পরিণতির পথে?
আমানুল্লাহ ইসলাম নাইম
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৩২ পিএম  আপডেট: ০৭.০৪.২০২৬ ৩:৩২ পিএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে আজ মধ্যপ্রাচ্য এক মহাকাব্যিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আমেরিকার ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ও ইসরাইলের ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’র মাধ্যমে ইরানের অস্তিত্বে আঘাত করার রণকৌশল, অন্যদিকে আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর ইরানকে একটি ‘নিষ্ক্রিয় দ্বীপে’ পরিণত করার নীরব কূটনীতি- সব মিলিয়ে তেহরানের ভবিষ্যৎ আজ তিনটি চরম পরিণতির দোলাচলে ঘুরপাক খাচ্ছে। ইরান কি কিউবার মতো পঙ্গু কিন্তু নিয়ন্ত্রিত হবে, সিরিয়ার মতো গৃহযুদ্ধে চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে, নাকি উত্তর কোরিয়ার মতো আরও বেশি আগ্রাসী ও পারমাণবিক শক্তিধর একটি সামরিক দুর্গে রূপান্তরিত হবে?

ইসরাইল যখন ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে দেশটিকে একটি অন্তহীন বিশৃঙ্খলার (সিরিয়া মডেল) দিকে ঠেলে দিতে চাইছে, আরব রাষ্ট্রগুলো তখন কৌশলী অবস্থানে। সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশ ইরানের ডানা ছেঁটে তাকে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল (কিউবা মডেল) দেখতে চায় ঠিকই, কিন্তু তারা ইসরাইলি একচ্ছত্র আধিপত্যের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি সম্পর্কেও সমান সচেতন।

সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা লুকিয়ে আছে ইরানের অভ্যন্তরে। আইআরজিসির কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং মুজতবা খামেনির সম্ভাব্য উত্তরাধিকার কি ইরানের রাষ্ট্রকাঠামোকে ভাঙন থেকে রক্ষা করবে, নাকি তীব্র বহির্চাপ দেশটিকে একটি অপ্রতিরোধ্য এবং চরম বিপজ্জনক ‘গ্যারিসন স্টেটে’ (উত্তর কোরিয়া মডেল) পরিণত করবে?
আরও পড়ুন

এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, আজকের মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কেবল সীমানা রক্ষার লড়াই নয়, বরং একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার এক নির্মম পরীক্ষা- যেখানে প্রতিটি ভুল পদক্ষেপ পুরো বিশ্বকে এক অভাবনীয় সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

ইরানে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায়, ইসরাইল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ক্রমশ উত্তেজনা বাড়ছে। ইরানের উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলার অর্থ হচ্ছে সবকিছু দ্রুত স্বাভাবিক হচ্ছে না। আরব উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমশ ইরানকে কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার দিকে ঝুঁকছে, কিউবার মতো দুর্বল ও অনমনীয় কিন্তু নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র হিসেবে। অন্যদিকে ইসরাইল দেশটিকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিতে চায়, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে সামরিকভাবে এমনভাবে দুর্বল করে দিতে চায়, যতক্ষণ না এটি গৃহযুদ্ধকালীন সিরিয়ার মতো হয়, যেখানে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং এর আঞ্চলিক সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে, জীবনযাত্রার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

মতপার্থক্য সত্ত্বেও উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংসের দিকে না ঠেলে দিয়ে তার শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে চায়। 

এই বিষয়টি মাথায় রেখে কাতার, ওমান এবং কুয়েত নীরবে যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তির জন্য চাপ দিচ্ছে; অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন ইঙ্গিত দিয়েছে, যদি ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর দীর্ঘস্থায়ী সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে, তবে তারা সংঘাতের আরও বৃদ্ধি মেনে নিতে প্রস্তুত ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়ে। আবুধাবির কর্মকর্তারা একটি ‘চূড়ান্ত ফলাফলের’ পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন, অন্যদিকে ওমান এবং কাতার সহাবস্থান ও আলোচনার ওপর জোর দিয়েছে। কিন্তু মতপার্থক্য সত্ত্বেও ইরানকে দুর্বল হতে দেখার বিষয়ে সবাই একমত।

ইসরাইলের হিসাব সম্পূর্ণ আলাদা : তারা চায় ইরানের শাসনব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের ধ্বংসের পর্যায়ে দুর্বল করে দিতে সেটা বিশৃঙ্খলা, বিভাজন বা একক শক্তি হিসেবে ইরানের পতন বা যাই হোক। কিছু ইসরাইলি কৌশলবিদ এটাকেই আদর্শ পরিণতি হিসেবে দেখছেন।

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, চাওয়াগুলোর কোনোটিই হয়তো আশানুরূপ ফলাফল দেবে না। এ ক্ষেত্রে বেশ ঝুঁকি রয়েছে, ইরানের পরিণতি কিউবা বা সিরিয়ার মতো না হয়ে বরং উত্তর কোরিয়ার মতো হবে (এমন একটি সামরিক রাষ্ট্র যা কম বিপজ্জনক না হয়ে বরং আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে টিকে আছে)। এই ত্রিমুখী পরিণতির সমাধান কীভাবে হবে, তা মূলত নির্ভর করছে সব পক্ষের ওপর, যাদের হিসাব-নিকাশ স্পষ্টতই ভিন্ন এবং যাদের আত্মবিশ্বাস তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য উসকানি দিয়ে আসছিল। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এমন কৌশলগত পরিণামের প্রতিফলন, যা বহু বছর ধরে পরিকল্পনাধীন ছিল এবং এমন এক মার্কিন সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে শুরু করেছে, যা সাম্প্রতিককালের যেকোনো সময়ের চেয়ে ইসরাইলের পরিকল্পনার সঙ্গে বেশি একাত্মতা পোষণ করে। 

ইসরাইলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সা’আর বলেছেন, এই যুদ্ধের লক্ষ্য হলো- ‘দীর্ঘমেয়াদে ইসরাইলের জন্য ইরানের থেকে অস্তিত্বের হুমকি দূর করা,’ তবে তিনি এও স্বীকার করেছেন যে ‘এর পরিণতি হিসেবে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনও হতে পারে।’ যুদ্ধটি কখন শেষ হতে পারে সে বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত না দিয়েই তিনি কার্যত বিজয় হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পকে দুর্বল করার জন্য আরও অন্তত তিন সপ্তাহ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

এসব থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসরাইলের উদ্দেশ্য অস্থিতিশীলতা ও বিভাজনের বিনিময়েও ইরানের শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতাকে ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করা। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পতন ইসরাইলের প্রয়োজন নেই, কিন্তু তারা তাদের চরমপন্থি লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য এটিকে একটি অনন্য সুযোগ হিসেবে দেখছে এবং তা বাস্তবায়ন করতে চায়। ইসরাইলি সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের পদক্ষেপের সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। কারণ তারা জানে রাজনৈতিক অঙ্গনের সর্বত্রই ইসরাইলি অভিযানের প্রতি মার্কিন সমর্থন হ্রাস পাচ্ছে।

আপাতত, মার্কিন ও ইসরাইলি নেতাদের ধারণা, ইসরাইলি কৌশলগত আধিপত্য কাম্য এবং অর্জনযোগ্য। কিন্তু এমন একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা, যা স্থায়ীভাবে ইসরাইলের সর্বোচ্চ আধিপত্যের ওপর নির্মিত; যেখানে ইরান এবং আরব রাষ্ট্রগুলোকে সেটি মেনে নেওয়ার প্রত্যাশা করা হয়, যা মূলত স্থিতিশীলতার কোনো টেকসই সমাধান নয়। বরং এটি আরও বেশি সংঘাতকে আমন্ত্রণ জানানো।

ইরানের কৌশলগত পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক বিরোধিতা রয়েছে। কিন্তু ইসরাইলি আধিপত্যের বিরোধিতাও সমানভাবে বিদ্যমান এবং সেই বিরোধিতা কাঠামোগত ও গভীরভাবে প্রোথিত। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলের আধিপত্যকে তাদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে দেখে। এর পাশাপাশি তাদের নিজ নিজ নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে, এ অঞ্চলের ক্রমবিকাশমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি কেন্দ্রীয় টানাপড়েন তৈরি হয়েছে যা ইসরাইলি কৌশলগত আধিপত্যের সমর্থকদের দ্বারা ধারাবাহিকভাবে অবমূল্যায়িত হচ্ছে।

ইরান শেষ পর্যন্ত কিউবার মিসাইল সংকটের মতো অবরোধনির্ভর পরিস্থিতির দিকে যাবে, নাকি সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের মতো ভাঙনের পথে যাবে তা মূলত বাইরের হস্তক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে না, বরং অভ্যন্তরীণ সংহতির ওপর নির্ভর করছে। বর্তমানে সেই সংহতি এখনও খুব ভালোভাবে টিকে আছে। ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত এই কাঠামোর মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য ভাঙনের লক্ষণ দেখা যায়নি; যা অস্বাভাবিক নয়, যেখানে বিদ্রোহ ব্যয়বহুল এবং কোনো সুসংগঠিত বিকল্প শক্তি নেই, সেখানে ভেতর থেকে ভাঙন তৈরি হওয়া স্বাভাবিকভাবেই বেশ কঠিন।

ইরান রাষ্ট্র হিসেবে এখনও বলপ্রয়োগের ওপর প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। অর্থাৎ, সিরিয়ার ইদলিব অঞ্চলের মতো কোনো বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত এলাকা নেই, যা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ চলাকালীন দেখা গিয়েছিল। একইভাবে লিবিয়ার বিপ্লবের শুরুর সময় বেনগাজি যেভাবে দ্রুত বিদ্রোহীদের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল, ইরানে তেমন কিছু এখনও তৈরি হয়নি। 

মুজতবা খামেনির সম্ভাব্য উত্তরাধিকার আসলে একটি কৌশল, যা রাষ্ট্রের ভেতরের ক্ষমতাকে আরও কেন্দ্রীভূত করে এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ইসলামিক রিভলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রভাব স্থায়ীভাবে শক্ত করা। কিন্তু এখানে বড় অনিশ্চয়তা; এই ক্ষমতাকেন্দ্রীকরণ কি দীর্ঘমেয়াদে চাপ সহ্য করে টিকে থাকতে পারবে, নাকি এটা কেবল শীর্ষস্তরে দুর্বলতাকে আরও ঘনীভূত করবে?

যদিও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের কোনো সমীকরণ দীর্ঘস্থায়ী শান্তির বিকল্প হতে পারে না। ইতিহাসের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে একদিন হয়তো এই অঞ্চলেই গড়ে উঠবে নতুন কোনো সংহতি, যেখানে সমরাস্ত্রের চেয়ে যথোপযুক্ত কূটনীতিই হবে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতার মূল কারিগর। যুদ্ধের এই দীর্ঘ ধ্বংসলীলা শেষে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন তাই এখন সময়ের দাবি।

আইনজীবী

এএডি/


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: