ক্রিকেট বোর্ডে শুধু কর্তা বদলায়, চরিত্র নয়

ক্রীড়া প্রতিবেদক

খেলা

‘আমরা কোনোভাবেই আগামীর ক্রীড়াঙ্গন দলীয়করণ করতে চাই না। আমরা রাজনীতিমুক্ত ক্রীড়াঙ্গন চাই’- ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের এই বক্তব্যের রেশ কাটতে

2026-04-09T05:29:24+00:00
2026-04-09T05:29:24+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
খেলা
ক্রিকেট বোর্ডে শুধু কর্তা বদলায়, চরিত্র নয়
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:২৯ এএম 
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। ছবি : সংগৃহীত
‘আমরা কোনোভাবেই আগামীর ক্রীড়াঙ্গন দলীয়করণ করতে চাই না। আমরা রাজনীতিমুক্ত ক্রীড়াঙ্গন চাই’- ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের এই বক্তব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা। 

দীর্ঘ তদন্ত, অভিযোগ আর অনিয়মের প্রেক্ষাপটে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে মঙ্গলবার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) গঠন করে ১১ সদস্যের একটি অ্যাডহক কমিটি, যার নেতৃত্বে সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল। তবে নতুন এই কমিটি ঘোষণার পরই প্রশ্ন উঠেছে- রাজনীতিমুক্ত ক্রীড়াঙ্গনের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে?

নতুন কমিটির গঠনই যেন সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। কারণ কমিটিতে জায়গা পাওয়া কয়েকজন সদস্য সরাসরি বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। এই কমিটিতে জায়গা হয়েছে বর্তমান সরকারের মন্ত্রীপুত্রদের। যা নিয়ে হচ্ছে তীব্র সমালোচনা। বিসিবির সবশেষ নির্বাচন থেকেই তামিম ইকবাল জোটে ছিলেন ইস্রাফিল খসরু, সৈয়দ ইব্রাহীম আহমেদ ও ইয়াসির আব্বাস। 

জাতীয় নির্বাচনের পর তাদের দুজনের বাবা সরাসরি মন্ত্রী হয়েছেন, আরেকজন মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা। শুধু তাই নয়, আরেক প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের স্ত্রী রাশনা ইমামও রয়েছেন আলোচিত-সমালোচিত অ্যাডহক কমিটিতে। ফলে ক্রীড়াঙ্গনের গণ্ডি পেরিয়ে বিষয়টি এখন সামাজিক ও নাগরিক আলোচনার কেন্দ্রে। অনেকের মতে, প্রশাসনিক পরিবর্তনের আড়ালে রাজনৈতিক প্রভাবের উপস্থিতিই আবারও সামনে চলে এসেছে।

বিসিবির নতুন কমিটি গঠন নিয়ে বেশ পাল্টাপাল্টি বক্তব্য হয়েছে জাতীয় সংসদের অধিবেশনেও। বুধবার সংসদে এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ) রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের অভিযোগ এনে বলেছেন, ‘বিসিবি এখন আর ক্রিকেট বোর্ড নেই, সেটি বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ডে পরিণত হয়েছে।’ 

হাসনাতের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা এখানে বাপের দোয়া-মায়ের দোয়া করিনি। এতদিন শুনতাম মায়ের দোয়া পরিবহন আছে। আজকে সংসদ সদস্যের কল্যাণে শুনলাম বাপের দোয়া কমিটি আছে।’

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাবের ইতিহাস বেশ পুরোনো। এক যুগের বেশি সময় বিসিবির সভাপতি ছিলেন নাজমুল হাসান পাপন, যিনি রাজনৈতিক সমর্থন নিয়েই বোর্ডে আসেন। তার আমলেও একাধিক পরিচালক রাজনৈতিক বিবেচনায় জায়গা পেয়েছিলেন। 

পাপনের আমলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আপন চাচাতো ভাই শেখ সোহেল, শফিউল আলম নাদেল, নজীব আহমেদ, আশফারুল ইসলাম টিটো, তানভীর আহমেদ টিটোসহ আরও অনেকে পরিচালক হয়েছিলেন রাজনৈতিক কারণেই। তার বোর্ডে তারই কর্মস্থল বেক্সিমকোর আধিপত্য ছিল ব্যাপক। ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ইসমাইল হায়দার মল্লিকও বেশ দাপটের সঙ্গে পাপনের বোর্ডে রাজত্ব করার অভিযোগ ছিল বিস্তর। সেই ধারাবাহিকতা পরবর্তী সময়েও থেমে থাকেনি।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও দৃশ্যপট খুব একটা বদলায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার অধীনেও বোর্ড গঠনে তার ঘনিষ্ঠদের প্রাধান্য ছিল বলে আলোচনা রয়েছে। ওই সময় ফারুক আহমেদ স্বল্প সময়ের জন্য সভাপতি হন, পরে তাকে সরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয় আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে। 

পরে যদিও তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্বে আসেন, সেই নির্বাচন নিয়েই ছিল ব্যাপক বিতর্ক। গঠনতন্ত্রের বাইরে গিয়ে কাউন্সিলর মনোনয়ন, প্রভাব খাটানো এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ শেষ পর্যন্ত এনএসসির তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে।

এনএসসির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তও সেই তদন্তের ফল। প্রতিবেদনে নির্বাচনি অনিয়ম, ই-ভোটিংয়ে স্বচ্ছতার অভাব, নির্দিষ্ট প্রার্থীদের পক্ষে প্রভাব খাটানো এবং গঠনতন্ত্র লঙ্ঘনের নানা অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই ভেঙে দেওয়া হয়েছে নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ।

তবে এই সিদ্ধান্তের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সাধারণত তাদের সদস্য বোর্ডে সরকারি হস্তক্ষেপ মেনে নেয় না। অতীতে বিভিন্ন দেশে এমন ঘটনায় কঠোর অবস্থানও নিয়েছে তারা। যদিও কিছু ক্ষেত্রে নীরব থেকেছে, তবু বিসিবির ক্ষেত্রে কী অবস্থান নেয় সেটি এখন বড় একটি বিষয়।

আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে বিসিবির নিজস্ব গঠনতন্ত্র নিয়ে। সেখানে অ্যাডহক কমিটি নিয়ে কোনো স্পষ্ট বিধান নেই। অথচ এনএসসি তাদের নিজস্ব আইনের আওতায় এই কমিটি গঠন করেছে। ফলে আইনি ও কাঠামোগত সামঞ্জস্য নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

অ্যাডহক কমিটির কার্যপরিধি নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। তাদের প্রধান দায়িত্ব আগামী ৯০ দিনের মধ্যে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। তবে এই কমিটির সদস্যরা নিজেরাই ভবিষ্যতে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন কি না সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। 

যদিও তামিম ইকবাল মঙ্গলবার দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দেন, আসন্ন নির্বাচনে তিনি অংশ নেবেন। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে স্বার্থের সংঘাত এড়াতে সংশ্লিষ্টরা পদত্যাগ করে নির্বাচনে অংশ নেন। কিন্তু এখানে সেই প্রক্রিয়া বা নীতিমালা স্পষ্ট না হওয়ায় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সবমিলে বিসিবি এখন কেবল একটি প্রশাসনিক রদবদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না, বরং এটি দাঁড়িয়ে আছে একটি বড় রাজনৈতিক ও কাঠামোগত বাস্তবতার মুখে। সামনে যে নির্বাচন সেটি কতটা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য হবে তা নির্ধারণ করবে শুধু বোর্ডের ভবিষ্যৎ নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতাও।

সময়ের আলো/কেএইচও 


  বিষয়:   ক্রিকেট বোর্ড  কর্তা  বিসিবি 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: