মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে দেশে যে জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হয়েছে তাকে ঘিরে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী নানা পন্থায় মজুদের উৎসবে মেতে উঠেছে। এতে দেখা দিয়েছে সংকট এবং অস্থিরতা। তবে এই সংকটের জন্য আরও একটি বিষয় যোগ হয়েছে। আর তা হলো বিপদ। এই বিপদ নিজেরাই ডেকে আনছে। কারণ তারা জানে না এই মজুদ করা জ্বালানি তেল একসময় বিস্ফারণের আকার ধারণ করতে পারে।
প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা যাচ্ছে জ্বালানি তেলের ভয়ংকর অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম। টিনের কৌটা থেকে ড্রাম, প্লাস্টিক বোতল— সবখানে মিলছে জ্বালানি তেল। বাড়ির আঙিনা, ঝোপঝাড়, পুকুরের পানির নিচে পর্যন্ত মিলছে অজস্র লিটার এই দাহ্য পদার্থের অবাধ সংরক্ষণ। এ ধরনের অব্যবস্থাপনা শুধু অবৈধতার দিক থেকে নয়, বরং এর ঝুঁকি ভয়াবহতা ও বিপজ্জনকতার দিক থেকেও অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়— অক্সটেন, পেট্রোল, ডিজেল সবই উচ্চ দাহ্য পদার্থ। এগুলো যদি অনিরাপদ ও অবৈধভাবে সংরক্ষণ করা হয়, তবে তা অগ্নিনিরাপত্তার জন্য বড় বিপদ। এমনকি আগুনের সংস্পর্শে এলে বিস্ফোরণের আশঙ্কা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে গরম মৌসুমে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
দেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা যাচ্ছে, পুকুরের পানির নিচে বা বাড়ির আঙিনায় অবৈধভাবে রাখা ড্রাম ও বোতলে ভরা জ্বালানি তেল। এসব সংরক্ষণে নিরাপত্তার মানদণ্ড মানা হচ্ছে না মোটেও। এতে এক অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা যে কখন ঘটে যেতে পারে, তার আশঙ্কা প্রবল।
অন্যদিকে এই অব্যবস্থাপনা যেন চলমান সংকটের সুযোগে মজুদদার ও পাচারকারীদের জন্য দারুণ রকমের লাভজনক ব্যবসা হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা যাচ্ছে, পেট্রোল পাম্প ও প্যাক পয়েন্ট থেকে এই জ্বালানি অবৈধভাবে সংগ্রহ ও মজুদ করা হচ্ছে। এমনকি পুকুরের পানির নিচেও লুকানো হচ্ছে বিপুল পরিমাণ তেল।
এসব অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পাচারকারীরাও, যারা অবৈধভাবে তেল পাচার করে দেশের সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে বিক্রি করছে। এই অব্যবস্থাপনা শুধু রাজস্ব ক্ষতিই করছে না, বরং বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে দেশের অগ্নিনিরাপত্তার জন্য।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারির অভাবে এই অবৈধ মজুদদারি দিন দিন বেড়েই চলেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে পরিমাণ জ্বালানি জব্দ করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। লুকানো জ্বালানি তেলের পরিমাণ অজানা, তবে ধারণা করা হচ্ছে হাজার হাজার লিটার বিভিন্ন স্থানে মজুদ রয়েছে। এসব অবৈধ সংরক্ষণের ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে অকটেন ও পেট্রোলের মতো দাহ্য পদার্থের সংরক্ষণে অনেক ক্ষেত্রেই মানদণ্ডের তোয়াক্কা করা হয় না।
প্রধান সমস্যা হলো— এই অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে দেশের অগ্নিনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রয়োজন কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি। প্রত্যেক জ্বালানি বিক্রেতাকে অবশ্যই প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অনুমতি নিতে হবে এবং নিয়ম অনুসারে সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা যেন নজরদারির মাধ্যমে অবৈধ মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়।
সংকটের মুহূর্তে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিকের বোতল, ড্রাম, ট্যাঙ্ক, এমনকি মাটির নিচেও বিপজ্জনকভাবে জ্বালানি তেল সংরক্ষণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অতএব আমাদের জন্য জরুরি এখনই জ্বালানি তেল মজুদে নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং নিয়মানুযায়ী সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। তা না হলে, এই অদৃশ্য বোমা একসময় ভয়ংকর বিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে।
দেশের অগ্নিনিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং অব্যবস্থাপনা বন্ধে সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, এই অনিয়মের মূল্য ভয়াবহ বিপদ হিসেবেই দেখতে হবে। এ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এখনই কঠোর পদক্ষেপ দরকার।
এফআর