সবার উৎসব পহেলা বৈশাখ

ইসহাক খান

সাহিত্য

পহেলা বৈশাখ বাঙালির একমাত্র সর্বজনীন বড় উৎসব। একমাত্র সার্বজনীন উৎসব এ কারণে যে এই উৎসবে সব সম্প্রদায়ের মানুষ অংশগ্রহণ করে

2026-04-10T04:27:53+00:00
2026-04-10T04:27:53+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
সাহিত্য
সবার উৎসব পহেলা বৈশাখ
ইসহাক খান
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:২৭ এএম   (ভিজিট : ৪০)
প্রতীকী ছবি
পহেলা বৈশাখ বাঙালির একমাত্র সর্বজনীন বড় উৎসব। একমাত্র সার্বজনীন উৎসব এ কারণে যে এই উৎসবে সব সম্প্রদায়ের মানুষ অংশগ্রহণ করে এবং করতে পারে। 

এ ছাড়া বাকি যে বড় উৎসবগুলো আছে, যেমন— ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। সে উৎসব মুসলিম সম্প্রদায়ের। দুর্গাপূজা ও শ্যামাপূজার উৎসব হিন্দু সম্প্রদায়ের। বড়দিনের উৎসব খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের। পারস্পরিক সম্প্রীতির কারণে অন্য সম্প্রদায়ের লোকজনও উল্লেখিত উৎসবগুলোতে অংশগ্রহণ করে বটে কিন্তু সে উৎসব নিজের উৎসব বলে আত্মমগ্ন হতে পারে না। একমাত্র পহেলা বৈশাখের উৎসবকে সবাই নিজের বলে আনন্দে আত্মমগ্ন হয়। 

সম্প্রদায়গত বাধা থাকে না। সব সম্প্রদায়ের মানুষ মন-প্রাণ উজাড় করে এই উৎসবে একাত্ম হতে পারে। এভাবেই পহেলা বৈাশাখ বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। শুরুটা হয়েছিল সম্রাট জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের হাত ধরে, ১৫৮৪ সালে। খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বঙ্গ অঞ্চলে সম্রাট তার নবরত্নের পরামর্শে বৈশাখ মাসকে বছরের প্রথম মাস ধরে বছর গণনা শুরু করেন। যার নাম হয় বঙ্গাব্ধ। ফসলি সন হিসেবে প্রবর্তিত হয়ে বর্তমানে বাঙালির জাতিসত্ত্বা ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পালিত হয় নববর্ষের উৎসব। তারপর শত শত বছরের নানা উত্থান-পতনে বৈাশাখ মাস বাঙালি সংস্কৃতির হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় এবং এর শেকড় বাঙালি হৃদয়ে এমনভাবে প্রথিত হয়েছে যে এর শেকড় উপড়ে ফেলার চেষ্টা করলে বাঙালি প্রতিবাদে ফুসে ওঠে।

ভাষা এবং স্বাধীনতার মতো পহেলা বৈশাখ উদযাপনও নানা প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে এখনও সেই পুরোনো প্রতিকূলতা পিছু ছাড়েনি। অনেকেই বর্ষবরণ পছন্দ করে না। একটি সম্প্রদায় এর মধ্যে ধর্ম খোঁজে।

পহেলা বৈশাখের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম দুজনই বিশেষভাবে জড়িয়ে আছেন। রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়া বৈশাখ চলে না। তার গান দিয়েই শুরু হয় বৈশাখ উৎসব। এসব দেখে পাকিস্তান সরকার এবং তাদের এ দেশীয় পেয়ারের লোকদের গায়ে জ্বালা ধরে যায়। তারা রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে নেতিবাচক কথাবার্তা শুরু করে। সেই একই কথা পাকিস্তানি শাসকশ্রেণিও কঠিনভাবে ভাবতে শুরু করে এবং ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন জাতীয় পরিষদে ঘোষণা দেন যে, ‘রেডিও-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত বন্ধ করা হবে বা সীমিত করা হবে।’ 

পাকিস্তান সরকারের বাঙালি সংস্কৃতি দমনের প্রতিবাদে এ দেশের সংস্কৃতি কর্মীরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। নেতৃত্বের ভূমিকায় আসে ছায়ানট। এই জন্য ছায়ানটের ওপর মৌলবাদীদের এত রাগ। ছায়ানট ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে তারা। ১৯৬৭ সালেই বাঙালি সংস্কৃতি দমনের প্রতিবাদে ছায়ানট পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে শুরু করে রবীন্দ্র-নজরুলের গান দিয়ে বর্ষবরণ। তারপর এটাই যেন পহেলা বৈশাখের শুরুর ঐতিহ্য হয়ে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ শুরু হয় ১৯৮৯ সাল থেকে। ১৯৯৬ সালে এই শোভাযাত্রার নাম হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।


বৈশাখ যারা পছন্দ করে না, রবীন্দ্রনাথকে যারা সহ্য করতে পারে না সেই গোষ্ঠীটি কিন্তু বসে নেই। তারা নানাভাবে বাঙালির এই সার্বজনীন উৎসবের বিরোধিতা করে আসছে। ২০০১ সালে ১৪ এপ্রিল রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা বর্ষণ করে। এই বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হয় এবং বহু মানুষ আহত হয়। তারপরও বাঙালিকে পহেলা বৈশাখ পালন থেকে বিরত রাখা যায়নি। বরং পহেলা বৈশাখ উদযাপন আরও বেগবান হয়েছে।

২০১৬ সালে ইউনেস্কো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এই উৎসব শোভাযাত্রাকে ‘মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে। সেটি যে বাঙালির কতটা গৌরবের বাঙালি এই সত্য অনুভব করতে ব্যর্থ। গোল বাঁধে সরকার পরিবর্তনের পর। অন্তর্বর্তী সরকারের লোকজন আগের ঘরানার লোকই বেশি। 

তারা মঙ্গল শোভাযাতার মধ্যে ধর্মের গন্ধ খুঁজে পেলেন তারা ‘মঙ্গল’ কেটে ‘আনন্দ’ বসিয়ে ধর্মান্তরিত করে দিলেন। নাম দিলেন ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। এবারের নির্বাচিত সরকার এসে দুটোই বাদ দিয়েছেন। নাম দিয়েছেন ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। আমাদের কোনোটাতেই কোনো আপত্তি নেই। থাকার কথাও না। গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক, তাতে গোলাপের আপন মহিমা কমে না। সমস্যা হলো ইউনেস্কো এই নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলবে কি না! 

সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।

এফআর


  বিষয়:   মুক্তগদ্য  সবার  উৎসব  পহেলা বৈশাখ 


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: