ধূসর বালুচরে রসালো তরমুজ চাষ

কায়সার রহমান রোমেল গাইবান্ধা

সারাদেশ

উত্তরের নদীবিধৌত জনপদ গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল এক সময় ছিল অনাবাদি, অনিশ্চয়তা আর দারিদ্র্যের প্রতীক। বর্ষায় তলিয়ে যাওয়া, শুষ্ক মৌসুমে বালির

2026-04-11T01:48:54+00:00
2026-04-11T01:48:54+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
ধূসর বালুচরে রসালো তরমুজ চাষ
কায়সার রহমান রোমেল গাইবান্ধা
প্রকাশ: শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ১:৪৮ এএম 
ধূসর বালুচরে রসালো তরমুজ চাষ। ছবি : সময়ের আলো
উত্তরের নদীবিধৌত জনপদ গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল এক সময় ছিল অনাবাদি, অনিশ্চয়তা আর দারিদ্র্যের প্রতীক। বর্ষায় তলিয়ে যাওয়া, শুষ্ক মৌসুমে বালির স্তূপে পরিণত হওয়া এসব চরে কৃষির সম্ভাবনা নিয়ে খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না কেউ। তবে সময় বদলেছে। নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা সেই বালুচরেই এখন লাল-সবুজ তরমুজের সমারোহ। কৃষকের মুখে হাসি, মাঠে ফলনের ছড়াছড়ি- গাইবান্ধার চরে তরমুজ চাষ যেন এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

জেলার চারটি উপজেলার ১৬৫টি চর-দ্বীপচরের মধ্যে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভাটি কাপাসিয়া ও বাদামের চর এলাকায় এবারের মৌসুমে তরমুজের বাম্পার ফলন কৃষিতে নতুন আলো দেখাচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে গাইবান্ধায় ৩৫ হেক্টরের বেশি জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১৩ হেক্টর বেশি। সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে সুন্দরগঞ্জে- ১৮ হেক্টর জমিতে। গত বছর এই উপজেলায় চাষ হয়েছিল মাত্র ৯ হেক্টরে। সুন্দরগঞ্জের পাশাপাশি এ বছর ফুলছড়িতে ১০ হেক্টর, সদর ও গোবিন্দগঞ্জে ৩ হেক্টর করে এবং সাদুল্লাপুর ও সাঘাটায় স্বল্প পরিসরে তরমুজ চাষ হয়েছে। 
আরও পড়ুন

চরের এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার। বালুময় জমিতে আশ্বিন মাসেই শুরু হয় প্রস্তুতি। মালচিং পদ্ধতিতে পলিথিন বা শুকনো পাতা দিয়ে মাটি ঢেকে রাখা হয়, যাতে আর্দ্রতা ধরে রাখা যায় এবং অতিরিক্ত তাপ থেকে গাছ রক্ষা পায়। পাশাপাশি ড্রিপ ইরিগেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে অল্প পানিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে প্রতিকূল পরিবেশেও চাষ হচ্ছে লাভজনক ফসল। মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে চৈত্র মাসেই মাঠ থেকে তরমুজ ঘরে তুলছেন কৃষকরা।

কৃষকদের ভাষায়, এই চাষ এখন আর পরীক্ষামূলক নয় বরং নিশ্চিত আয়ের উৎস। প্রতি বিঘা জমিতে সব খরচ বাদ দিয়ে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা। সুন্দরগঞ্জের ভাটি কাপাসিয়া গ্রামের কৃষক রাজা মিয়া বলেন, আগে এই চরে কিছুই হতো না। এখন তরমুজ চাষ করে ভালো আয় হচ্ছে, তাই আগ্রহও বাড়ছে। একই এলাকার আলী আজগর মণ্ডল জানান, বালির চরে এত ভালো তরমুজ হবে, এমনটা তিনি কল্পনাও করেননি। এখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে এসব ক্ষেত দেখে যাচ্ছে। আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমিতে আবাদ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই সফলতার পেছনে রয়েছে কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের পরামর্শ। আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগের কারণে অনাবাদি চর জমিও এখন উৎপাদনশীল হয়ে উঠছে। 

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলের কৃষিকে এগিয়ে নিতে তারা নিয়মিত কাজ করছেন। তরমুজের সফলতা দেখে আগামী মৌসুমে আরও বেশি কৃষক এই চাষে যুক্ত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম জানান, গাইবান্ধার প্রতিটি চর কৃষির জন্য সম্ভাবনাময়। ইতিমধ্যে চরের ভুট্টা ও মরিচ জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। তরমুজও সেই তালিকায় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু তরমুজ নয়, চরাঞ্চলে গম, বাদাম, তিল, কাউনসহ বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদও বাড়ছে। কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা ও পরামর্শ অব্যাহত রাখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চরাঞ্চলের এই অভিযোজনমূলক কৃষি একটি কার্যকর উদাহরণ হতে পারে। যেখানে এক সময় অনাবাদি বালুচর ছিল, সেখানে এখন লাভজনক ফসলের চাষ হচ্ছে- এটি দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

গাইবান্ধার চরে তরমুজ চাষ শুধু একটি ফসলের গল্প নয়, এটি সম্ভাবনা, উদ্ভাবন আর সংগ্রামের এক সফলতার কাহিনি। নদীর বুকে জেগে ওঠা বালুচরে কৃষকের ঘামে রচিত এই নতুন ইতিহাস হয়তো আগামী দিনে উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে আরও বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে।

এএডি/


  বিষয়:   বালুচর  রসালো  তরমুজ  চাষ  গাইবান্ধা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: