ওয়াশিংটন
যেটিকে এপিক ফিউরি (মহা ধ্বংসাত্মক আক্রোশ) এবং তেহরান যেটিকে ট্রু প্রমিস
ফোর (সত্য প্রতিশ্রুতির চতুর্থ ধাপ) নামে অভিহিত করেছিল, সেই যুদ্ধের ৪০তম
দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল
সিকিউরিটি কাউন্সিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি মেনে নেয়। দুই
সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতিতে থাকবে না কোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, না কোনো বিমান
হামলা এবং প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে, আলোচকরা ২০২৬ সালের ১১ এপ্রিল,
শনিবার ইসলামাবাদে বৈঠকে বসবেন।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকের পর এই
প্রথমবারের মতো জাহাজগুলো নিরাপদে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে।
যুদ্ধবিরতির শর্তে ইরানের ১০ দফা শান্তি প্রস্তাব স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত
করা হয়েছে এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথমবার বিশ্ব এমন
কিছু পাচ্ছে, যা একধরনের কূটনৈতিক রোডম্যাপের মতো।
তবু, এই চুক্তির
কাঠামো বিশ্লেষণ করার আগে, সংঘাতটিকে নিজেই মূল্যায়ন করার জন্য একটু থামা
জরুরি : এর উৎপত্তি, এর আইনি অবস্থান এবং শেষ পর্যন্ত এর খরচ কে বহন করেছে।
এই
যুদ্ধটি স্বাভাবিকভাবে উদ্ভূত হয়নি সেই দীর্ঘস্থায়ী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
মুখোমুখি অবস্থান থেকে, যা ৪৭ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত
করে এসেছে। এটি কোনো নির্দিষ্ট ইরানি আগ্রাসনের ফল ছিল না এবং এটি সেই
প্রক্রিয়াগত কাঠামোও অনুসরণ করেনি, যা আন্তর্জাতিক আইন বলপ্রয়োগকে
ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য আবশ্যক করে। বরং, এর জন্ম হয়েছে ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর
পর ইসরাইলের কৌশলগত নীতিমালা থেকে যা ইসরাইলি পরিকল্পনাকারীরা নীরবে
zeroing out threats বলে বর্ণনা করেছিলেন অর্থাৎ, সম্ভাব্য অস্তিত্বগত
ঝুঁকিগুলোকে নিষ্ক্রিয় করার একটি পদ্ধতিগত অভিযান, যার মধ্যে ইরানকে সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহ করেছিল সামরিক সক্ষমতা। ইসরাইল
সরবরাহ করেছিল কৌশলগত যুক্তি। কিন্তু কেউই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কোনো
ম্যান্ডেট, জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদের অধীনে আত্মরক্ষার কোনো
বিশ্বাসযোগ্য দাবি, কিংবা এমন কোনো আইনি কাঠামো উপস্থাপন করেনি, যা
আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজনীয় সীমা পূরণ করতে পারে। এটি ছিল একটি পছন্দের
যুদ্ধ। আর অধিকাংশ পছন্দের যুদ্ধের মতোই, এটিকেও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক
দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল প্রয়োজনীয়তা এবং আগাম প্রতিরোধের
ভাষায়।
পরিণতিগুলো অনুমান করা কঠিন ছিল না। ইরান যার সামরিক
অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত এবং যার অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে এমনভাবেই
প্রতিক্রিয়া দেখায়, যেভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক সংকীর্ণ পথের
নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা যেতে পারে। হরমুজ
প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়। আঞ্চলিক নিরাপত্তার পতাকা তলে শুরু হওয়া একটি
অভিযান দ্রুতই বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গত কয়েক দশকের অন্যতম গুরুতর
জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করে, যার প্রতিধ্বনি টোকিও, বার্লিন এবং সাও পাওলোর
বাজারজুড়ে অনুভূত হয়।
ইরানের ১০ দফা : গভীরভাবে
বিবেচনার যোগ্য একটি কাঠামো যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত
হওয়া ইরানের ১০ দফা শান্তি কাঠামোটি তার নিজস্ব শর্তে বিশ্লেষণের দাবি রাখে
বরং সেই সরলীকৃত দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে, যা প্রায়ই ইরানের কূটনীতি নিয়ে
পশ্চিমা মন্তব্যে দেখা যায়।
এই প্রস্তাবটি কয়েকটি পারস্পরিকভাবে
সংযুক্ত দাবির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে : ইরানের ভূখণ্ডে ভবিষ্যতে কোনো
সামরিক হামলা না করার একটি আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা, অস্থায়ী বিরতির বদলে
স্থায়ীভাবে শত্রুতার অবসান, লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযানের সমাপ্তি,
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের মিত্রদের সম্পৃক্ত আঞ্চলিক সংঘাত
বন্ধ করা। এর বিনিময়ে ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে
দেওয়ার, নিরাপদ সামুদ্রিক চলাচলের জন্য একটি বিধিবদ্ধ কাঠামো গড়ে তোলার,
ওমানের সঙ্গে ট্রানজিট ফি ভাগাভাগি করার এবং সেই আয় ক্ষতিপূরণ হিসেবে আদায়
না করে পুনর্গঠনে ব্যয় করার।
স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন, এর কতটুকু যদি
আদৌ কিছু থাকে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করেছে, তা এখনও পরিষ্কার নয়,
ইসরাইলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তবু, ইরানের প্রস্তাবের কাঠামো না
সর্বোচ্চ দাবি চাপিয়ে দেওয়ার, না আত্মসমর্পণের প্রতিফলন। এটি এমন একটি
সরকারের কাঠামো, যা নিজের কৌশলগত সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে সেটিকে
টেকসই নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক স্বস্তিতে রূপান্তর করার পথ বেছে
নিয়েছে। কেউ ইরানকে অনুকূলভাবে দেখুক বা না-ই দেখুক, প্রস্তাবটির
অন্তর্নিহিত যুক্তি সংগতিপূর্ণ। এটি প্রত্যেক পক্ষকে একটি নির্দিষ্ট
প্রতিদান দেয়। এটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং এটি
ওমানকে, যে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নীরব কূটনৈতিক মধ্যস্থতার জন্য পরিচিত
বৃহত্তর সমঝোতার মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক ভূমিকা দেয়।
হরমুজ প্রণালি
দিয়ে প্রতিটি জাহাজের জন্য প্রস্তাবিত ট্রানজিট ফি নৌপরিবহন শিল্প ও
জ্বালানি বাজারের সমালোচনার মুখে পড়বে। তবে সেটিকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর
৪০ দিনের বন্ধের যে ব্যয় পড়েছিল, তার সঙ্গে তুলনা করে দেখতে হবে। এই ফি
একটি পরিচালনাযোগ্য ব্যয়। বিকল্পটি অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রণালি বন্ধ থাকা
কোনো পক্ষের জন্যই টেকসই ছিল না, এমনকি ইরানের জন্যও নয়।
উপসাগর
এমন এক কিছুর জন্য মূল্য পরিশোধ করেছে, যা তারা আদেশই দেয়নি : এই সংঘাতের
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কম আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো- এটি উপসাগরীয় অঞ্চলে
ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ভূমিকার পরিবর্তনশীল প্রকৃতি সম্পর্কে কী উন্মোচন
করেছে।
দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে শুধু এই অঞ্চলে একটি
সামরিক উপস্থিতি হিসেবে উপস্থাপন করেনি, বরং তার উপসাগরীয় অংশীদারদের জন্য
স্থিতিশীলতার একটি কৌশলগত নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে তুলে ধরেছে- এমন এক
নিরাপত্তা সম্পর্ক, যা অভিন্ন স্বার্থ এবং পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে
প্রতিষ্ঠিত। ইরানের প্রতিক্রিয়া একযোগে ১০টি ফ্রন্টজুড়ে বিস্তৃত হয়েছিল।
তাদের সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং
ইরানের দাবি অনুযায়ী, প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর সেসব স্থাপনাও, যেগুলোকে
তারা নিজেদের বিরুদ্ধে অভিযানে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছিল, আরব
বিশ্বের পূর্বাঞ্চল আরব মাশরেকে আনুমানিক ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক
ক্ষতি ঘটায়। জ্বালানি অবকাঠামো, বাণিজ্যপথ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা
ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার পূর্ণ প্রভাব নির্ধারণ করতে সম্ভবত বছর লেগে যাবে।
উত্তেজনা
বৃদ্ধির আগে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভাগাভাগি করা গোয়েন্দা
মূল্যায়নগুলোতে নাকি এই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিরই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল :
যে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ওপর
পাল্টা হামলা শুরু হবে, সেই মূল্যায়নগুলো হয় উপেক্ষা করা হয়েছিল, নয়তো
অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। উপসাগরীয় দেশগুলো, যারা স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে
চেয়েছিল এবং এই সংঘাতে পৌঁছানোর সিদ্ধান্তগুলোতে যাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক
ভূমিকা ছিল না, তারা এমন পরিণতির শিকার হয়েছে, যার সূচনায় তাদের কোনো
ভূমিকা ছিল না।
এই বাস্তবতা একটি প্রশ্ন উত্থাপন করে, যা আগামী
মাসগুলোতে উপসাগরীয় নীতিনির্ধারকদের মোকাবিলা করতেই হবে। ওয়াশিংটনের
অবস্থান কি একটি নিরাপত্তা অংশীদার থেকে সরে গিয়ে একটি নিরাপত্তা-ভার হয়ে
উঠেছে এমন এক শক্তি, যার কৌশলগত সিদ্ধান্তের খরচ অন্যদের বহন করতে হয়?
এপিক ফিউরি ঘোষিত লক্ষ্যগুলো ছিল বিস্তৃত : ইরানের
সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করা, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাতে ইসলামি
প্রজাতন্ত্র অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে বা ভেঙে যায় এবং ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের
স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো
প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে, অভিযানটি প্রত্যাশা পূরণ
করতে পারেনি।
ইরানের সামরিক অবকাঠামো গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়েছে।
তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পিছিয়ে গেছে। শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা যার মধ্যে
সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের
ঊর্ধ্বতন স্তর এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানি
অন্তর্ভুক্ত লক্ষ্যভিত্তিক হামলায় নিহত হয়েছেন। এগুলো ছিল তাৎপর্যপূর্ণ
কৌশলগত সাফল্য।
ন্যাটো এই যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
ইউরোপীয় সরকারগুলো এমন এক জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়, যার সৃষ্টিতে তাদের
কোনো ভূমিকা ছিল না। তারা প্রকাশ্য সমালোচনার দিকে অগ্রসর হয় এবং ওয়াশিংটন
থেকে কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরির যে প্রক্রিয়া কয়েক বছর ধরে চলছিল, তা আরও
দ্রুততর করে। সামরিক জোট সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
আলজাজিরা থেকে অনূদিতলেখক : আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একাডেমিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। যিনি মূলত ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে কাজ করেন
এএডি/