বাংলাদেশের বিশাল ও গহিন সুন্দরবন। এই বনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগার হুঙ্কার সিং। তার গর্জনে কেঁপে ওঠে চারদিক। তার প্রধানমন্ত্রী শেয়াল পণ্ডিত, চতুর আর দূরদর্শী। বছরের শেষ দিন পেরিয়ে নতুন ভোরের অপেক্ষা- বনের প্রাণীরা প্রস্তুত হচ্ছে শুভ নববর্ষ বরণ করার জন্য। তবে এবার রাজা ঠিক করলেন, শুধু ভোজ নয়- বাংলার নিজস্ব রীতিতেই উদযাপন হবে বর্ষবরণ, যাতে আনন্দের সঙ্গে থাকে শিকড়ের টান।
রাজা হুঙ্কার সিং গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘আমাদের এই বন তো বাংলারই অংশ। তাই এবারের নববর্ষ আমরা পালন করব বাঙালির মতো করে- গান, আলপনা, মেলা আর মিলনমেলায়।’ তার নির্দেশে বনজুড়ে শুরু হলো প্রস্তুতি। হাতিরা মাটিতে রঙিন কাদামাটি দিয়ে আঁকতে লাগল আলপনা, ময়ূর পাখি তার পেখম মেলে সাজাল মঞ্চ, আর টিয়ে পাখিরা গেয়ে উঠল বৈশাখী গান। বনের পথঘাট পরিষ্কার করতে নেমে পড়ল হরিণ আর খরগোশরা, যেন সকালটা হয় নির্মল আর সতেজ।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বানর মহাশয়কে দেওয়া হলো বাজারের দায়িত্ব। সে আগের মতোই চঞ্চল, তবে এবার শেয়াল পণ্ডিত তাকে সাবধান করে দিল, ‘ভুল করবে না, সবকিছু বুঝে-শুনে আনবে।’ বানর এবার মাছ, ফল, পান্তা ভাতের উপকরণ, ইলিশ আর নানা শাকসবজি নিয়ে ফিরল। সে নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তালিকা মিলিয়ে সবকিছু এনেছে- এবার আর কোনো অসাবধানতা নেই দেখে সবাই স্বস্তি পেল।
সংস্কৃতিমন্ত্রী ময়ূর পাখি আয়োজন করল এক বর্ণিল অনুষ্ঠান। ভোরবেলায় কোকিলের কূজন আর পাখিদের সম্মিলিত কণ্ঠে শুরু হলো বর্ষবরণ। হরিণেরা নাচল, বানররা খেল দেখাল, কাঠবিড়ালিরা ছোট্ট নাটক মঞ্চস্থ করল, আর বনের প্রবীণ পেঁচা আবৃত্তি করল প্রকৃতি ও নতুন শুরুর কবিতা। শিশুপশুরা রঙিন ফুল দিয়ে বানাল মালা, যা দিয়ে তারা একে অপরকে শুভেচ্ছা জানাল।
আরও পড়ুন
এই সময় এক কোণে বসে ছিল হরিণশাবকরা। তাদের মা ধীরে বলল, ‘উৎসব মানে শুধু আনন্দ নয়, শৃঙ্খলাও দরকার। চারপাশের সবার নিরাপত্তার কথাও ভাবতে হয়।’ পাশে বাবা হরিণ যোগ করল, ‘দেখো, জ্ঞান আর সতর্কতা ছাড়া কোনো আয়োজনই সফল হয় না। পরিবারে যেমন বাবা শেখায় নিয়ম, তেমনি মা শেখায় যত্ন আর মমতা- দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।’
রাজা হুঙ্কার সিং এবার আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেও অনেক সংযত। তিনি বললেন, ‘আজ কোনো আতশবাজি নয়, কোনো ঝুঁকি নয়। প্রকৃতির সঙ্গে মিলেই আমাদের শুভ নববর্ষ উদযাপন।’ সবাই একসঙ্গে পান্তা-ইলিশ, ফল আর ভেষজ পানীয় দিয়ে ভোজ করল। কেউ গান গাইল, কেউ গল্প বলল- একটি শান্ত, সুন্দর মিলনমেলা তৈরি হলো বনের মাঝে।
দুপুরের পর আয়োজন হলো ছোট্ট এক বৈশাখী মেলা। সেখানে বাঁদরদের দোলনা, পাখিদের গান প্রতিযোগিতা, আর শেয়াল পণ্ডিতের গল্প শোনার আসর বসল। প্রাণীরা নিজেদের তৈরি করা জিনিস বিনিময় করল- কেউ ফল দিল, কেউ ফুল, কেউ বা ওষধি গাছের চারা। এতে করে তাদের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হলো।
দিনের শেষে সূর্য ডুবে গেলে বনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল প্রশান্তি। এই বর্ষবরণে জাঁকজমক কম, কিন্তু আনন্দ বেশি। সবাই বুঝল- নিজস্ব সংস্কৃতি, সতর্কতা আর পারস্পরিক সম্মানই আসল উৎসবকে অর্থবহ করে তোলে। সুন্দরবনের প্রাণীরা সেই দিন শিখল, সত্যিকারের শুভ নববর্ষ মানে শুধু নতুন বছর নয়- নতুন করে শেখা, একসঙ্গে থাকা আর ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া।
এএডি/