হাল আমলের হালখাতা

মোশফিকুর রহমান ইমন

শিক্ষা

দরজায় কড়া নাড়ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। অথচ রাজধানীর ঐতিহ্যের চারণভূমি পুরান ঢাকার অলিগলিতে এবার সেই চিরচেনা উৎসবের আমেজের

2026-04-11T04:47:21+00:00
2026-04-11T10:55:25+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
শিক্ষা
হাল আমলের হালখাতা
মোশফিকুর রহমান ইমন
প্রকাশ: শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:৪৭ এএম  আপডেট: ১১.০৪.২০২৬ ১০:৫৫ এএম  (ভিজিট : ৬৬)
হাল আমলের হালখাতা। ছবি : সময়ের আলো
দরজায় কড়া নাড়ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। অথচ রাজধানীর ঐতিহ্যের চারণভূমি পুরান ঢাকার অলিগলিতে এবার সেই চিরচেনা উৎসবের আমেজের দেখা নেই। নববর্ষের অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘হালখাতা’ ঘিরে যে প্রস্তুতির ধুম পড়ার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধুই নিয়মরক্ষার আয়োজন। শহর থেকে মফস্বল সবখানেই যেন লাল মলাটের সেই প্রাচীন আভিজাত্য এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বর্ণালংকারের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত তাঁতীবাজার এলাকা। বৈশাখ আসতে এখনও কয়েক দিন বাকি থাকলেও দোকানগুলোতে ধোয়া-মোছা আর রং করার কাজ চলছে দায়সারাভাবে। একসময় এই সময়ে গদিতে নতুন গালিচা বিছানো, দাওয়াত কার্ড বিতরণ আর মিষ্টির দোকানে আগাম অর্ডারের জন্য ব্যবসায়ীদের দম ফেলার সময় থাকত না। এখন সেই ব্যস্ততা অতীতের বিষয় হয়ে গেছে।

তাঁতীবাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী বিমল ধর দোকানের আসবাব পরিষ্কার করতে করতে আক্ষেপের সুরে বলেন, আগে বৈশাখের এক সপ্তাহ আগে থেকেই মহল্লায় উৎসব উৎসব ভাব থাকত। ক্রেতাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাম দিয়ে আসতাম। এখন ডিজিটাল যুগে মানুষ মোবাইলে টেক্সট পাঠাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এবার তো ঈদ গেল মাত্র কয়েকদিন আগে, মানুষের পকেটে টান আছে। তাই জৌলুস করে হালখাতা করার সাহস পাচ্ছি না। 

মানিকগঞ্জ জুয়েলার্সের মালিক সুভ্রত রায় বলেন, তাঁতীবাজারের নববর্ষ উদযাপনের সেই ঐতিহ্য আর জৌলুস এখন আর নেই। আগে উৎসবের যে ব্যাপক আয়োজন-আমেজ ছিল, এখন তার তুলনায় তা ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। এর মূল কারণ বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা এবং মানুষের মানসিক দুশ্চিন্তা। রুটি-রুজির অভাব আর ব্যবসায়িক দুরবস্থার কারণে উৎসবের সেই স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ হারিয়ে গেছে। এখন আমরা কেবল নিয়ম রক্ষার খাতিরে অত্যন্ত সংকীর্ণভাবে দিনটি উদযাপন করি।

আধুনিকতার থাবায় মান ‘লাল খাতা’ : মোগল সম্রাট আকবরের আমলে কর আদায়ের সুবিধার্থে যে হালখাতার প্রচলন হয়েছিল, তা আজ আধুনিক ব্যাংকিং ও সফটওয়্যারের কাছে নতি স্বীকার করছে। হাতে লেখা খাতার চেয়ে এখন ব্যবসায়ীরা কম্পিউটারের এক্সেল শিট কিংবা মোবাইল অ্যাপে হিসাব রাখা সহজ মনে করছেন। ফলে বকেয়া আদায়ের সেই সামাজিক মিলনমেলা আর প্রাণ ফিরে পাচ্ছে না।

পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা আলতাফ হোসেন বলেন, ছোটবেলায় দেখতাম হালখাতা মানেই ছিল নতুন জামা পরে বাবার সঙ্গে দোকানে দোকানে যাওয়া। মিষ্টির প্যাকেট আর ক্যালেন্ডার হাতে বাড়ি ফিরতাম। এখনকার ব্যবসায়ীরা শুধু নিয়ম মানতে একবেলা দোকান খোলে, কোনো উৎসব নেই। এই ঐতিহ্য আমাদের প্রাণের জিনিস ছিল এভাবে হারিয়ে যাবে ভাবিনি।
আরও পড়ুন

শাঁখারীবাজারের প্রাচীন ব্যবসায়িক কেন্দ্রগুলোতেও প্রস্তুতির রং ফিকে হয়ে এসেছে। যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীরা গদিযাত্রার মাধ্যমে বছর শুরু করতে খাতা কিনেছেন, কিন্তু বড় কোনো অনুষ্ঠানের তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির চর্চা ও আধুনিকায়নের প্রভাবে তারা এখন উৎসবের চেয়ে যান্ত্রিক লেনদেনকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

শাঁখারীবাজারের ইউনিক গোল্ডের মালিক বিশ্বনাথ বলেন, নববর্ষ আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও বর্তমান সামাজিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সেই উদ্দীপনা এখন আর নেই। চারপাশের অর্থনৈতিক অনটন আর মানসিক অস্থিরতা মানুষের উৎসবের মানসিকতাকে গ্রাস করছে। আগে যেখানে উৎসবের রং ছড়িয়ে পড়ত সর্বস্তরের মানুষের মাঝে এখন সেখানে টিকে থাকার লড়াইটাই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়িক মন্দা আর আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পুরোনো ঐতিহ্যের সেই জাঁকজমক আয়োজন আজ কেবল স্মৃতিতে টিকে আছে। আমরা এখন বড় কোনো আয়োজনের চেয়ে বরং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামেই বেশি ব্যস্ত, যার ফলে উৎসবের সেই প্রাণশক্তি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।

ইসলামপুরের পাইকারি কাপড় ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন বলেন, পুরোনো খাতাগুলো গুছিয়ে ফেলছি। নতুন খাতা কেনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু কার্ড ছাপানো বা আলোকসজ্জা এবার করছি না। সবকিছুর দাম বাড়তি, ক্রেতাদেরও সাড়া কম। গত দুই-তিন বছর ধরে হালখাতা মানেই হয়ে গেছে শুধু একটা খাতা পাল্টানো।

পুরান ঢাকার বাংলাবাজার এলাকার ব্যবসায়ী সমরেশ রায় বলেন, ঈদের কারণে মার্কেট ফাঁকা। এখন আর কার্ড দিয়ে কাকে দাওয়াত দেব? আমরা এবার ভেবেছি হালখাতাটা নামমাত্র সারব। হয়তো সামনের বছর পরিস্থিতি ভালো হলে বড় কিছু করা যাবে। ঐতিহ্য তো এখন শৌখিনতায় পরিণত হয়েছে।

এএডি/


  বিষয়:   হাল  আমল  হালখাতা 


Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: