চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নিদর্শন মহামুনি বিহার প্রাঙ্গণে সোমবার (১৩ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মহামুনি মেলা। প্রায় ১৮৪ বছরের প্রাচীন এ মেলা দেশজুড়ে আদিবাসী-বাঙালির এক অনন্য মিলনমেলা হিসেবে সুপরিচিত।
স্থানীয়দের কাছে এটি জুম্ম মেলা নামেও ব্যাপক পরিচিত। আয়োজকদের প্রত্যাশা এবারের আয়োজনে দুই লাখের বেশি মানুষের সমাগম ঘটবে।
চৈত্রসংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ উৎসবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষ দলে দলে মহামুনি বিহারে সমবেত হন প্রতি বছর। মন্দিরের প্রার্থনা ও উৎসবমুখর পরিবেশে পুরোনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ করেন।
মেলার প্রস্তুতি প্রসঙ্গে মহামুনি বিহার পরিচালনা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক কেতন মুৎসুদ্দী জানান, পুণ্যার্থীদের থাকার ও বিশ্রামের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যানবাহন চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে নেওয়া হয়েছে কঠোর নজরদারি। পাশাপাশি মঞ্চায়নের মাধ্যমে আদিবাসী সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পরিবেশনার আয়োজন রাখা হয়েছে।
মেলার ব্যবস্থাপনায়ও নজরদারি থাকবে, যাতে কোনো দোকান অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করতে না পারে। মেলায় আগত পুণ্যার্থীরা মহামুনি দিঘিতে স্নান শেষে বিহারে পূজা, সমবেত প্রার্থনা এবং বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করেন। তাদের রাত্রিযাপনের জন্য বিহার প্রাঙ্গণ ও চাইঙ্গা ঠাকুর উদ্যানে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এছাড়াও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনও নিয়েছে বহুমাত্রিক উদ্যোগ। এদিকে, মেলায় আগত আদিবাসীসহ সব দর্শনার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মেলা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে গ্রাম পুলিশ কাজ করবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান অর্পিতা মুৎসুদ্দি।
১৩ এপ্রিল আদিবাসীদের চৈত্রসংক্রান্তি অনুষ্ঠান শেষে ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে আনন্দ শোভাযাত্রার মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বিহারে এসে বুদ্ধ পূজায় অংশ নেবেন। পূজা আর্চনা শেষে মহামুনি সংস্কৃতি সংঘ ও তরুণ সংঘ আয়োজনে পৃথকভাবে যথাক্রমে মন্দির চত্বর ও ফনীতটী মঞ্চে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। পরে ১৪ ও ১৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় মহামুনি বটমূল খ্যাত ফনীতটি মঞ্চে গ্রামের দুই সামাজিক সংগঠন মহামুনি সংস্কৃতি সংঘ ও মহামুনি তরুণ সংঘের পৃথক আয়োজনে নৃত্য-গীত, নাটক, মূকাভিনয় ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করা হবে।
স্থানীয়দের মতে, এই মেলা শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন দৃঢ় করারও এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ইতোমধ্যে বিহার প্রাঙ্গণে গড়ে উঠছে কারুশিল্প, হস্তশিল্প, প্রসাধনী, মিষ্টান্ন ও মৌসুমি ফলের নানা দোকান। অতীতে মাসব্যাপী চলা এ মেলা বর্তমানে সপ্তাহব্যাপী আয়োজিত হলেও এর ঐতিহ্য ও আবেদন অটুট রয়েছে।
সর্বোপরি, মহামুনি মেলা বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিমসহ সব সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে এক অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রাহাতুল ইসলাম জানান, পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রাউজান থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাজেদুল ইসলাম পলাশ বলেন, সাদা পোশাকে টহলসহ সার্বক্ষণিক পুলিশি নজরদারি থাকবে।
সময়ের আলো/জোই