জ্বালানি সংকট : বিশ্ব মন্দার পদধ্বনি আরও স্পষ্ট

মো. জসিম উদ্দিন

মতামত

তেলের জাহাজ থেমে গেলে বিশ্ব অর্থনীতি ধীর হয়ে যায়। এটি গল্প নয়, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত চলমান

2026-04-12T15:54:08+00:00
2026-04-12T15:54:08+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
জ্বালানি সংকট : বিশ্ব মন্দার পদধ্বনি আরও স্পষ্ট
মো. জসিম উদ্দিন
প্রকাশ: রোববার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৫৪ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
তেলের জাহাজ থেমে গেলে বিশ্ব অর্থনীতি ধীর হয়ে যায়। এটি গল্প নয়, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত চলমান এই অস্থিতিশীলতা কোনো সাময়িক সংকট নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির এক কঠিন বাস্তবতা। জ্বালানি সংকটের এই লেলিহান শিখা এখন বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার পদধ্বনিকে আরও স্পষ্ট ও আতঙ্কজনক করে তুলছে। 

বর্তমান জ্বালানি সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল ভূ-রাজনীতি। বিশেষ করে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার সরাসরি সংঘাতের হুমকি এবং তাতে আমেরিকার কৌশলগত অংশগ্রহণ বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ এবং হরমুজ প্রণালি যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়, সেটির নিয়ন্ত্রক। ইসরাইলের ওপর ইরানের হামলা বা ইরানের পারমাণবিক ও তেল স্থাপনায় ইসরাইলের পাল্টা হামলার হুমকি বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আতঙ্ক তৈরি করেছে। আমেরিকা এখানে দ্বিমুখী সংকটে রয়েছে, একদিকে মিত্র ইসরাইলকে সুরক্ষা দেওয়া, অন্যদিকে ঘরোয়া বাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। এই সরাসরি উত্তজনা মূলত বৈশ্বিক মন্দার আগুনে ঘি ঢালছে।

বর্তমান বিশ্ব এক চরম অস্থির সময় পার করছে, যার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি বাজার। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা এবং ওপেকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যদি সরাসরি যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারে। এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়, পরিসংখ্যান অনুযায়ী তেলের দাম ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি অন্তত ০.৬ শতাংশ বেড়ে যায় এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে, কারণ জ্বালানি সংকটজনিত এই মুদ্রাস্ফীতি কেবল প্রথাগত আর্থিক নীতি দিয়ে পুরোপুরি দমন করা সম্ভব নয়। সামগ্রিকভাবে এই অস্থিতিশীল জ্বালানি বাজার বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এই বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পরপরই ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। এর ফলে গ্যাস ও তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যা সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত এবং পরিবহন ব্যয়কে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো বিকল্প জ্বালানি উৎসের সন্ধানে হিমশিম খাচ্ছে। 

ফলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বেড়ে গেছে। এই যুদ্ধ শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, খাদ্য নিরাপত্তাতেও প্রভাব ফেলেছে। কারণ রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ই বিশ্বে গম ও সার রফতানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে জ্বালানি ও খাদ্য, দুই খাতেই যে দ্বৈত সংকট তৈরি হয়েছে, তা বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কাকে আরও বাস্তব ও তীব্র করে তুলছে।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া। এ জন্য সৌদি আরব, কুয়েত ও ইরাকের তেল রফতানি স্থবির হয়ে পড়েছে। এই পথ বন্ধ হওয়া মানে বিশ্ব অর্থনীতি এক রাতে ২০ বছর পিছিয়ে যাওয়া। লজিস্টিক খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে ইউরোপ ও এশিয়ায় পণ্য উৎপাদন ও পরিবহন অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই শঙ্কার কারণেই বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছেন, যা মন্দার লক্ষণগুলোকে আরও প্রকট করছে।

জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হলো সাধারণ ভোক্তা। তেলের দাম বাড়লে সরাসরি জাহাজ ও ট্রাক ভাড়া বেড়ে যায়। এতে খাদ্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়। ২০২২-২৪ সময়কালে বিশ্বজুড়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি যে রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার মূলে রয়েছে সার ও জ্বালানির উচ্চমূল্য। যখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের আয়ের বড় অংশ কেবল জ্বালানি ও খাবারে ব্যয় হয়, তখন অন্যান্য পণ্যের চাহিদা কমে যায়। চাহিদার এই অভাব শিল্প কারখানাকে উৎপাদন কমাতে বাধ্য করে, যা থেকে শুরু হয় গণছাঁটাই ও বেকারত্ব। মন্দার এই চক্রটিই এখন বিশ্বজুড়ে ডালপালা মেলছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের দামামা ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এক চরম অশনিসংকেত। আমাদের জ্বালানি ও এলএনজি আমদানির বড় অংশই আসে এই অঞ্চল থেকে, ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের এই সময়ে জ্বালানির উচ্চমূল্য আমাদের কৃষি ও শিল্প উৎপাদনকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। 

বিশেষ করে সেচ ও সারের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এ ছাড়া দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি আমাদের রফতানিমুখী শিল্পকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। আমেরিকা-ইরান দ্বন্দ্ব দীর্ঘস্থায়ী হলে আমাদের এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক পথ আরও কণ্টকাকীর্ণ ও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।

জ্বালানি সংকট থেকে বাঁচতে ‘সবুজ জ্বালানি’ বা নবায়নযোগ্য শক্তির কথা বলা হলেও তার বাস্তবায়ন অত্যন্ত ধীর। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা এখনও ৮০ শতাংশের বেশি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ব মনে করেছিল জ্বালানি বহুমুখীকরণ হবে একমাত্র পথ, কিন্তু ভূ-রাজনীতির জটিলতা সেই গতিকে মন্থর করে দিয়েছে। উন্নত দেশগুলো এখন নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে। এই অস্থিরতা জলবায়ু পরিবর্তন রোধের লড়াইকে যেমন বাধাগ্রস্ত করছে, তেমনি জ্বালানি স্বনির্ভরতার স্বপ্নকেও দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের পূর্বাভাস বলছে, বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলো, আমেরিকা, চীন ও ইউরো জোন একযোগে শ্লথগতির মুখে রয়েছে। জাপানের অর্থনীতিতে ইতিমধ্যেই সংকোচনের চিহ্ন দেখা গেছে। যখন বড় অর্থনীতিগুলো ধুঁকতে থাকে, তখন রতানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বিপদ ঘনিয়ে আসে। জ্বালানি সংকটের কারণে জার্মানিতে শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ায় তা পুরো ইউরোপে মন্দার ঢেউ ছড়াচ্ছে। মন্দার এই পদধ্বনি এখন আর কেবল সম্ভাবনা নয়, বরং এক কঠোর বাস্তবতা।

উত্তরণের পথরেখা : প্রথমত বাংলাদেশকে বহুমুখী জ্বালানি উৎসের দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। একক অঞ্চলের ওপর নির্ভর না করে রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য বা অন্যান্য বিকল্প বাজার থেকে তেল ও জ্বালানি সরবরাহের নিরাপদ পথ তৈরি করতে হবে, যাতে বৈশ্বিক অস্থিরতায় দেশীয় বাজার স্থিতিশীল থাকে।

দ্বিতীয়ত সাগর ও স্থলে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ত্বরান্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস খাত শক্তিশালী করলে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে আরও স্থিতিশীলতা আসবে।

তৃতীয়ত সরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে জ্বালানি ব্যবহারে সর্বোচ্চ মিতব্যয়িতা নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত প্রযুক্তি, সচেতন ব্যবহার এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে শুধু খরচই কমবে না, পরিবেশের ওপর চাপও হ্রাস পাবে। চতুর্থত শিল্প ও উৎপাদন খাতে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও অন্যান্য সবুজ জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ বাড়িয়ে করছাড় ও প্রণোদনার মাধ্যমে রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে হবে, যাতে অর্থনীতি সব ধরনের বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলায় সক্ষম হয়।

জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক মন্দার এই পদধ্বনি আসলে মানবজাতির বিভক্তিরই ফল। আমেরিকা, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার এই আধিপত্যের লড়াই বিশ্বকে এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুদ্ধ ও সংঘাত কখনোই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনতে পারে না। বিশ্ব নেতৃত্ব যদি এখনই সংযত না হয় এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ঐকমত্যে না পৌঁছায়, তবে সামনের মন্দা হবে ত্রিশ দশকের চেয়েও ভয়াবহ। 

অন্ধকার রাজপথ পাড়ি দিয়ে আমাদের আলোর দিকে এগোতে হবে, আর সেই আলোর নাম হলো পারস্পরিক সহযোগিতা ও জ্বালানি স্বনির্ভরতা।

লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর

সময়ের আলো/জেডআই



  বিষয়:   তেল  জ্বালানি  মতামত  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: