বাংলা ক্যালেন্ডার বাঙালির সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের একটি মৌলিক উপাদান এবং আমাদের উৎসব, কৃষি, সামাজিক জীবন- সবকিছুই এই বর্ষপঞ্জির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। কিন্তু এই ক্যালেন্ডারের ভেতরে এমন কিছু কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নাক্ষত্র ক্রান্তীয় বর্ষগণনার পার্থক্য, সংক্রান্তির সরে যাওয়া এবং দুই বাংলায় ভিন্ন পদ্ধতির ব্যবহার- এসব মিলিয়ে একটি সংস্কারের প্রয়োজন অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
বঙ্গাব্দ মূলত একটি সৌর ক্যালেন্ডার, যেখানে সূর্য যখন এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করে অর্থাৎ সংক্রান্তি ঘটে তখন একটি নতুন মাস শুরু হয় এবং বৈশাখ মাসে সূর্য মেষ রাশিতে থাকে, জ্যৈষ্ঠে বৃষে, আশ্বিনে কন্যায়- এভাবে ১২টি রাশি ধরে ১২টি মাস নির্ধারিত হয়। কিন্তু এই সৌর কাঠামোর ভেতরে রয়েছে একটি চান্দ্র ঐতিহ্য। কারণ মাসগুলোর নাম এসেছে চিত্রা, বিশাখা, জ্যেষ্ঠা, শ্রবণা ইত্যাদি নক্ষত্র থেকে এবং পূর্ণিমার দিনে চাঁদ যে নক্ষত্রে অবস্থান করত সেই নক্ষত্রের নামেই মাসের নামকরণ হয়েছে। অর্থাৎ নাম চান্দ্র হলেও গণনা সৌর- এই দ্বৈধতা বাংলা ক্যালেন্ডারের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
পৃথিবীর বছর পরিমাপের দুটি পদ্ধতি রয়েছে- নাক্ষত্র বছর প্রায় ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা ৯ মিনিট এবং ক্রান্তীয় বছর প্রায় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৯ মিনিট। এই প্রায় ২০ মিনিটের পার্থক্য আপাতত উপেক্ষণীয় হলেও প্রতি বছর জমতে জমতে প্রায় প্রতি ৭২ বছরে তা ১ দিন হয়ে যায়। যার ফলে বিষুব সংক্রান্তি ২০/২১ মার্চ স্থির থাকলেও মেষ সংক্রান্তি বর্তমানে ১৩/১৪ এপ্রিলে এসে পড়েছে এবং ধীরে ধীরে আরও পিছিয়ে যাচ্ছে।
এই ঘটনাকে বলা হয় অয়নাংশ বাপ্রেসিশন অফ দ্য একুইনোক্সাস। এর দীর্ঘমেয়াদি ফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ পহেলা বৈশাখ ক্রমে এপ্রিল থেকে মে, তারপর জুনে সরে যাবে, দুর্গাপূজা শরৎ ছেড়ে শীত বা বসন্তে চলে যাবে, এবং ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলোর সঙ্গে প্রকৃত ঋতুর সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। অতএব নাক্ষত্র পদ্ধতি স্বল্পমেয়াদে কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা অগ্রহণযোগ্য।
বাংলাদেশে ষাট থেকে নব্বই দশকে বাংলা ক্যালেন্ডারের সংস্কার এবং ২০১৯ সালে আরেকটি সংশোধনী করা হয়। এর ফলে বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস ৩১ দিন, কার্তিক থেকে মাঘ ও চৈত্র মাস ৩০ দিন, ফাল্গুন মাস সাধারণ বছরে ২৯ দিন ও গ্রেগরিয়ান লিপইয়ারে ৩০ দিন করা হয় এবং পহেলা বৈশাখ স্থিরভাবে ১৪ এপ্রিল নির্ধারিত হয়। এই পদ্ধতি ব্যবহারিকভাবে সহজ ও কার্যকর হলেও অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে এখনও সংক্রান্তিনির্ভর সনাতন পঞ্জিকা চালু রয়েছে। এতে মাসের দৈর্ঘ্য ২৯-৩২ দিনের মধ্যে পরিবর্তিত হয় এবং সংক্রান্তি মুহূর্তের গণনার ওপর নির্ভর করে তারিখ নির্ধারিত হয়। ফলে একই বাংলা বছর হলেও দুই অঞ্চলে তারিখ আলাদা হয়ে গেছে এবং এটি একটি স্থায়ী বিভাজনে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে পৌষ মাস থেকে আশ্বিন পর্যন্ত দুই বাংলার তারিখে ১ দিন এবং কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে ২ দিনের পার্থক্য থাকে, ২০১৯ সালের আগে এমনকি কিছু মাসে ৩ দিনের পার্থক্যও দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায় ভারতে ড. মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে ১৯৫৭ সালে একটি জাতীয় ক্যালেন্ডার চালু করা হয় যা সম্পূর্ণ ক্রান্তীয় পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে এটি জনপ্রিয় হয়নি। অন্যদিকে চীন একটি সফল সমন্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করেছে যেখানে তারা ২৭ নক্ষত্রের পরিবর্তে সূর্যের ২৪টি বার্ষিক অবস্থান ব্যবহার করে চান্দ্র ও সৌর পদ্ধতির সমন্বয় করেছে এবং ফলে তাদের ক্যালেন্ডার ঋতুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
বাংলা ক্যালেন্ডারের সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে- ঋতুর সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় অনুশীলন রক্ষা করা এবং ব্যবহারিক ও প্রশাসনিক সুবিধা নিশ্চিত করা, এবং এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করতে হলে একটি সুসমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত সংস্কারের প্রথম ধাপ হতে পারে বছর শুরুর পুনর্নির্ধারণ, যেখানে বাংলা বছর ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু করা যেতে পারে। কারণ নাক্ষত্র চৈত্রসংক্রান্তি সাধারণত ১৪ এপ্রিল ঘটে এবং বাংলা ঐতিহ্য অনুযায়ী সংক্রান্তির পর দিন মাস শুরু হয়। এতে ঐতিহ্য ও বাস্তবতার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকবে এবং একই সঙ্গে এই পদ্ধতিতে ২১ ফেব্রুয়ারি হবে ৮ ফাল্গুন। ফলে ঐতিহাসিক সামঞ্জস্যও রক্ষা পাবে। দ্বিতীয় প্রস্তাবনা হলো মাসের দৈর্ঘ্যরে বৈজ্ঞানিক বিন্যাস। কারণ সৌরগতির প্রকৃত ভিন্নতার জন্য মাসের দৈর্ঘ্য সমান রাখা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
তাই বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাস ৩১ দিন, আষাঢ় ৩২ দিন, পৌষ ২৯ দিন এবং অন্যান্য মাস ৩০ দিন রাখা যেতে পারে। কারণ পৃথিবী অপসূরের সময় ধীরে চলে বলে সেই সময়ের মাস বড় হয় এবং উপসূরের সময় দ্রুত চলে বলে সেই সময়ের মাস ছোট হয়। তৃতীয় প্রস্তাবনায় চৈত্র মাস ও অধিবর্ষ নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে চৈত্র সাধারণ বছরে ৩০ দিন এবং অধিবর্ষে ৩১ দিন হবে এবং যে বছর মেষ সংক্রান্তি রাত ১২টার পর ঘটে সেই বছর অধিবর্ষ হিসেবে গণ্য হবে। চতুর্থ প্রস্তাবনা হিসেবে শুধু অধিবর্ষে মাসগুলোর দৈর্ঘ্যে বিকল্প বিন্যাস আনা যেতে পারে, যেমন জ্যৈষ্ঠ ৩২ দিন, আষাঢ় ও আশ্বিন মাস ৩১ দিন, পৌষ ৩০ দিন এবং অঘ্রাণ ও মাঘ ২৯ দিন, যা সনাতন পঞ্জিকায় প্রচলিত নমনীয়তার প্রতিফলন। তবে এই প্রস্তাবটি সাধারণ স্বার্থে বর্জনও করা যেতে পারে। পঞ্চম প্রস্তাবনা একটি দীর্ঘমেয়াদি বৈপ্লবিক চিন্তা হতে পারে যেখানে বছর শুরু হবে ২১ মার্চ বিষুব সংক্রান্তি থেকে এবং চৈত্র হবে প্রথম মাস, যা পুরোপুরি ক্রান্তীয় বর্ষগণনা ভিত্তিক হবে।
তবে এই পরিবর্তন তাৎক্ষণিক বাস্তবায়নে জটিলতা রয়েছে। দুই বাংলায় একটি অভিন্ন ক্যালেন্ডার চালু করা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে তা অত্যন্ত কঠিন। কারণ বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সংস্কার গ্রহণ করেছে, অন্য দিকে পশ্চিমবঙ্গ ধর্মীয় কারণে সনাতন পদ্ধতি বজায় রাখবে। ফলে ভবিষ্যতেও এই দ্বৈততা বজায় থাকার সম্ভাবনাই বেশি। একটি দ্বৈত পঞ্জিকা ব্যবস্থা সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে, যেখানে নাগরিক জীবনের জন্য একটি সংস্কারকৃত সৌর ক্যালেন্ডার এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য একটি নাক্ষত্র পঞ্জিকা ব্যবহৃত হবে, এতে প্রশাসনিক সুবিধা বজায় থাকবে এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যও অক্ষুণ্ন থাকবে।
সবশেষে বলা যায় বাংলা ক্যালেন্ডার একটি অনন্য ঐতিহাসিক সৃষ্টি যেখানে নক্ষত্র, সূর্য, চাঁদ এবং মানবজীবনের বাস্তবতা একসূত্রে গাঁথা, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ভেতরের বৈজ্ঞানিক সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সনাতন পদ্ধতি আমাদের ঐতিহ্যের ধারক হলেও দীর্ঘমেয়াদে ঋতুর সঙ্গে সামঞ্জস্য হারায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের আধুনিক সংস্কার ব্যবহারিক হলেও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্পূর্ণ। তাই প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান যেখানে বিজ্ঞান ও ঐতিহ্য পরস্পরের পরিপূরক হবে। সংস্কার মানে ভাঙন নয় বরং টিকে থাকার নতুন পথ তৈরি করা। তাই বাংলা ক্যালেন্ডারকে ভবিষ্যতের জন্য প্রাসঙ্গিক রাখতে হলে এখনই আমাদের সচেতন হতে হবে এবং বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ সময় এসেছে বাংলা ক্যালেন্ডারকে নতুনভাবে ভাবার।
ব্যাংকার ও গবেষক
সময়ের আলো/আআ