বাংলা নববর্ষ শুধু পঞ্জিকার পাতায় তারিখ বদলের আনুষ্ঠানিকতা নয়— এটি বাংলার মাটি, মানুষ ও কৃষিজীবনের সঙ্গে শতাব্দীপ্রাচীন এক নিবিড় সম্পর্কের নাম। কিন্তু সময়ের বিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরকেন্দ্রিক সংস্কৃতির প্রভাব— সব মিলিয়ে সেই ঐতিহ্য আজ প্রান্তিক জনপদে অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। উত্তরের জেলা গাইবান্ধার গ্রামাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, পহেলা বৈশাখ এখনও আসে কিন্তু তার প্রাণবন্ত গ্রামীণ রূপ যেন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
একসময় বৈশাখ মানেই ছিল গ্রামবাংলার প্রাণের উৎসব। জেলার বিভিন্ন এলাকায় জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণ, খাস জমির খোলা মাঠ কিংবা বট-পাকুড়ের ছায়াঘেরা চত্বরে হতো বৈশাখী মেলা। বছরের অন্য সময় যেসব মাঠে গরু-ছাগল চরত, সেই মাঠই পহেলা বৈশাখে হয়ে উঠত উৎসবের কেন্দ্র। কৃষক, কারুশিল্পী, ব্যবসায়ী— সবাই অপেক্ষা করতেন এই একটি দিনের জন্য।
মেলায় উঠত মাটির তৈজসপত্র, বাঁশ-বেতের সামগ্রী, মিষ্টি আর খেলনা। কামার, কুমারসহ নানা পেশার মানুষ বৈশাখ ঘিরে মাসজুড়ে প্রস্তুতি নিতেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ মিলিত হতেন এই লোকজ উৎসবে। বৈচিত্র্যময় চৈতালি ফসল ঘরে তোলার পর কৃষকরা পেতেন সামান্য অবসর আর সেই অবসরেই বসত গানের আসর, তৈরি হতো ছাতুসহ নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার।
চৈত্রসংক্রান্তির দিনটিও ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এদিন বসত ‘চড়ক মেলা’। পহেলা বৈশাখের সকাল শুরু হতো গবাদিপশুর গোসল করানো, নিজেদের পরিচ্ছন্নতা আর নতুন পোশাকে মেলায় যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে। কোথাও দশ রকম শাক দিয়ে ভাত, কোথাও বা চৈত্রজুড়ে মাছ না খাওয়ার পর বৈশাখে বিশেষভাবে মাছ খাওয়ার রীতি— সব মিলিয়ে ছিল বৈচিত্র্যে ভরা এক সামাজিক জীবন।
কিন্তু সেই চিত্র এখন আর নেই। গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যেসব স্থানে একসময় বৈশাখী মেলা বসত, সেসব জায়গার অনেকগুলোতেই এখন আর মেলা হয় না। কোথাও জায়গা দখল হয়ে গেছে, কোথাও আগ্রহ হারিয়েছে মানুষ। বট, পাকুড় গাছের ছায়াঘেরা সেই চিরচেনা পরিবেশও অনেক জায়গায় বিলুপ্ত।
কৃষিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। ছোলা, খেসারি, মটরের মতো চৈতালি ফসলের বৈচিত্র্য এখন আর দেখা যায় না। সেচনির্ভর বহুমুখী কৃষিতে কৃষকের আর অবসর নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশাখের প্রথম বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীলতাও কমে গেছে। এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার বদলে কৃষকের ভরসা সেচ পাম্প।
গাইবান্ধা সদরের রাধাকৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক আবদুস সোবহান ও মন্টু মিয়া বলেন, খরা, বন্যা আর এনজিওর ঋণের কিস্তির চাপে তাদের জীবন দিশাহারা। সার ও সেচের বাড়তি খরচ যোগাতে গিয়ে উৎসবের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
গ্রামীণ সমাজের সাংস্কৃতিক কাঠামোতেও এসেছে পরিবর্তন। একসময় পহেলা বৈশাখে গ্রামে জারি-সারি, বাউল-ভাটিয়ালীর আসর বসত, যা এখন প্রায় বিলুপ্ত। পালপাড়াগুলো একসময় মাটির তৈজসপত্রের কারণে জমজমাট থাকলেও, প্লাস্টিকের পণ্যের আগ্রাসনে সেই শিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটে।
মৃৎশিল্পীরা জানান, মেলা কমে যাওয়ায় তাদের পণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমেছে। ফলে বৈশাখকেন্দ্রিক যে অর্থনৈতিক চক্রটি ছিল, সেটিও ভেঙে পড়েছে।
ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও বদল স্পষ্ট। আগে হালখাতা ছিল বৈশাখের অন্যতম আকর্ষণ। দোকানে দোকানে নতুন খাতা খুলে মিষ্টি বিতরণের মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়ন করা হতো। এখন সেই প্রথা অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ।
শহরের ব্যবসায়ী শংকর সেন জানান, এখন সাপ্তাহিক লেনদেনের কারণে আগের মতো বাকির খাতার প্রচলন নেই। ফলে হালখাতার জৌলুসও কমে গেছে।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। বৈশাখী আয়োজন কমে যাওয়ায় শিল্পীদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে।
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী গাইবান্ধা জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক শিরিন আকতার বলেন, গ্রামীণ লোকজ উৎসব ধীরে ধীরে মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আধুনিক নাগরিক উৎসবে রূপ নিচ্ছে, যা আমাদের সাংস্কৃতিক শেকড়ের জন্য উদ্বেগজনক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নগরায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষির ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন— এই চারটি বড় কারণ গ্রামীণ বৈশাখী সংস্কৃতির এই রূপান্তরের পেছনে কাজ করছে। শহরের মঙ্গল শোভাযাত্রা, কনসার্ট বা প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন এখন বৈশাখের প্রধান চিত্র হয়ে উঠেছে, যেখানে গ্রামীণ মেলা ও লোকজ সংস্কৃতি ক্রমেই প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। তবে সবকিছুর পরও আশার আলো একেবারে নিভে যায়নি। এখনও কিছু কিছু গ্রামে ছোট পরিসরে হলেও বৈশাখী মেলা বসে। কম ভিড়, কম আয়োজন, তবু সেখানে টিকে আছে স্মৃতির এক টুকরো আলো।
বাংলা নববর্ষের এই পরিবর্তিত চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়— এটি কেবল একটি উৎসব নয় বরং আমাদের শেকড়ের সঙ্গে সংযোগের প্রতীক। সেই সংযোগ রক্ষা করা না গেলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বৈশাখ চিনবে শুধু শহুরে উৎসব হিসেবেই, গ্রামবাংলার প্রাণের উৎসব হিসেবে নয়।
এফআর