বাগেরহাটের সেই দীঘির ঘাটে নিরুপায় কুকুরটার ছটফটানি আর জলের তলা থেকে ধেয়ে আসা ঠান্ডা মৃত্যুর দৃশ্যটা কোনো সাধারণ প্রাণীর মৃত্যু না। এটা আমাদের সামগ্রিক মানবিকতার গায়ে গভীর একটা ক্ষতের দাগ ফেলে। ভিডিওটা যখন সামাজিকমাধ্যমে ছড়ায়, তখন চারদিকে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। কেউ এটাকে পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতা বলে, আবার কেউ স্রেফ দুর্ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যায়। কিন্তু এই দুই মেরুর তর্কের ভেতরে যে সত্যটা হারিয়ে যায়, সেটা হলো প্রাণের প্রতি আমাদের সংবেদনশীলতা। একটা অবলা প্রাণী যখন কয়েক ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক মানুষের চোখের সামনেই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে, তখন আমাদের মানবিকতা সত্যিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। আমরা কেন পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠি, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের অতীতের পাতায় চোখ ফেরাতে হয়।
বাগেরহাট আমার কাছে কোনো অচেনা জায়গা না। দাদাবাড়ি আর নানাবাড়ি- দুটোই সেখানেই। ছোটবেলা থেকেই যাওয়া-আসা ছিল নিয়মিত। পাঁচ বোনের পর একমাত্র ছেলে হওয়ায় ছোটবেলায় নানা অসুখে ভুগতাম। তখন আমার সুস্থতার আশায় বাবা-মা খানজাহান আলীর মাজারে গিয়ে কালা পাহাড়ের নামে মুরগি মানত করতেন। বয়স তখন পাঁচ-ছয় হবে। ফেসবুক কী, কেউ জানত না; ‘ভাইরাল’ শব্দটাই ছিল না আমাদের চেনাজানা। প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা। তখন মাজারে জীবন্ত মুরগি কুমিরের দিকে ছুড়ে দেওয়া হতো- একটা না, একটার পর একটা। ছোট্ট মনে সেই দৃশ্য গভীর ছাপ ফেলেছিল। কারণ বাড়িতে আমার পোষা মুরগি ছিল, যাদের আমি খেলাধুলার সঙ্গী মনে করতাম।
চল্লিশ বছর পর আজ যখন একই জায়গায় একটি কুকুরকে কুমির টেনে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও দেখি, তখন মনে হয় সময় বদলেছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের মনস্তত্ত্ব একটুও বদলায়নি। তবে আশার কথা হলো, প্রশাসন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি তৎপর। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে এবং মৃত প্রাণীর ময়নাতদন্তও সম্পন্ন হয়েছে। যদিও এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। একটি বীভৎস দৃশ্য ভাইরাল হওয়ার আগেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সরকারি বা প্রশাসনিক তৎপরতা কেবল ঘটনার পরেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
ঘটনাটি নিয়ে এখন নানা মুখরোচক ব্যাখ্যা শোনা যাচ্ছে। কেউ বলছেন এটি মাজারের ঐতিহ্য নষ্ট করার জন্য একটি বিশেষ মহলের অপপ্রচার। আবার কারও মতে এটি মাজারে চলে আসা দীর্ঘদিনের ‘প্রাণী বলি’রই অংশ। মজার ব্যাপার হলো, আমরা যখনই কোনো সংকটে পড়ি, তখন কোনো না কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বের করে নিজেদের দায় এড়াতে চাই। মাজার কর্তৃপক্ষ বলছে কুকুরটি পাগল ছিল এবং এটি একটি দুর্ঘটনা। স্থানীয় কিছু মানুষ বলছে এটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের লোকদের কাজ।
কিন্তু কুকুরটি যদি পাগলও হয়ে থাকে, তবে তাকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই করা হলো না- এটি আক্ষেপের বিষয়। আমরা অবলা প্রাণীর যন্ত্রণার চেয়ে নিজেদের ধর্মীয় বা মতাদর্শিক ব্যাখ্যাকে বড় করে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। একটি পাগল প্রাণীকে সুস্থ করার দায়িত্ব সমাজের ছিল। তাকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ফেলে দেওয়াটাই একমাত্র সমাধান হতে পারে না। ভিডিওতে কুকুরটির সেই আকুল দৃষ্টি, যা পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভিড়ের দিকে নিবদ্ধ ছিল, সেটি আমাদের বিবেকে দংশন করা উচিত ছিল। আমরা কেবল ভিডিও করতেই শিখেছি, হাত বাড়িয়ে কোনো প্রাণ বাঁচাতে শিখিনি। আজ বিচার আপনাদের হাতেই ছেড়ে দিলাম। এই ঘটনাকে স্রেফ দুর্ঘটনা না বলে আমাদের পচে যাওয়া মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন বলা ভালো। কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে দোষী সাব্যস্ত না করে একবার আমাদের নিজেদের আয়নায় মুখ দেখা উচিত।
আমাদের সমাজ অন্ধ বিশ্বাসের মোড়কে আসলে এক ধরনের সংবেদনহীনতাকেই প্রশ্রয় দিচ্ছে। ঐতিহ্য মানে কেবল নিষ্ঠুরতা টিকিয়ে রাখা নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাকে আরও মানবিক করে তোলা। কুমিরকে জ্যান্ত প্রাণী না খাওয়াইয়ে বাজার থেকে আনা মাংস খাওয়ানো খুব কঠিন কোনো কাজ ছিল না। এর উত্তর আমাদের সবারই জানা, কিন্তু মানতে আমরা নারাজ। কারণ আমরা সংস্কারের চেয়ে কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরতেই বেশি পছন্দ করি। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রথাগুলো আধুনিক হওয়া প্রয়োজন। যে মানুষ একটি কুকুরের কষ্টে বিচলিত হয় না, তার পক্ষে অপর মানুষের দুঃখেও সহজে বিচলিত হওয়া কঠিন।
আমাদের চারপাশটা দিন দিন কেমন যেন যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। বনের বানরকে ঢিল মারা থেকে শুরু করে অতিথি পাখি বিষ দিয়ে মারা- সবই যেন আমাদের বিনোদনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শখ মিটে গেলে পোষা প্রাণীকে রাস্তায় ফেলে দেওয়া এখন অনেকের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। গলির কুকুরের লেজে বাজি ফোটানো বা বিড়ালের ছানাকে বস্তাবন্দি করে পানিতে ফেলে দেওয়া কোনো সুস্থ মানসিকতার পরিচয় নয়। প্রতিবেশীকে জব্দ করতে তার প্রিয় পোষা প্রাণীটিকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা বিকৃত মস্তিষ্কের লক্ষণ। আমাদের শিশুরা অবলা প্রাণীকে কষ্ট দিয়ে কেন আনন্দ পায়, সেই শিক্ষার উৎস আমাদের খোঁজা দরকার। আমাদের মায়েদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার মা ছোটবেলায় পাড়ার ছেলেদের পশুপাখিকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতেন। সেই চেষ্টার মূল্য আজ উপলব্ধি করি।
আসলে পশুপাখির প্রতি নিষ্ঠুরতা কেবল একটি আইনি অপরাধ নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। যতক্ষণ না আমরা প্রতিটি প্রাণকে সম্মান করতে শিখব, ততক্ষণ আমাদের কোনো উন্নয়নই সার্থক হবে না। বাগেরহাটের ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ধর্ম বা ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে নিষ্ঠুরতাকে জায়েজ করার দিন শেষ হয়ে এসেছে। আমাদের উচিত একটি সুন্দর সহাবস্থানের সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ আর প্রাণী উভয়েই নিরাপদে থাকবে। প্রাণীর প্রতি মমতাকে বিলাসিতা মনে না করে একটি প্রাণ বাঁচানোকে আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
প্রশাসনের কাছে আবেদন থাকবে, তদন্ত দ্রুত শেষ করুন এবং যদি কেউ সত্যিই দোষী হন, তাকে আইনের আওতায় আনুন। দুয়েকটি ঘটনায় কার্যকর শাস্তি হলে অনেকে সতর্ক হবে। পাশাপাশি প্রাণী নিষ্ঠুরতা রোধে সচেতনতামূলক উদ্যোগও দরকার। শুধু আইন যথেষ্ট নয়, মানসিকতার পরিবর্তন না হলে আইন কাগজেই থাকে। প্রশাসনের নজরদারি আর আমাদের ব্যক্তি সচেতনতা একসঙ্গে চলা প্রয়োজন। আমরা সেই দিনের অপেক্ষায় থাকব যখন প্রতিটি প্রাণীর বেঁচে
থাকার অধিকার রাষ্ট্র ও সমাজ সমানভাবে নিশ্চিত করবে এবং আমাদের আর ভাইরালের অপেক্ষায় বসে থাকতে হবে না।
বাগেরহাটের দীঘির কুমির শতাব্দীর সাক্ষী। চল্লিশ বছর পর সেই একই জায়গার ঘটনা নিয়ে আবার প্রশ্ন উঠছে যে আমরা সত্যিই বদলেছি কি না, নাকি আমাদের বিবেক এভাবেই ছাই হয়ে পড়ে থাকবে। তদন্ত প্রতিবেদন হয়তো আসবে, হয়তো কেউ শাস্তিও পাবে। কিন্তু আমাদের মনের ভেতরের সেই পচন তাতে দূর হবে কি না তা নিশ্চিত নয়।
চলুন, আমরা অন্তত নিজেদের জায়গা থেকে একটু মানবিক হওয়ার চেষ্টা করি। একটি বিড়ালের ছানা বা পথের কুকুরের প্রতি সামান্য মমতা দেখানোই হতে পারে আমাদের মানবিক হওয়ার প্রথম পাঠ। উত্তরটা আমাদের সবার ভেতরেই আছে, শুধু সাহস করে তা মেনে নেওয়ার অপেক্ষা। সেই ছোটবেলায় দীঘির পাড়ে যখন একের পর এক জ্যান্ত মুরগি কুমিরের মুখে ছুড়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন আমার শিশুতোষ মন ডুকরে কেঁদে প্রতিবাদ করেছিল।
আমার সেই প্রতিবাদ ছিল প্রাণের টানে, আমার নিজের পোষা মুরগির ছানাগুলোকে বাঁচানোর এক আকুল আর্তি থেকে। কিন্তু সেদিন আমার সেই প্রতিবাদ কেউ শোনেনি, কেউ সেই নিষ্ঠুরতা থামাতে এগিয়ে আসেনি। আজ এত বছর পরও যখন চোখের সামনে একই নিষ্ঠুরতা দেখি, তখন মনে হয় আমাদের সমাজ আজও সেই শিশুর আর্তনাদ শুনতে শেখেনি।
প্রাবন্ধিক ও বিশ্লেষক
সময়ের আলো/আআ