বাংলাদেশে এসএসসি পরীক্ষা মানেই যেন এক অদৃশ্য চাপ, এক অজানা ভীতি। শিক্ষার্থীদের কাছে এটি শুধু একটি পাবলিক পরীক্ষা নয়, বরং জীবনের প্রথম বড় ‘মাইলফলক’। পরিবার, সমাজ, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- সব জায়গা থেকেই এক ধরনের অঘোষিত প্রত্যাশার বোঝা শিক্ষার্থীদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে অনেকের কাছে এসএসসি হয়ে ওঠে আতঙ্কের নাম। অথচ শিক্ষা হওয়া উচিত আনন্দময়, প্রেরণাদায়ী ও মানবিক বিকাশের একটি প্রক্রিয়া। তাই সময় এসেছে এই ভীতির দেয়াল ভেঙে প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার।
আমাদের সমাজে পরীক্ষাকে ঘিরে যে মানসিকতা তৈরি হয়েছে, তা অনেকাংশেই প্রতিযোগিতাকেন্দ্রিক। কে কত নম্বর পেল, কে প্রথম হলো- এসব প্রশ্নের মধ্যেই যেন শিক্ষার সাফল্যকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর মেধা, চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা কিংবা নৈতিক মূল্যবোধ- এসব কি শুধুই একটি নম্বর দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব? বাস্তবতা বলছে, তা কখনোই সম্ভব নয়। অথচ আমরা সেই অসম্পূর্ণ পরিমাপের ভিত্তিতেই শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করছি, যা তাদের মধ্যে অযথা ভীতি ও হতাশা তৈরি করছে।
এসএসসি পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের জীবনে যে চাপ তৈরি হয়, তা অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পড়াশোনা, কোচিং, মডেল টেস্ট- সব মিলিয়ে তারা যেন একটি নিরন্তর দৌড়ে অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে বিনোদন, বিশ্রাম কিংবা সৃজনশীল চর্চার সুযোগ খুবই সীমিত হয়ে যায়। ফলে তাদের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হলে শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, এমনকি জীবনের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
এই বাস্তবতায় অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় অজান্তেই তারা সন্তানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেন। ‘তোমাকে অবশ্যই ভালো করতে হবে’, ‘অমুকের চেয়ে কম নম্বর পেলে চলবে না’-এ ধরনের কথাগুলো শিক্ষার্থীদের মনে ভয় ও অস্থিরতা তৈরি করে। এর পরিবর্তে তাদের উচিত সন্তানের মানসিক অবস্থাকে বোঝা, তাদের প্রচেষ্টাকে মূল্যায়ন করা এবং ব্যর্থতাকে জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখানো। একটি নিরাপদ ও সহানুভূতিশীল পারিবারিক পরিবেশই পারে একজন শিক্ষার্থীকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে।
শিক্ষকদের ভূমিকাও এখানে অপরিসীম। তারা শুধু জ্ঞানদাতা নন, বরং একজন শিক্ষার্থীর মানসিক গঠনের অন্যতম কারিগর। পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক তৈরি না করে বরং এটিকে একটি স্বাভাবিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত। ক্লাসরুমে উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশ তৈরি করা, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেওয়া এবং ভুলকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা- এসবই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে সহায়ক।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতার প্রবণতা এখনও প্রবল। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য শুধু বইয়ের নির্দিষ্ট অংশ মুখস্থ করে, কিন্তু বিষয়বস্তুর গভীরে যাওয়ার সুযোগ পায় না। এর ফলে তাদের সৃজনশীল চিন্তাশক্তি বিকশিত হয় না। এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষার পদ্ধতিতে এমন পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, যেখানে বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন, বাস্তবভিত্তিক সমস্যা সমাধান এবং সৃজনশীল চিন্তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ফলাফল প্রকাশের পর আমরা প্রায়ই দেখি, শুধু সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়েই প্রচার করা হয়। এতে অন্য শিক্ষার্থীরা নিজেদের কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। এর পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের সাফল্যের গল্প যেমন- সংগ্রাম করে এগিয়ে যাওয়া, ভিন্নপথে সফল হওয়া- এসব তুলে ধরা উচিত। যাতে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে যে এটাই সাফল্যের একমাত্র পথ নয়।
এ ছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। স্কুল পর্যায়ে কাউন্সেলিং সেবা চালু করা, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ মোকাবিলার কৌশল শেখানো- এসব উদ্যোগ খুবই কার্যকর হতে পারে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা তাদের সমস্যার কথা কাউকে বলতে পারে না, ফলে তারা একাকিত্বে ভোগে। একটি সহানুভূতিশীল পরামর্শব্যবস্থা তাদের সেই একাকিত্ব দূর করতে পারে।
আমাদের সমাজে এখনও একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে- ভালো ফলাফল মানেই জীবনে সফলতা নিশ্চিত। কিন্তু বাস্তব জীবনে আমরা দেখি, অনেকেই পরীক্ষায় গড়পড়তা ফলাফল করেও জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। কারণ সফলতার জন্য প্রয়োজন অধ্যবসায়, সৃজনশীলতা, নেতৃত্বগুণ, যোগাযোগ দক্ষতা এবং মানসিক দৃঢ়তা- যা একটি পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে পুরোপুরি নির্ধারণ করা যায় না।
এসএসসি পরীক্ষাকে তাই একটি জীবনের অংশ হিসেবেই দেখা উচিত, জীবনের লক্ষ্য হিসেবে নয়। শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে, এটি তাদের পথচলার একটি ধাপ মাত্র। এই উপলব্ধি যদি তাদের মধ্যে তৈরি করা যায়, তা হলে তারা পরীক্ষাকে ভয় না পেয়ে বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারবে।
পরিশেষে বলা যায়, এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সময়ের দাবি। ভীতি নয়, বরং ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পরিবার, শিক্ষক, সমাজ- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই সম্ভব একটি চাপমুক্ত, মানবিক ও ইতিবাচক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে একটাই বার্তা- তোমরা চেষ্টা করো, নিজের সেরাটা দাও। ফলাফল যাই হোক, জীবন তার চেয়ে অনেক বড়। আমরা তোমাদের পাশে আছি।
তখনই ভীতির দেয়াল ভেঙে সত্যিকার অর্থে প্রীতির বার্তা পৌঁছে যাবে প্রতিটি শিক্ষার্থীর হৃদয়ে, আর এসএসসি পরীক্ষা হয়ে উঠবে ভয়ের নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ও সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত।
প্রকৌশলী
এএডি/