নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন

ড. মো. তাজুল ইসলাম চৌধুরী

মতামত

খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। আমাদের দেশে মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা অনেকটা নিশ্চিত হলেও নিরাপদ খাদ্য এখনও বহু দূর। সংবিধানে প্রতিটি মানুষের জন্য

2026-04-19T05:00:06+00:00
2026-04-19T05:00:06+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
মতামত
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন
ড. মো. তাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: রোববার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:০০ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। আমাদের দেশে মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা অনেকটা নিশ্চিত হলেও নিরাপদ খাদ্য এখনও বহু দূর। সংবিধানে প্রতিটি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে বলা হয়েছে। আমাদের খাদ্য যদি নিরাপদ না হয়, তা হলে তা জীবন রক্ষার পরিবর্তে জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। ধান, মাছ, সবজি, ফল সব ক্ষেত্রেই দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু এই অর্জনের আড়ালে একটি বড় উদ্বেগ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, আর তা হচ্ছে খাদ্যের নিরাপত্তা। তাই নতুন সরকারের নিরাপদ খাদ্যের উদ্যোগ শুরু করতে হবে এখন থেকেই, সুপরিকল্পিত ও কঠোরভাবে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করায় এ গুরুদায়িত্ব এখন নবগঠিত সরকারের। বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ, কৃষক পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেছে। সরকার গঠনের পর মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন-উর-রশীদও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার কথা উচ্চারণ করেছেন। তরুণ সমাজ কিন্তু ভবিষ্যতে আর প্রতিশ্রুতি শুনতে চাইবে না, তারা এখন থেকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চাইবে প্রতি মুহূর্তে। এ কারণে আগামীদিনে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রস্তুত ও তদানুযায়ী কাজ করা জরুরি।

বাংলাদেশে ভেজাল খাদ্যের সমস্যা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রতি বছর প্রায় ৬০ কোটির বেশি মানুষ দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হয়। একইভাবে ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন উল্লেখ করেছে, খাদ্য নিরাপত্তা শুধু জনস্বাস্থ্যের বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে বিক্রি হওয়া মাছ, ফল, দুধ ও মসলার একটি বড় অংশে অনুমোদনহীন রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। দুধে ডিটারজেন্ট, ফলে ফরমালিন, সবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক- এসব এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি নীরব বাস্তবতা। এর ফলে ক্যানসার, কিডনি রোগ, লিভার সমস্যা ও শিশুদের অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ছে বলে ডাক্তাররা মত দিয়ে আসছেন।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই প্রতিষ্ঠান খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, তদারকি ও আইন প্রয়োগের দায়িত্ব পালন করছে। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ প্রণয়নও একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ এখনও পর্যাপ্ত নয়। মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়েও নানা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই উৎপাদন পর্যায়ে নজর দিতে হবে।

কৃষকরা প্রায়ই না জেনে বা অধিক লাভের আশায় অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করেন। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, সচেতনতা ও বিকল্প পদ্ধতির সুযোগ না দিলে এই সমস্যা দূর হবে না। কৃষিতে ‘গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস’ বা উত্তম
কৃষি চর্চা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কৃষকদের জৈব ও নিরাপদ উৎপাদনে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা গেলে দেশের স্বাস্থ্যব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। ইউনাইটেড ন্যাশনস চিলড্রেনস ফান্ডের তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের অপুষ্টি ও অসুস্থতার একটি বড় কারণ দূষিত খাদ্য। ফলে নিরাপদ খাদ্যে বিনিয়োাগ মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মে বিনিয়োগ।

খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরীক্ষাগারের সক্ষমতা। আর এ কারণে অনেক সময় বিজ্ঞানসম্মত ভাবনা বাদ দিয়ে মানুষ মনগড়া কথা বলে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তিও তৈরি করে। বর্তমানে দেশের সব জেলায় আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার নেই। ফলে দ্রুত পরীক্ষা ও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। প্রতিটি বিভাগ ও জেলায় আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব স্থাপন করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ দিতে হবে। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ ছাড়া কোনোভাবেই আমরা খাদ্যকে দূষিত বলতে পারব না।

এ ছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের দেশের অধিকাংশ কাঁচাবাজার এখনও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পরিচালিত হয়। খাবার সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রির সময় স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না। উন্নত দেশগুলোতে প্রতিটি ধাপে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়, খামার থেকে টেবিল পর্যন্ত। বাংলাদেশেও সেই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। জনসচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতন ভোক্তা থাকলে ভেজাল ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারে না। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এই বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

স্কুলের পাঠ্যক্রমে নিরাপদ খাদ্য বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিল্প, বাণিজ্য, স্থানীয় সরকারসহ সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও নিরাপদ খাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য রফতানির ক্ষেত্রে মান বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা গেলে রফতানি বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি পাবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো রাজনৈতিক অঙ্গীকার। সরকার যদি এটিকে অগ্রাধিকার দেয়, তা হলে পরিবর্তন সম্ভব।

অতীতে টিকাদান কর্মসূচি বা অন্য কোনো বড় উদ্যোগ সফল হয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণেই। নিরাপদ খাদ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দৃঢ় পদক্ষেপ প্রয়োজন। আজকের শিশু আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। যদি তারা অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে বেড়ে ওঠে, তা হলে জাতির ভবিষ্যৎও দুর্বল হবে। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু বর্তমানের দায়িত্ব নয়, এটি ভবিষ্যতের বিনিয়োগ।

পরিশেষে বলা যায়, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা এখন থেকেই শুরু করতে হবে। কঠোর আইন প্রয়োগ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক পরীক্ষাগার, বাজারব্যবস্থার উন্নয়ন ও জনসচেতনতা সবকিছু মিলিয়েই একটি নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। সরকার, উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সবাইকে সম্মিলিতভাবে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। আজ যদি আমরা উদ্যোগ না নিই, তা হলে একটি মেধাহীন আগামী প্রজন্ম তৈরি হবে, আর এ কারণে তারা আমাদের কখনোই ক্ষমা করবে না। তাই এখনই সময় নিরাপদ খাদ্যের উদ্যোগ শুরু করার।

অধ্যাপক ও নিরাপদ খাদ্য বিশেষজ্ঞ
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   নিরাপদ  খাদ্য  নিশ্চিত  কার্যকর  উদ্যোগ  প্রয়োজন 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: