তীব্র গরমে হাঁসফাঁস করছে ঝালকাঠি জেলার মানুষের জীবনযাত্রা। সকাল থেকেই সূর্যের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে দুপুরের দিকে তা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় শরীর ঘেমে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে দ্রুত। এই পরিস্থিতিতে শহর ও গ্রাম জুড়ে মানুষের স্বস্তির প্রধান আশ্রয় হয়ে উঠেছে রাস্তার মোড়ে মোড়ে গড়ে ওঠা শরবতের দোকানগুলো।
শহরের প্রধান সড়ক, ঝালকাঠি প্রেস ক্লাবের সামনে, পৌর মিনি স্টেডিয়ামেরর সামনে, মিনি পার্ক, জজ কোর্ট চত্বর, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, নেছারাবাদ মাদ্রাসার সামনে, রামনগর স্বপনের দোকান, বাজার এবং স্কুল-কলেজের আশপাশে এখন চোখে পড়ে ছোট ছোট অস্থায়ী শরবতের দোকান।
কোথাও কোথাও ঠেলা, কোথাও টেবিল, আবার কোথাও ভ্রাম্যমাণ ভ্যান সবখানেই লেবু, চিনি, বিট লবণ, বেল, তেঁতুল ও আখের শরবত বিক্রি হচ্ছে সমানতালে। ফাঁকা রাস্তায় শরবতের দোকানে ভিড়। দুপুর গড়াতেই ঝালকাঠি শহরের রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়।
রিকশাচালক, দিনমজুর, দোকানদার ও পথচারীরা ছায়ার খোঁজে গাছতলায় বা দোকানের বারান্দায় আশ্রয় নেন| তবে এই ফাঁকা শহরের মাঝেও ব্যতিক্রম দেখা যায় শরবতের দোকানগুলোতে। সেখানে থাকে ভিড়, ব্যস্ততা আর ঠান্ডা পানীয়ের চাহিদা।
রিকশা চালক মজিবুর রহমান বলেন, এই গরমে রিকশা চালানো বড় কষ্টের বিষয়, বিশেষ করে দুপুরের রোদে রিকশা চালানো খুব কষ্ট হয়। গলা একেবারে শুকিয়ে যায় পনির তিশনায় (পিপাসায়)। এই শরবত খেলে কিছু হলেও স্বস্তি পাওয়া যায়।
শরবত বিক্রেতা আসলাম বলেন, আগে দিনে অল্প বিক্রি হতো। এখন সকাল থেকেই ভিড় থাকে। দুপুরের সময় দাঁড়ানোরও জায়গা থাকে না। বরফ, চিনি আর লেবুর দামও বেড়েছে, কিন্তু বিক্রি ভালো হওয়ায় লাভও হচ্ছে। তবে গরম যত বাড়ছে, মানুষ তত বেশি শরবত খাচ্ছে।
আরেক বিক্রেতা হানিফ হাওলাদার জানান, স্কুল ছুটির সময় শিক্ষার্থীরা বেশি আসে। আবার রিকশাচালক আর শ্রমিকরাও নিয়মিত আসে। ক্রেতাদের কাছে শরবত এখন প্রয়োজনীয়তা শুধু তৃষ্ণা মেটানোর জন্য নয়, অনেকের কাছে শরবত এখন গরম থেকে বাঁচার একটি অপরিহার্য উপায় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও পথচারীরা শরবতের দোকানে ভিড় করছেন বেশি। তবে এটাই আমাদের মৌসুমি ব্যবসা। গরম পড়লেই আয় হয়, শীতকালে কমে যায়।
হানিফ আরও জানান, নিজের বাসায় ফ্রিজে বরফ তৈরি করে সেটা দিয়ে শরবত বানানো হয়। সবই প্রাকৃতিক এবং স্বাস্থ্যসম্মত, কোনো ধরনের অখাদ্য ব্যবহার করা হয় না।
শিক্ষার্থী সাবরিন জাহান সারা বলেন, স্কুল থেকে ফেরার সময় শরবত না খেলে খুব খারাপ লাগে। গরমে এটা এখন আমাদের রুটিন হয়ে গেছে। এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবত খেলে শরীরে যেন নতুন প্রাণ ফিরে আসে। মাথা হালকা লাগে, ক্লান্তিটাও কিছুটা কমে যায়।
পথচারী জিহাদুল ইসলাম শান্ত বলেন, এখনকার গরমটা সত্যিই অসহনীয় হয়ে গেছে। সকাল থেকে সূর্য এমনভাবে তাপ দেয় যে রাস্তায় বের হলেই শরীর দুর্বল হয়ে যায়। বিশেষ করে দুপুরের দিকে মনে হয় যেন আগুনের মধ্যে হাঁটছি। ছায়া ছাড়া একমুহূর্ত দাঁড়ানোও কঠিন হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় শরবতের দোকানগুলোই আমাদের জন্য বড় ভরসা। হেঁটে যেতে যেতে যখন শরবতের দোকান দেখি, তখন মনে হয় একটু দাঁড়িয়ে শরীরটা ঠান্ডা করে নেই।
তাপপ্রবাহে জনজীবনে সতর্কতা জানিয়ে আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশ জানান, গরমের তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে। এজন্য রাতে বৃষ্টি অথবা ঝড়ো বৃষ্টি হতে পারে। সবাইকে সচেতন এবং সাবধানে থাকার অনুরোধ।
স্বাস্থ্যকর্মী মামুন সিকদার বলেন, গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে বিশুদ্ধ পানীয় জরুরি। কিন্তু রাস্তার অপরিষ্কার পানি বা বরফ ব্যবহারে ডায়রিয়া ও অন্যান্য রোগ হতে পারে। ঘরোয়া বা স্বাস্থ্যসম্মত শরবত খাওয়া সবচেয়ে ভালো।
ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. টিএম মেহেদী হাসান সানি জানান, এই গরমে ছায়াযুক্ত স্থানে অবস্থান অথবা ছাতা ব্যবহার ও বেশি করে পানি পান করা দরকার। প্রয়োজনে সহনীয় পর্যায়ে ঠান্ডা পানীয় পান করতে হবে। তবে অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি পান না করার অনুরোধ জানান তিনি।
পথের শরবত পানের বিষয়ে তিনি বলেন, রাস্তার পাশে বা ফুটপাতে তীব্র গরমে এক ধরনের মৌসুমি ব্যবসায়ীরা থাকেন। এর মধ্যে এক ধরনের অসাধু বিক্রেতারা রং মিশিয়ে চটকদার দেখিয়ে বিক্রি করে। ওগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সময়ের আলো/জোই