বিশ্ব অর্থনীতি যখন নানা ভূরাজনৈতিক কারণে টালমাটাল এবং সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইন বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি তেলের দামের নতুন সমন্বয় সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর করেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন এই দাম কার্যকর করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই ‘সমন্বয়’ কি কেবলই গাণিতিক হিসাব, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক বিশাল মুদ্রাস্ফীতির শঙ্কা? অর্থনীতির ভাষায় জ্বালানি তেল হলো একটি ‘কৌশলগত পণ্য’, যার দাম বাড়লে বাজারের প্রতিটি স্তরে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে।
মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী এবারের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রতিটি জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের লাফ লক্ষ করা গেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়েছে। পেট্রোলের দাম ১৯ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৩৫ টাকা।
অন্যদিকে কৃষি ও গণপরিবহনের মূল চালিকাশক্তি ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। শতাংশের হিসেবে এই বৃদ্ধি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের আয়ের ওপর সরাসরি বড় ধরনের আঘাত। বিশেষ করে অকটেন ও পেট্রোলের মতো উচ্চমূল্যের জ্বালানিগুলো ব্যক্তিগত পরিবহনের খরচ বাড়ালেও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি পুরো উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট করার ক্ষমতা রাখে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার খবর প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরিবহন খাতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশে পণ্য পরিবহন এবং গণপরিবহনের সিংহভাগই ডিজেলচালিত। লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বৃদ্ধি মানে হলো বাস ও ট্রাক মালিকদের পরিচালন ব্যয় একলাফে ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়া।
অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সরকার জ্বালানির দাম যে হারে বাড়ায়, পরিবহন মালিকরা তার চেয়েও বেশি হারে ভাড়া বাড়িয়ে দেন। এর ফলে অফিসগামী যাত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের যাতায়াত খরচ বেড়ে যাবে। এ ছাড়া ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্যের পাইকারি ও খুচরা বাজারে। যাতায়াত খরচ বাড়লে মানুষের হাতে ব্যয়যোগ্য আয় কমে যায়, যা জীবনযাত্রার মানকে নিম্নমুখী করে।
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং বোরো মৌসুমে সেচ কাজের জন্য কৃষকরা ব্যাপকভাবে ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধি কৃষকের ধান উৎপাদন খরচকে একলাফে কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দেবে। সার, বীজ এবং শ্রমিকের মজুরি যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন জ্বালানি তেলের এই বাড়তি খরচ প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’।
কৃষকরা যদি তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য না পান, তবে এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা তাদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জালে আবদ্ধ করবে। অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বাড়লে চাল ও সবজির খুচরা মূল্যও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল ভোক্তা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি দেশের শিল্পোৎপাদন খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের অনেক ছোট ও মাঝারি শিল্প-কারখানা এবং বিশেষ করে পোশাক শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। যখন উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
এতে রফতানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যারা সীমিত পুঁজিতে ব্যবসা পরিচালনা করেন, তাদের জন্য এই বাড়তি খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব। এর ফলে অনেক কারখানা কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হতে পারে, যা পরোক্ষভাবে বেকারত্ব বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে।
বাজারে ইতিমধ্যে চাল, ডাল, তেল ও চিনির দাম যখন সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার কিনারে, তখন জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি আগুনের ওপর ঘি ঢালার মতো কাজ করবে। পণ্যবাহী ট্রাক যখন চড়া ভাড়ায় গ্রাম থেকে শহরে পণ্য পরিবহন করবে, তখন পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি পণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির দামের এই নতুন সমীকরণ দেশে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতিকে দ্বিগুণ ত্বরান্বিত করতে পারে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষ, যাদের আয়ের ৭০ শতাংশই খাদ্য কিনতে ব্যয় হয়, তারা চরম পুষ্টিহীনতা ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে।
এবারের প্রজ্ঞাপনে কেরোসিনের দাম লিটারে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়েছে। কেরোসিন মূলত গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের রান্নার কাজ বা আলোর উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধি মানে হলো জীবনযাত্রার মান আরও সংকুচিত হওয়া। রান্নার জ্বালানি যখন দুষ্প্রাপ্য হয়, তখন তা সরাসরি স্বাস্থ্য ও শিশুদের পড়াশোনার ওপর প্রভাব ফেলে। মধ্যবিত্ত মানুষ হয়তো বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার কমিয়ে অকটেনের খরচ কমাতে পারে, কিন্তু প্রান্তিক মানুষের জন্য কেরোসিনের কোনো সহজলভ্য বিকল্প নেই।
সাধারণ মানুষের মনে একটি জোরালো প্রশ্ন- বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলে কেন দেশে কমে না? এর পেছনে কয়েকটি জটিল অর্থনৈতিক কারণ কাজ করে। প্রথমত বাংলাদেশে ব্যবহৃত পরিশোধিত জ্বালানির দাম আমদানির সময় ডলারের বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করে। সাম্প্রতিক ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হয়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে আমদানিতে খরচ বেশি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপিসির পুঞ্জীভূত লোকসান সমন্বয় এবং সরকারের ভর্তুকির চাপ কমানোর জন্য অভ্যন্তরীণ মূল্য বাড়ানো হয়। তবে স্বচ্ছতার অভাব থাকায় সাধারণ মানুষ সবসময় এই ব্যাখ্যাগুলো গ্রহণ করতে চায় না।
সামষ্টিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে, জ্বালানি তেলের এই উচ্চমূল্য কেবল ব্যক্তি বিশেষের পকেটই কাটে না, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকেও শ্লথ করে দেয়। যখন জ্বালানির দাম বাড়ে, তখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু সেই তুলনায় আয় বা মজুরি বাড়ে না। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায় এবং তাদের সঞ্চয় করার ক্ষমতা হ্রাস পায়।
সঞ্চয় কমলে বিনিয়োগ ব্যাহত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ যখন তাদের আয়ের সিংহভাগ মৌলিক চাহিদা মেটাতে ব্যয় করতে বাধ্য হয়, তখন শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের মতো মানবসম্পদ উন্নয়নের খাতে ব্যয় সংকুচিত হয়ে পড়ে। এর ফলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথে এক বড় ধরনের অসমতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। অর্থাৎ তেলের দামের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ কেবল একটি গাণিতিক পরিবর্তন নয়, এটি আমাদের অর্থনীতির কাঠামোগত স্থিতিশীলতার জন্য একটি নীরব হুমকি।
দীর্ঘমেয়াদে উত্তপ্ত জ্বালানি বাজার থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সোলার, বায়ুবিদ্যুৎ) দিকে ঝুঁকতে হবে। নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে আরও গতিশীল হতে হবে। জ্বালানি তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের অর্থনীতিকে সবসময় বিশ্ববাজারের জিম্মি করে রাখে। পাশাপাশি বিদ্যুৎচালিত গণপরিবহন বা রেল যোগাযোগের আধুনিকায়ন ঘটাতে হবে যাতে মানুষের যাতায়াত খরচ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল না হয়। জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাজার নিয়ন্ত্রণ করা। অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন তেলের দামের দোহাই দিয়ে সবজির দাম বা যাতায়াত ভাড়া অস্বাভাবিক হারে না বাড়াতে পারে সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। টিসিবির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা এবং নিম্নবিত্তের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও শক্তিশালী করা এখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পরিশেষে তেলের দাম বৃদ্ধি যেন কেবল পরিসংখ্যানের সমন্বয় না হয়, বরং তা যেন টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ হয়- এটাই কাম্য। নতুবা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার স্থবিরতা পুরো অর্থনীতির গতিকেই মন্থর করে দিতে পারে।
লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ, জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর