কুইক রেন্টাল বন্দোবস্তের অবসান হোক

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

মতামত

বাংলাদেশে জ্বালানি সমস্যা দীর্ঘদিনের। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কিন্তু বিগত কোনো সরকারই জ্বালানি সংকট নিরসনে দীর্ঘস্থায়ী কার্যকর কোনো পদক্ষেপ

2026-04-21T14:42:35+00:00
2026-04-21T14:42:35+00:00
 
  শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
মতামত
বিদ্যুতে ভর্তুকি
কুইক রেন্টাল বন্দোবস্তের অবসান হোক
মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ২:৪২ পিএম   (ভিজিট : ৪৪)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বাংলাদেশে জ্বালানি সমস্যা দীর্ঘদিনের। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কিন্তু বিগত কোনো সরকারই জ্বালানি সংকট নিরসনে দীর্ঘস্থায়ী কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। উল্লেখ্য, হাসিনা সরকার তিন মেয়াদে বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় করা হয়েছে ৪ লাখ কোটি টাকা এবং ১৫ বছরে বিদ্যুতের দাম পাইকারিতে ১১ বার ও খুচরায় ১৩ বার বাড়িয়েছে। দাম বাড়ানো সত্ত্বেও বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকা আয় করলেও সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিডিবিকে বছরের পর বছর লোকসান দিতে হয়েছে। 

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর হতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বহু শিল্প-কারখানা স্থাপিত হয়। এদিকে প্রতি বছর জনসংখ্যা বাড়ার দরুন বিদ্যুতের চাহিদাও ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। গ্রাহকের অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ এবং বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা করতে বেসরকারি  উদ্যোগে ভাড়ায় চালিত বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে বিদ্যুৎ তৈরির অনুমোদন দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল তৎক্ষণাৎ বিদ্যুৎ চাহিদা মিটিয়ে সংকট মোকাবিলা করা।  
আরও পড়ুন

বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ৮০-৮৫ শতাংশ সক্ষমতায় ব্যবহার করা হবে- এমন শর্তে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব কেন্দ্রে গড় উৎপাদন হচ্ছে ২৫-৩০ শতাংশ। 

বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে অলস বসেছিল। প্রয়োজন না থাকলেও হাসিনার আস্থাভাজনদের অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপুল সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু ততটা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়নি। ফলে শীতের মৌসুমে অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রের একাংশকে বসিয়ে রেখে ভাড়া দিতে হয়েছে। হাসিনা সরকার দীর্ঘ ১৬ বছর সরকার পরিচালনা করেও বিদ্যুৎ খাতকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিণত করতে পারেনি। এদিকে প্রতি বছর সরকারি বাজেট থেকে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। 

হাসিনার  আমলে করা বিদ্যুৎ খাতের একতরফা বা অনাকাক্সিক্ষত চুক্তিগুলোর কারণে বাংলাদেশকে প্রতি বছর প্রায় ১৫০ কোটি ডলার অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। বিগত ১৫ বছর বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি পরিশোধ করতে হয়েছে। 

গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দরপত্র ছাড়াই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। হাসিনার আস্থাভাজন মন্ত্রী, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন গোষ্ঠীকে আর্থিক সুবিধা দিতে বাড়তি টাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র চুক্তি করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে প্রধান সমস্যা হচ্ছে বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত কুইক রেন্টাল পাওয়ার বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো। বেসরকারি ভাড়ায় চালিত  বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ তৈরি না করেও ক্যাপাসিটি চার্জের নামে প্রত্যেক কোম্পানিকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা সরকারকে প্রদান করতে হয়েছে। এই ক্যাপাসিটি চার্জ দুর্নীতি এখন সরকারের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চুক্তির শর্ত ছিল ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্টে। কিন্তু সরকারের উদাসীনতাই তারা এই  চুক্তির শর্ত থেকে সরে আসে। দেশে গত ২০২২-২৩  অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ৮৭ হাজার ২৪ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা। সরকারি, বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে এ পরিমাণ বিদ্যুৎ কিনতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের  (বিপিডিবি) ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯৫ হাজার ৩২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ক্রয়ে বিপিডিবির ব্যয় হয়েছিল ৭১ হাজার ৪৯৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

ওই অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ১৬ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক অর্থবছরের  ব্যবধানে সংস্থাটির ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ব্যয় বেড়েছে ৫৬ শতাংশের বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৯৮ মেগাওয়াট, কেন্দ্র ভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ) ছিল ৩২ হাজার কোটি টাকা। ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি  নবায়ন না করায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সক্ষমতা কমে হয় ২৭ হাজার ৪১৪ মেগাওয়াট। এবার ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কেন্দ্র ভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ) দিতে হয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কেন্দ্র ভাড়া বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি খাত থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কেনা হয় বিদ্যুৎ ১ লাখ ৩০৯ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা। প্রতি ইউনিটের দাম পড়েছে ১৪ টাকা ৪৫ পয়সা। এর মধ্যে বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পেছনে সবচেয়ে বেশি অর্থ গুনতে হয়েছে বিপিডিবিকে। আইপিপি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বিপিডিবির বিদ্যুৎ ক্রয়ে ব্যয় বাড়ায় বিপিডিবির গড় উৎপাদন ব্যয় ৮ টাকা ৮৪ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ টাকা ৩৩ পয়সায়। বিদ্যুৎ খাতে প্রতিনিয়ত ব্যয় বাড়তে থাকায় প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও ক্যাপাসিটি চার্জের হিসাব বিবেচনায় নিলে বিপিডিবির পক্ষে মূল্য বাড়িয়েও আর্থিক চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হবে কি না সে বিষয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে।

সরকার বিদ্যুৎ খাতের লোকসান কমাতে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক এ ক্ষতি থেকে বিপিডিবিকে বের হতে হলে বিদ্যমান ক্রয়চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প নেই। পাশাপাশি পুরোনো ও অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিতে হবে। এটি করা গেলে বিপিডিবির বড় আর্থিক সাশ্রয় হবে বলে মনে করেন বিদ্যুৎ খাতের সাবেক নীতিনির্ধারকরা। বিদ্যুৎ খাতের বৃহৎ এ লোকসান থেকে বের হতে হলে শুরুতেই অসম ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি বাতিল করতে হবে। কারণ বিপিডিবি বিদ্যুৎ ক্রয় করুক বা না করুক তাকে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হবে, অন্তত এ ধারাটি এখন বাতিল হওয়া দরকার।

এ ধরনের ক্রয়চুক্তির আওতায় বিপিডিবির আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত স্বল্পমেয়াদি যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে সেগুলো ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্টের’ শর্তে নবায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ বিপিডিবি এখন চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণ সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করে ফেলেছে। এসব অসংগতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে বিপিডিবি আগের ধারায় ফিরে আসতে পারবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় সাশ্রয় না করে বিদ্যুতের ভর্তুকি তুলে দেওয়ার জন্য মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক। এগুলোর বিষয়ে আগে যৌক্তিক সিদ্ধান্তে আসা দরকার। বিদ্যুৎ খাতের নতুন বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসায় পুরোনো ও অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরে আসার কথা জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। 

বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি হয়েছে প্রতিযোগিতা ছাড়া, ২০১০ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ আইনের অধীনে। আইনটি দায়মুক্তি আইন নামে পরিচিত। এর আওতায় সরকারি ক্রয় আইন থেকে অব্যাহতি, বিচারিক পর্যালোচনার সীমাবদ্ধতা এবং বিশেষ আইনের আওতায় নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য বিস্তৃত আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়। যদিও আইনটি ছিল সাময়িক জরুরি অবস্থা মোকাবিলা করার জন্য। বাস্তবে একের পর এক মেয়াদ বাড়িয়ে এটি ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে কার্যকর রাখা হয়। ধীরে ধীরে এটি বিদ্যুৎ খাতের চুক্তির প্রধান আইনি কাঠামোতে পরিণত হয়। 

বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সঙ্গে করা চুক্তিতে একাধিক  সুবিধা একসঙ্গে যুক্ত করা  হয়। যেমন- উৎপাদন হোক বা না হোক নিশ্চিত ক্যাপাসিটি চার্জ, বিদ্যুৎ না নিলেও অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা, জ্বালানির দাম সরাসরি ভোক্তার ওপর চাপানোর সুযোগ ইত্যাদি। এর ফলে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত সব ধরনের বাণিজ্যিক ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকে, কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য তৈরি হয় দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ ব্যয়ের ফাঁদ। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তিগুলোতে বৈশ্বিকভাবে সৌর প্যানেলের দাম দ্রুত কমলেও তার সঙ্গে সমন্বয় হয়নি। 

এ দেশে জ্বালানি খাতে সমস্যা প্রধান সমস্যা হচ্ছে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল, কয়লার অভাব। যেহেতু বর্তমানে আমাদের দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র তেল, গ্যাস ও কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রতি বছর সরকারকে প্রচুর টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে জ্বালানি তেল ও কয়লা আমদানি করতে হয়। আবার বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে  অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করে কয়লা ও তেল ক্রয় করতে হয়। যার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের গড় উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।  বিদ্যুতের গড় ইউনিট খরচ কমাতে হলে তেলের দাম আন্তর্জাতিক মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে কমাতে হবে। 

বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ও লোকসান কমাতে হলে সবচেয়ে ব্যয়বহুল উৎস থেকে বিদ্যুৎ কেনা কমাতে হবে, ক্যাপাসিটি চার্জ কমাতে হবে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি পুনঃআলোচনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে এবং সরকারি সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি গৌতম আদানির মতো ব্যয়বহুল অসম বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিদ্যুৎ খাতে লোকসানের জন্য দায়ী মূলত দেড় দশকের আওয়ামী লুটপাট। এই অবস্থায় আওয়ামী লুটপাটের দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা উচিত হবে না।

প্রাবন্ধিক

এএডি/


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: