দুনিয়াজুড়ে খাদ্য বিপর্যয়ের শঙ্কা

তৌহিদুজ্জামান সোহান

আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রায় দুই মাসের মাথায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও সারের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার

2026-04-22T00:35:34+00:00
2026-04-22T00:35:34+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
দুনিয়াজুড়ে খাদ্য বিপর্যয়ের শঙ্কা
তৌহিদুজ্জামান সোহান
প্রকাশ: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৩৫ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রায় দুই মাসের মাথায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও সারের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আর মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কখন এবং কত দ্রুত এই প্রভাব পড়বে খাদ্যমূল্যে? জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কাসহ বেশ কয়েকটি দেশের নাম উল্লেখ করেছে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি ও দোকানের তাকে থাকা পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকায় সংঘাতের প্রকৃত প্রভাব এখনও অনুভূত হয়নি। তারা আরও একমত, ক্ষতির তীব্রতা মূলত নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালিতে, নৌপরিবহন কতদিন বাধাগ্রস্ত থাকবে তার ওপর। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং তেলের এক-চতুর্থাংশ যায়।

জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক মাতিন কাইম আলজাজিরাকে বলেন, আগামী মাসগুলোতে খাদ্যমূল্য অবশ্যই বাড়বে, যা বিশ্বের অনেক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যকর খাবার কেনা আরও কঠিন করে তুলবে। আফ্রিকা ও এশিয়ার দরিদ্র মানুষরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ তাদের আয়ের একটি বড় অংশ খাদ্যের পেছনে খরচ করে। ক্ষুধা ও অপুষ্টি খুব সম্ভবত বাড়বে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) গত সপ্তাহে সতর্ক করে বলেছে, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে এই প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী সংকট বৈশ্বিক খাদ্য ‘বিপর্যয়’ ডেকে আনতে পারে। এফএও আরও বলছে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, সোমালিয়া, সুদান, তানজানিয়া, কেনিয়া ও মিসর। গত মাসে এক বিশ্লেষণে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, সংঘাত যদি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলতে থাকে এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকে, তা হলে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন (সাড়ে ৪ কোটি) বা তারও বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।

বৈশ্বিক শস্য উৎপাদন : এখন পর্যন্ত যুদ্ধ খাদ্যমূল্যকে শুধু পরিমিতভাবেই প্রভাবিত করেছে, যা কিছু পর্যবেক্ষককে অবাক করেছে। এফএওর খাদ্যমূল্য সূচক অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির তুলনায় গত মাসে বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। জাতিসংঘের এই সংস্থাটির সূচক অনুযায়ী, শস্যের দাম বেড়েছে আরও কম। মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে, বর্তমান খাদ্যমূল্য ২০২২ সালের গড় মূল্যের তুলনায় এখনও প্রায় ১১ শতাংশ কম। ২০২২ সালে বাজারগুলো রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ ও কোভিড-১৯-এর দ্বিমুখী ধাক্কা সামলাচ্ছিল।

তেল ও সারের বর্ধিত দাম খাদ্য উৎপাদন খরচ বাড়ালেও বিশ্বে এখন যে খাদ্য খাওয়া হচ্ছে, তার বেশিরভাগ উৎপাদিত হয়েছিল যুদ্ধ শুরুর অনেক আগে। বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনও এর আগে কখনো এত বেশি ছিল না। এফএওর পূর্বাভাস, ২০২৬ কৃষি মৌসুম শেষে শস্যের মজুদ রেকর্ড ৯৫ কোটি ১৫ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেশি। 

নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির কৃষিনীতি ও ফলিত অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ সান্দ্রো স্টাইনবাখ বলেছেন, সাম্প্রতিক মূল্য আন্দোলনকে সতর্কতার সঙ্গেই ব্যাখ্যা করা উচিত। তিনি এটিকে ‘মিশ্র সংকেত, অস্বস্তির স্পষ্ট কারণ’ বলে বর্ণনা করেন। স্টাইনবাখ আলজাজিরাকে বলেন, ইনপুট শক প্রায়ই বিলম্বে সঞ্চারিত হয়। মজুদ, আগে থেকে কেনা সার, বিলম্বিত পাস-থ্রু এবং সংকটের স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা এসব সাময়িকভাবে প্রভাবকে কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু কৃষি কাজ করে জৈবিক ও মৌসুমি সময়রেখায়, অন্যদিকে সার ও শিপিং বাজার দিন বা সপ্তাহের মধ্যে পুনর্মূল্য নির্ধারণ করতে পারে।

ইতালির লেচ্চের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ফন্ডাজিওন সিএমসিসির গবেষক শৌরো দাশগুপ্ত বলেছেন, জাতিসংঘের মতো সংস্থাগুলোর তৈরি সমষ্টিগত মূল্যসূচকে দরিদ্র দেশের বহু পরিবার পড়ে না। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, অনেক নিম্নআয়ের দেশে জ্বালানি মূল্য সরাসরি খুচরা খাদ্যমূল্যে প্রভাব ফেলে, কারণ উচ্চআয়ের দেশের তুলনায় সেখানে পরিবারের মোট ব্যয়ের মধ্যে পরিবহন খরচের অংশ অনেক বড়। তাই চলতি বছর বাড়তি জ্বালানি খরচ ঢাকা, কায়রো ও লাগোসে খাদ্য বাজেটকে প্রভাবিত করছে। তিনি আরও বলেন, খাদ্যমূল্য বাড়লে পরিবারগুলো প্রায়ই ফল, শাকসবজি ও প্রোটিন থেকে সরে গিয়ে সস্তা, ক্যালরিসমৃদ্ধ প্রধান খাবারের দিকে ঝুঁকছে। যার দীর্ঘস্থায়ী পরিণতি হয় অপুষ্টি।

বর্তমান পরিস্থিতির তীব্রতা : যুদ্ধের বিলম্বিত প্রভাব ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার গুরুত্ব নিয়ে ব্যাপক ঐকমত্য থাকলেও বর্তমান সম্ভাবনার তীব্রতা নিয়ে পর্যবেক্ষকরা একমত নন। খাদ্যশস্যের সঙ্গে সম্পর্কিত আর্থিক চুক্তিকারী এবং যারা কেনাবেচা করেন তারা আগামী মাসগুলোতে শুধু পরিমিত মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিচ্ছেন। শিকাগো মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জে গম ও ভুট্টার ফিউচার্স বছরের শেষ নাগাদ ৪-৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

যদিও কিছু দিক থেকে বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থায় আগেকার অন্যান্য বড় ধাক্কার তুলনায় বিশ্ব বর্তমান সংকট মোকাবিলায় বেশ ভালো অবস্থানে আছে। ২০০৭-০৮ সালের খাদ্য সংকটের সময়, যখন বৈশ্বিক গমের দাম ১৩৫ শতাংশের বেশি লাফিয়েছিল, তখন চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও ইউক্রেনসহ অসংখ্য দেশ প্রধান ফসল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। অর্থনীতিবিদরা বলেন, সেই নিষেধাজ্ঞাগুলো সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল যা মূলত খরা, কম শস্যমজুদ ও তেলের বাড়তি মূল্যের সংমিশ্রণে শুরু হয়েছিল। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।

বর্তমান যুদ্ধের সময় রফতানি নিষেধাজ্ঞার তেমন কোনো তাড়া দেখা যায়নি। তবে ইরান ও কুয়েত যারা বিশ্বব্যাপী প্রধান খাদ্য সরবরাহকারী নয় তারা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের পরিবেশ অর্থনীতির অধ্যাপক এলিজাবেথ রবিনসন আলজাজিরাকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। শস্যের বাজার বিঘ্নিত হচ্ছে না এবং দেশগুলো ২০০৮ সালের মতো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। তাই সম্ভবত অদূর ভবিষ্যতে খাদ্যমূল্যে তীব্র উল্লম্ফন হবে বলে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।

লন্ডনের ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফেলো স্টিভ উইগিনস বলেন, নেতিবাচক পূর্বাভাসগুলো বাজারের ধাক্কা সামঞ্জস্যের সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করে। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, সারা বিশ্বে কৃষি বৈচিত্র‍্যময় ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কৃষকরা ইনপুটের প্রাপ্যতা ও মূল্যের পরিবর্তন, আউটপুট মূল্য, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ইত্যাদির প্রতিক্রিয়ায় নিজেদের উৎপাদনব্যবস্থা সামঞ্জস্যে দক্ষ।

উইগিনস বলেন, ২০০৭-২০০৮ সংকটের সময় কিছু বিশ্লেষক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে শস্যমূল্য আর কখনো স্বাভাবিক হবে না কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ঐতিহাসিক নিম্নস্তরে ফিরে আসে। তারা ঘোষণা করেছিল যে ব্যবস্থা ভেঙে গেছে, এই মূল্যলাফ দেখিয়েছে খাদ্যব্যবস্থা কত আশাহীন। তারা ভুল করেছিলেন, আল্লাহকে ধন্যবাদ।

ফলনের পরিমাণ কমতে পারে : তবে হরমুজ প্রণালি যত বেশি সময় বন্ধ থাকবে, ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া, সালফার ও ফসফেটের দাম তত বাড়তে পারে। যার অর্থ কৃষকদের জন্য বাড়তি খরচ। এফএও অনুমান করছে, সংকটের সমাধান না হলে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে সারের দাম গড়ে ২০ শতাংশ বেশি হতে পারে। সাপ্তাহিক ছুটিতে সামান্য বাড়ার পর প্রণালিতে সামুদ্রিক চলাচল আবার নামমাত্রে নেমে এসেছে। তেহরান ঘোষণা দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র যতদিন ইরানি বন্দর অবরোধ রাখবে, ততদিন জাহাজ চলাচল সীমিত থাকবে।

সোমবার ব্লুমবার্গ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, বুধবার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, একটি ‘খারাপ চুক্তি’ করতে তিনি তাড়াহুড়ো করবেন না। 

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্তা বারবারা ক্যাম্পাসের খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ক্যাথি বেলিস যিনি জর্জ ডব্লিউ বুশের হোয়াইট হাউসে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, কিছু দেশে শিগগিরই বড় মূল্যবৃদ্ধি দেখলে তিনি অবাক হবেন না। তিনি আল জাজিরাকে আরও বলেন, আমরা মার্চে খাদ্যমূল্য কিছুটা বেড়ে যেতে দেখেছি, কিন্তু আমি কল্পনা করছি এপ্রিলের সংখ্যাগুলো আরও খারাপ হবে। আমার নজর থাকবে এই বসন্তে প্রধান ফসলের রোপিত এলাকা কমে যায় কি না, যা বাড়তি ইনপুট মূল্যের সম্ভাব্য এক প্রতিক্রিয়া নির্দেশ করবে। আবার রোপিত এলাকা স্থিতিশীল থাকলেও, ইনপুট ব্যবহার কমে যাওয়ার কারণে ফলনের পরিমাণ কমতে পারে।


  বিষয়:   ইরান  যুদ্ধ  জ্বালানি  জাতিসংঘ  খাদ্য  কৃষি  এফএও 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: