পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভোটের হারে রেকর্ড, বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ

মুকুল বসু, কলকাতা

আন্তর্জাতিক

বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, হামলা, ইভিএম বিভ্রাট, কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ আর প্রার্থীদের কনভয়ে আক্রমণের মতো বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে

2026-04-24T02:54:49+00:00
2026-04-24T02:54:49+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভোটের হারে রেকর্ড, বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ
মুকুল বসু, কলকাতা
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬, ২:৫৪ এএম 
নরেন্দ্র মোদি ও মমতা ব্যানার্জী। ছবি : সংগৃহীত
বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, হামলা, ইভিএম বিভ্রাট, কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ আর প্রার্থীদের কনভয়ে আক্রমণের মতো বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) শেষ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফা। 

ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোট শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা আগে স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় ১৫২ আসনে ভোটের হার প্রায় ৮৯ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছায়, যা সাম্প্রতিক নির্বাচনি ইতিহাসে ব্যতিক্রমী। বিশেষ করে যেসব এলাকায় ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর ঘিরে উদ্বেগ ছিল, সেখানে অস্বাভাবিক বেশি ভোট বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কাড়ছে। 

তারা মনে করছেন, অনেক ভোটার সম্ভবত এবার ভোটদানকে শুধু সাংবিধানিক অধিকার নয়, এক ধরনের নথিভিত্তিক উপস্থিতির প্রমাণ হিসেবেও দেখেছেন। 

সরেজমিন দেখা গেছে, সংঘর্ষ থাকলেও ভোটারদের দীর্ঘ সারি কমেনি।

সংঘর্ষের ছায়ায় ভোট, তবু থামেনি প্রবাহ : গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম দফার দিনটি শুরু থেকেই উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। সকাল গড়াতেই একাধিক জেলা থেকে সংঘর্ষ, অভিযোগ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার খবর আসতে শুরু করে। সরেজমিন ঘুরে বীরভূম, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিম মেদিনীপুর, কোচবিহার ও আসানসোলে ছড়িয়ে থাকা ঘটনাগুলোর একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায়।

বীরভূমের লাভপুরে বিজেপি পোলিং এজেন্ট বিশ্বজিৎ মণ্ডলের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। মালদহের চাঁচলে নির্বাচনি এজেন্ট নিগ্রহের অভিযোগ। মুর্শিদাবাদের নওদায় হুমায়ুন কবীরের কনভয় ঘিরে সংঘাত, রাস্তা অবরোধ, ইট নিক্ষেপ এসব দিনের শুরুতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে।

বিবিসি বাংলার লাইভে আরও উঠে এসেছে চোপরা, সোনামুখী ও নওদায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে তৃণমূলের অভিযোগ। রাজ্যের শাসক দলের দাবি, ভোটারদের হেনস্থা ও অতিসক্রিয়তা ছিল একাধিক কেন্দ্রে। বিপরীতে বিজেপি অভিযোগ করেছে তাদের এজেন্ট সরিয়ে দেওয়া হয়েছে কিছু বুথ থেকে।

আসানসোল দক্ষিণে বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পালের গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ এবং কুমারগঞ্জে শুভেন্দু সরকারের আক্রান্ত হওয়ার দাবি পরিস্থিতিকে আরও রাজনৈতিক মাত্রা দেয়। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হয় বীরভূমের দুবরাজপুরে। ইভিএম গোলমাল ঘিরে জমে থাকা ক্ষোভ থেকে ভোটারদের সঙ্গে বাহিনীর সরাসরি বাকবিতণ্ডা হয়। পুলিশি গাড়ি ভাঙচুর, জওয়ান আহত, অস্ত্র প্রদর্শন সবমিলে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

উল্লেখযোগ্য হলো, এসব ঘটনার পরও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ভোটপ্রবাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনি ইতিহাসে সংঘর্ষ অনেক সময় ভোটার উপস্থিতি কমিয়েছে। কিন্তু এবার বহু জায়গায় দেখা গেছে ঠিক উল্টো। অস্থিরতা সত্ত্বেও মানুষ ভোটকেন্দ্রে থেকেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, ভয় হয়তো ভোট ঠেকায়নি; বরং উল্টো ভোটে যাওয়ার তাগিদ বাড়িয়েছে।

ভোটের পরিসংখ্যানে নতুন মোড় : প্রথম দফায় গতকাল দুপুর ১টা পর্যন্ত ভোট ছিল ৬২ দশমিক ১৮ শতাংশ। বেলা ৩টায় তা দাঁড়ায় ৭৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। বিকাল ৫টায় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ১৫২ আসনে গড় ভোট ৮৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সেই পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছিল দক্ষিণ দিনাজপুরে ৯৩ দশমিক ১২ শতাংশ। কুচবিহারে ৯২ শতাংশ। সাতটি জেলায় ভোট ৯০ শতাংশের বেশি।

মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে প্রায় ৮৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ ভোট পড়ে। রঘুনাথগঞ্জে প্রায় ৮৭ শতাংশ। লালগোলা ও ভগবানগোলায় ৮৪-৮৫ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে, কারণ এসব অঞ্চলেই নাম বাদ পড়া বিতর্ক ছিল প্রবল।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। গরম ছিল প্রবল। চার ভোটারের মৃত্যুর খবর এসেছে, প্রাথমিকভাবে হৃদরোগজনিত বলে ধরা হচ্ছে। সাধারণত এমন আবহাওয়া ভোট কমায়। কিন্তু এবার তা হয়নি। এটি বোঝাচ্ছে, ভোটদানে অংশগ্রহণের পেছনে কেবল স্বাভাবিক রাজনৈতিক উৎসাহ কাজ করেনি।

আরেকটি দিক পরিযায়ী ভোটারের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন। যদি সেটি সত্যিই বড় মাত্রায় ঘটে থাকে, তা হলে এই ভোটহার শুধু স্থানীয় সংগঠনের দক্ষতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তাই ভোটের হার এখানে রাজনৈতিক গল্পের কেন্দ্রবিন্দু।

কেন এত ভোট, এসআইআর, আশঙ্কা, নাকি রাজনৈতিক মেরুকরণ : এই প্রশ্নের সরল উত্তর নেই। তবে কয়েকটি স্তর আলাদা করে দেখা যাচ্ছে। প্রথম সম্ভাব্য কারণ এসআইআর পরবর্তী উদ্বেগ। 

বিবিসি বাংলাকে সিনিয়র সাংবাদিক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বলেছেন, এত বছর ভোট দেখেও তিনি সকাল থেকে এমন ধারাবাহিক উচ্চ ভোটদানের প্রবণতা সচরাচর দেখেননি। 

তার ভাষায়, মানুষের মধ্যে ‘এবার ভোটটা দিতেই হবে’ এমন মনোভাব কাজ করেছে। দ্বিতীয় সম্ভাব্য কারণ নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা। 

গবেষক সাবির আহমেদ বিবিসিকে বলেছেন, বিশেষ করে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে এত বেশি ভোট সম্ভবত কেবল দলীয় মেরুকরণের ফল নয়। এটি অস্তিত্ব সংশ্লিষ্ট উদ্বেগেরও বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। তৃতীয় সম্ভাব্য কারণ পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রত্যাবর্তন। 

পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের আসিফ ফারুকের বক্তব্য, বহু মানুষ শুধু ভোট দিতে ফিরেছেন। এমনকি ভোটার সিøপের অনুলিপি সংরক্ষণ পর্যন্ত করছেন অনেকে। এটি সাধারণ নির্বাচন আচরণ নয়। চতুর্থ সম্ভাব্য কারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা। প্রথম দফাতেই শুভেন্দু অধিকারী, অধীর চৌধুরী, মৌসম বেনজির নূর, দিলীপ ঘোষের মতো ভারী প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণ হয়েছে। এতে ভোটের আগ্রহ বেড়েছে এ যুক্তিও রয়েছে।

পঞ্চম সম্ভাব্য কারণ মেরুকরণ। বিজেপি বনাম তৃণমূলের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং কিছু অঞ্চলে পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক সঞ্চালন ভোটারকে টেনেছে। 

দ্য হিন্দুর বিশ্লেষণে উচ্চ ভোটকে ‘উদ্বেগ-প্রণোদিত অংশগ্রহণ’ বলা হয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, পরিচয়, অন্তর্ভুক্তি এবং তালিকাভুক্তির অনিশ্চয়তা অংশগ্রহণ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

এসআইআর এবং ভোটের মনস্তত্ত্ব : প্রথম দফার ভোট নিয়ে সবচেয়ে গভীর আলোচনাটি এখন এখানে– উচ্চ ভোটের হার কি নিছক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল, নাকি এর পেছনে ভোটারদের মানসিক প্রতিক্রিয়ার একটি বড় স্তর আছে? বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, অনেক ভোটার এবার ভোটদানকে শুধু সরকার গঠন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেননি; বরং নিজের অস্তিত্ব, নাগরিক উপস্থিতি এবং তালিকাভুক্ত পরিচয় নিশ্চিত করার এক ধরনের প্রতীকী কাজ হিসেবেও দেখেছেন।

এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার বিতর্ক ভোটের আগে দীর্ঘদিন জনপরিসরে ছিল। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলা, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চল এবং পরিযায়ী শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় এটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করেছে; এমন ধারণা বিশ্লেষকদের। 

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে গবেষক সাবির আহমেদ বলেছেন, অস্বাভাবিক উচ্চ ভোটের হার এবং বিশেষ করে পুরুষ ভোটারের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মধ্যে পরিযায়ী প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত থাকতে পারে। তার যুক্তি যেসব অঞ্চলে অতীতে নারীদের ভোটের হার তুলনামূলক বেশি ছিল, সেখানে এবার সামগ্রিক হার এত উঁচু হওয়া স্বাভাবিক প্রবণতার বাইরে।

এই ব্যাখ্যা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয় যখন আসিফ ফারুকের পর্যবেক্ষণ যুক্ত হয়। অনেকে ভোটার স্লিপের অনুলিপি রেখে দিচ্ছেন, যেন ভবিষ্যতে প্রমাণ করা যায় যে নাম তালিকায় ছিল এবং ভোটও দেওয়া হয়েছে। ভোট আচরণে এমন ‘প্রমাণ সংরক্ষণ প্রবণতা’ সাধারণত দেখা যায় না। ফলে বিশ্লেষকদের একাংশ এটিকে নাগরিক অনিশ্চয়তা-প্রণোদিত অংশগ্রহণ বলছেন।

এখানে আরেকটি স্তরও আছে। ভয় সবসময় অংশগ্রহণ কমায় না। কখনো তা অংশগ্রহণ বাড়ায়, বিশেষ করে যখন মানুষ মনে করে অনুপস্থিতি ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার ভোটে সম্ভবত সেই মনস্তত্ত্বও কাজ করেছে। ফলে এসআইআর এখানে কেবল প্রশাসনিক বিতর্ক নয়; ভোটদানের আচরণকে প্রভাবিত করা রাজনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক উপাদান হিসেবেও উঠে আসছে।

এফআর


  বিষয়:   পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা  নির্বাচন  ভোট  হার  রেকর্ড  বিক্ষিপ্ত  সংঘর্ষ 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: