এক যুগ পেরিয়ে গেছে দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ শিল্পদুর্ঘটনা রানা প্লাজা ধসের। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলালেও গাইবান্ধার হতাহতদের পরিবারগুলোর জীবনে সেই দিনটির ক্ষত এখনো শুকায়নি।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শুরুতে কিছু আর্থিক সহায়তা মিললেও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের অভাবে অধিকাংশ পরিবার আজও অনিশ্চয়তা আর দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে। প্রতিশ্রুত চাকরি, স্থায়ী সহায়তা কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তার বাস্তব প্রতিফলন খুব কমই দেখা গেছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধসে গাইবান্ধার অন্তত ৪৯ জন নিহত হন। নিখোঁজ হন ১১ জন এবং শতাধিক শ্রমিক আহত হন। দুর্ঘটনার পর নিহত ও আহতদের পরিবারকে বিভিন্ন উৎস থেকে এককালীন আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। কখনো ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, আবার কোথাও ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু এরপর দীর্ঘ এক যুগে আর কোনো উল্লেখযোগ্য সহায়তা বা পুনর্বাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
সাদুল্লাপুর উপজেলার চকগোবিন্দপুর গ্রামের রিক্তা খাতুন সেই ভয়াবহতার এক জীবন্ত সাক্ষী। ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে হারিয়েছেন ডান হাত। চারদিন পর তাকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও জীবন আর আগের জায়গায় ফেরেনি। কয়েক মাস চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও কর্মক্ষমতা হারিয়ে পড়েন চরম অনিশ্চয়তায়। পাওয়া সহায়তার টাকা ব্যাংকে রেখে তার সুদেই কোনো রকমে সংসার চালান তিনি।
রিক্তা বলেন, প্রতি বছর এপ্রিল এলেই তাকে ঘিরে কিছুদিন আলোচনা হয়, সংবাদমাধ্যম আসে। কিন্তু পরে সবাই ভুলে যায়।
ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, তখন অনেকেই চাকরির কথা বলছিল, কিন্তু আজও কিছুই পাইনি। আমার না হোক, অন্তত আমার ছেলেটার একটা চাকরি হলে সংসারটা একটু দাঁড়াত।
রিক্তার ছেলে একলাছুর রহমান পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট থেকে ডিপ্লোমা শেষ করলেও অর্থাভাবে উচ্চশিক্ষা বা চাকরির সুযোগ খুঁজে পাচ্ছেন না। ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে রিক্তার প্রতিদিনের লড়াই যেন থামছেই না।
একই উপজেলার দক্ষিণ দামোদরপুর গ্রামের সোনিয়া বেগমের গল্পও কম বেদনাদায়ক নয়। রানা প্লাজায় চাকরির মাত্র ২২ দিনের মাথায় ধসে পড়ে ভবনটি। সেই দুর্ঘটনায় হারান তার ডান পা। তিনদিন পর উদ্ধার হয়ে হাসপাতালে তার পা কেটে ফেলতে হয়। জীবনের পথচলা তখন থেকেই বদলে যায়।
সোনিয়া জানান, দুর্ঘটনার পর পাওয়া অর্থ দিয়ে কোনো রকমে চিকিৎসা ও সংসার চলছে। কিন্তু প্রতিশ্রুত চাকরি আজও অধরাই। তার স্বামী মিজানুর রহমান বাড়ির উঠানে ছোট একটি দোকান চালিয়ে মাসে তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় করেন, যা দিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সোনিয়া বলেন, যারা আমাদের এই অবস্থায় ফেলেছে, তাদের বিচারও এখনো চোখে দেখলাম না।
এই ট্র্যাজেডিতে নিখোঁজ হওয়া পরিবারগুলোর দুর্দশা আরও গভীর। কিশামত হলদিয়া গ্রামের বিথী খাতুন ও কামনা খাতুনের এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি। তাদের পরিবার জানায়, প্রথম দিকে কিছু খোঁজখবর নেওয়া হলেও পরে আর কেউ ফিরে তাকায়নি। নিখোঁজদের জন্য ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকায় তারা একপ্রকার অবহেলার শিকার।
নিহতদের পরিবারগুলোর অবস্থাও একই রকম করুণ। দিনমজুর ওয়াহেদ আলীর ছেলে সবুজ মিয়া ধসে নিহত হন। দীর্ঘ ১৬ দিন পর তার দেহাবশেষ শনাক্ত করা হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, এককালীন কিছু সহায়তা ছাড়া আর কিছুই পাননি তারা। প্রতিশ্রুতি ছিল পরিবারের একজনকে চাকরি দেওয়ার, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি।
স্মৃতি রাণীর পরিবারও একই বাস্তবতার মুখোমুখি। তার উপার্জনে চলত পুরো পরিবার। মৃত্যুর পর সামান্য সহায়তা পেলেও পরবর্তী সময়ে আর কোনো সহায়তা না থাকায় পরিবারটি অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। অনেক পরিবার প্রাপ্ত অর্থ ব্যয় করে এখন নিঃস্ব। কেউ কেউ সামান্য সুদের টাকায় দিন চালালেও তা স্থায়ী সমাধান নয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এককালীন সহায়তা কখনোই পুনর্বাসনের বিকল্প হতে পারে না। প্রয়োজন ছিল দক্ষতা উন্নয়ন, বিকল্প কর্মসংস্থান, শিক্ষা সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা। কিন্তু এসব উদ্যোগের অভাবে হতাহতদের পরিবারগুলো ধীরে ধীরে মূলধারার বাইরে চলে যাচ্ছে।
রানা প্লাজা ধস শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি ছিল রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। সেই ব্যর্থতার দায় এখনো বহন করে চলেছে গাইবান্ধার এই পরিবারগুলো। প্রতিশ্রুতির ভারে চাপা পড়ে থাকা এই জীবনের গল্পগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন টেকসই পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ।
সময়ের আলো/জোই