আমরা যেমন ছাত্ররাজনীতি চাই

আশিক বিন আলম সোহাগ

মতামত

ছাত্ররাজনীতি মানেই হলো দেশপ্রেম এবং তারুণ্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ, যা ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে আমাদের দিশা দেখিয়েছে। ছাত্ররাজনীতির মূল শক্তি হলো

2026-04-26T05:38:26+00:00
2026-04-26T05:38:26+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
আমরা যেমন ছাত্ররাজনীতি চাই
আশিক বিন আলম সোহাগ
প্রকাশ: রোববার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:৩৮ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ছাত্ররাজনীতি মানেই হলো দেশপ্রেম এবং তারুণ্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ, যা ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে আমাদের দিশা দেখিয়েছে। ছাত্ররাজনীতির মূল শক্তি হলো আপসহীনতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং সত্যের পক্ষে অটল থাকা। শিক্ষা ও রাজনীতি যখন একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে, তখনই একটি সমাজ প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠে। 

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে ছাত্ররাজনীতি শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনসেবার মানসিকতা তৈরিতে সাহায্য করে। ছাত্ররাজনীতির প্রাণভোমরা হওয়া উচিত জ্ঞান এবং যুক্তি। আমরা এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ চাই যেখানে গায়ের জোর অপেক্ষা চিন্তার গভীরতা বেশি প্রাধান্য পাবে। অতীতে আমাদের ছাত্ররাজনীতি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে যে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছিল, তার মূলে ছিল দেশপ্রেম এবং আদর্শ। বর্তমান সময়ে আমরা সেই হারানো গৌরব ফিরে পেতে চাই।

আমাদের প্রথম এবং প্রধান আকাক্সক্ষা হলো- ছাত্ররাজনীতিকে কোনো মূল রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন বা ‘লাঠিয়াল বাহিনী’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেওয়া যাবে না। ছাত্ররা রাজনীতি করবে ছাত্রদের স্বার্থে, শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় এবং জাতীয় ইস্যুতে সচেতনতা তৈরিতে। যখন ছাত্র সংগঠনগুলো মূল দলের লেজুড়বৃত্তি করে, তখন তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকারের চেয়ে দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে বেশি ব্যস্ত থাকে। আমরা চাই, একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত ছাত্ররাজনীতি।

আমরা এমন নেতা চাই যারা ক্লাসরুমেও মেধাবী এবং রাজপথেও দূরদর্শী। ছাত্ররাজনীতি হবে নেতৃত্বের গ্রুমিং গ্রাউন্ড। এখানে বিতর্ক হবে নীতি নিয়ে, উন্নয়ন নিয়ে এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে। টেন্ডারবাজি, সিট দখল বা চাঁদাবাজি নয়, বরং সাধারণ শিক্ষার্থীর বিপদে পাশে দাঁড়ানোই হবে ছাত্ররাজনীতির মূল লক্ষ্য। নৈতিকতা ও সততা হবে একজন ছাত্রনেতার প্রধান অলংকার। নৈতিকতাবিবর্জিত যেকোনো শিক্ষার্থী রাজনীতির মঞ্চে আসার যোগ্যতা হারাবেÑ এমন কঠোর নিয়মই আমরা দেখতে চাই। 

ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আমরা এমন এক ক্যাম্পাস চাই যেখানে বিভিন্ন আদর্শের ছাত্র সংগঠনগুলো একসঙ্গে বসে আলোচনা করবে, যুক্তি দিয়ে একে অপরের ভুল ধরিয়ে দেবে, কিন্তু কেউ কারও ওপর হামলা করবে না। আমরা চাই, কর্তৃত্ব ফলানোর সংস্কৃতি এবং নির্যাতনের অবসান ঘটে ছাত্ররাজনীতিতে একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ বজায় থাকবে। ছাত্ররা যখন রাজনীতি করবে, তখন তাদের প্রধান পরিচয় হতে হবে তারা শিক্ষার্থী। 


তাই তাদের প্রথম কাজ হবে পড়াশোনায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা এবং সেই অর্জিত জ্ঞানকে রাজনীতির ময়দানে সমাজ সংস্কারে ব্যবহার করা। আমরা এমন একটি রাজনীতি চাই যেখানে একজন শিক্ষার্থী কোনো নির্দিষ্ট দলের সমর্থক না হয়েও নিরাপদে ক্যাম্পাসে বিচরণ করতে পারবে এবং তার মৌলিক অধিকারগুলো ভোগ করবে।

ছাত্ররাজনীতি হতে হবে শিক্ষার্থীদের পরম আশ্রয়ের জায়গা। ডাইনিংয়ের খাবারের মান উন্নয়ন, লাইব্রেরি সুবিধা বৃদ্ধি, পরিবহন সংকট নিরসন এবং গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে ছাত্র সংগঠনগুলো সোচ্চার থাকবে। যখন কোনো শিক্ষার্থী আর্থিক বা ব্যক্তিগত সংকটে পড়বে, তখন কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই সংগঠনগুলো তাদের পাশে দাঁড়াবে- এমন মানবিক রাজনীতিরই আমাদের প্রয়োজন।

আমরা চাই, ছাত্ররাজনীতি কেবল সভা-সমাবেশে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করবে। বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সেমিনার, ক্যারিয়ার ক্লাবে সহায়তা করা, ভাষা শিক্ষা এবং আইটি দক্ষতা বৃদ্ধির মতো সৃজনশীল কাজে ছাত্র সংগঠনগুলো নেতৃত্ব দেবে। খেয়াল রাখতে হবে ছাত্ররাজনীতি যেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ভীতির কারণ না হয়, বরং তা যেন একজন শিক্ষার্থীকে সময়ানুবর্তিতা, দলগত কাজে দক্ষতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জনে সহায়তা করে। আমরা এমন নেতা চাই যারা বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতি সম্পর্কে সচেতন থাকবে এবং বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন দেখাবে। 

যেকোনো নীতিনির্ধারণী বিষয়ে ছাত্ররা নিরপেক্ষ ও যৌক্তিক অবস্থান নেবে। ছাত্র সংগঠনগুলোর নিজস্ব গঠনতন্ত্র থাকবে এবং তা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হবে। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বন্দনা নয়, বরং নীতির প্রশ্নে অটল থাকা এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোই হবে ছাত্ররাজনীতিকদের মূল লক্ষ্য। এতে করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনীতির প্রতি যে অনীহা তৈরি হয়েছে, তা দূর হবে এবং মেধাবীরা আবার রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী হবে। 

ছাত্ররাজনীতি মানেই সমাজ সংস্কারের একটি মাধ্যম। বন্যা, মহামারি বা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রক্তদান কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ, নিরক্ষতা দূরীকরণ এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মতো স্বেচ্ছাসেবী কাজে ছাত্র সংগঠনগুলোর সক্রিয় 
অংশগ্রহণ আমরা দেখতে চাই। যখন একজন সাধারণ মানুষ দেখবে যে ছাত্ররা কেবল নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত নয়, বরং তারা সমাজের অবহেলিত মানুষের জন্য কাজ করছে, তখন ছাত্ররাজনীতির প্রতি মানুষের হারানো আস্থা ফিরে আসবে।
 
আমরা এমন এক ছাত্ররাজনীতি চাই যা হবে শুদ্ধতা ও দেশপ্রেমের প্রতীক। ছাত্ররাজনীতির সোনালি অতীত আমাদের গর্ব, কিন্তু তার ভবিষ্যৎ হতে হবে আরও বেশি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বিজ্ঞানমনস্ক। এটি কেবল রাজপথ কাঁপানো সেøাগানের নাম নয়, বরং এটি হোক সমাজ পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। আমরা চাই ছাত্ররাজনীতি হবে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একটি ‘লিডারশিপ একাডেমি’, যেখান থেকে বেরিয়ে আসবে আগামীর সৎ প্রধানমন্ত্রী, দক্ষ আমলা, সচেতন শিক্ষক ও সুনাগরিক।

রাজনীতি ও শিক্ষা- এই দুটির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, যদি তা হয় মূল্যবোধসম্পন্ন। আমরা চাই সেই পরিবেশ, যেখানে একজন শিক্ষার্থী ক্লাসরুমে যেমন মেধার স্বাক্ষর রাখবে, তেমনি রাজনীতির ময়দানেও তার প্রজ্ঞা দিয়ে অন্ধকার দূর করবে। 
সংকীর্ণতা এবং স্বার্থপরতা পরিহার করে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধ থাকবে। যদি আমরা একটি মেধাভিত্তিক, গণতান্ত্রিক এবং  মানবিক ছাত্ররাজনীতি নিশ্চিত করতে পারি, তবেই বাংলাদেশ তার কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে। তারুণ্যের এই শক্তিই হোক আমাদের আগামীর সমৃদ্ধ ও সুন্দর বাংলাদেশের মূল ভিত্তি। 

আমরা বিশ্বাস করি, ছাত্ররাজনীতি মানেই হলো ত্যাগের মহিমা আর নতুনত্বের জয়গান। আমরা চাই আগামীর ক্যাম্পাসগুলোতে অস্ত্রের ঝনঝনানি নয়, বরং প্রতিধ্বনিত হোক বইয়ের পাতার শব্দ আর মুক্তবুদ্ধিচর্চার কলতান। তরুণদের হাত ধরে রাজনীতির এই সংস্কারই হবে আধুনিক বাংলাদেশের রক্ষাকবচ, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজের স্বপ্নের পাশাপাশি দেশের স্বপ্নকেও হৃদয়ে লালন করবে। এই স্বপ্নিল এবং ইতিবাচক পথ চলাই হোক আমাদের আগামীর ছাত্ররাজনীতির মূল পরিচয়। 

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   আমরা  ছাত্র  রাজনীতি  মতামত 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: