আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর উজানের পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় সিলেটের হাওড়পাড়ের কৃষকদের চোখে এখন ঘুম নেই। দিগন্তজোড়া মাঠ সোনালি ধানে ভরে থাকলেও মনে নেই স্বস্তি। আবহাওয়া অধিদফতর ও বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের সতর্কবার্তার পর স্বপ্নের ফসল তলিয়ে যাওয়ার ভয়ে তড়িঘড়ি করে আধপাকা ধানই কেটে ঘরে তুলছেন হাজারো কৃষক। দিনরাত একাকার করে এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে ধান কাটার মহোৎসব।
সিলেট জেলায় এবার ৮৮ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার বড় অংশই জেলার বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যে কোনো সময় ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে প্লাবিত হতে পারে নিম্নাঞ্চল। এই আশঙ্কায় পাকা ধানের পূর্ণতা পাওয়ার অপেক্ষা না করেই কাস্তে হাতে মাঠে নেমেছেন কৃষকরা। মাঠ পর্যায়ে কৃষি বিভাগ দ্রুত ধান কাটার নির্দেশনা দেওয়ায় কৃষাণ-কৃষাণী ও শ্রমিকদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে।
গোয়াইনঘাট উপজেলার তুরুং গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের ছোট-বড় সবাই মিলে ধান কাটতে ব্যস্ত। কেউ ধান কাটছেন, কেউ আঁটি বাঁধছেন, আবার কেউ সেই ধান বাড়িতে নিয়ে মাড়াই করছেন। অনেকের কপালে চিন্তার ভাঁজ থাকলেও, আধপাকা ধান অন্তত ঘরে তুলতে পারার মধ্যে এক ধরনের অসহায় স্বস্তি খুঁজছেন তারা।
তুরুং গ্রামের কৃষক আবদুল হামিদ বলেন, মেঘ ডাকলেই কলিজা কাঁপে। গত কয়েক বছরের বন্যায় আমাদের সব শেষ করে দিয়েছিল। এবার ধান ভালো হয়েছে, কিন্তু পুরোপুরি পাকার সময়টুকুও পাচ্ছি না। ঢল আসার আগেই আধপাকা ধান কেটে ফেলছি। যদি পানি বেড়ে যায়, তবে তো খড়ও পাব না। তাই দিনরাত এক করে মাঠেই পড়ে আছি।
একই গ্রামের পারবেজ আহমেদ জানান, উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নামলে হাওর ডুবতে সময় লাগে না। আধপাকা ধান কাটলে চাল একটু শক্ত হয় ঠিকই, কিন্তু একদম না পাওয়ার চেয়ে এটাই ভালো। বাড়ির মহিলারাও মাড়াই আর শুকানোর কাজে সাহায্য করছে। এখন আমাদের একটাই লক্ষ্য- বন্যা আসার আগেই যেন ফসলটা নিরাপদে গোলায় তুলতে পারি।
সিলেট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, জেলার হাওরাঞ্চলের প্রায় ৩৭ হাজার ৬২৬ হেক্টর জমির অর্ধেকের বেশি ধান ইতোমধ্যে কাটা শেষ হয়েছে। দ্রুত ধান কাটার জন্য মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন।
উপপরিচালক মো. শামসুজ্জামান জানান, বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না ঘটলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই অবশিষ্ট ধান নিরাপদভাবে ঘরে তোলা সম্ভব হবে।
প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে এবং সময়মতো ফসল তুলতে পারলে প্রান্তিক এই কৃষকদের সারা বছরের আহার নিশ্চিত হবে। আপাতত মেঘের ডাক আর পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে লড়াই করেই চলছে সিলেটের সোনালি ধান কাটার এই অসম যুদ্ধ।
সময়ের আলো/জোই