দুই যুগ ধরে চলে আসা বন্যহাতির তাণ্ডব যেন থামছে না কিছুতেই। প্রায় ২১ হাজার একর বনভূমিতে শতাধিক বন্যহাতির খাদ্যের জোগান অসম্ভব হওয়ায় খাদ্যের সন্ধানে সবসময়ই চলে আসে লোকালয়ে। চলছে ফসলহানিসহ প্রাণহানির ঘটনা।
চলতি বোরো মৌসুমেও ধান পাকার আগেই শেরপুর সীমান্তের বোরো খেতগুলো চোখ পড়েছে বন্যহাতির। ফলে আধাপাকা অথবা কাঁচা ধানই কেটে ফেলছেন সীমান্তের বোরো চাষীরা। সরকারিভাবে ফসলের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকলেও তা যথেষ্ট নয়। তাই বন্যহাতির সমস্যা সমাধানে কার্যকরী উদ্যোগ প্রত্যাশা করেন সীমান্তে বসবাসকারী অধিবাসীরা।
সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০০ সালের দিকে কয়েকটি বন্যহাতি ভারতের তুরা পাহাড়ের গহিন বন থেকে সীমান্ত পেরিয়ে নালিতাবাড়ী সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে বাংলাদেশে। প্রথমদিকে ১৫-২০টি হাতি মিলে একটি দলে ভাগ হয়ে শুধু মাত্র বোরো ও আমন মৌসুম এবং কাঁঠাল পাকার সময়ে সীমান্ত পেরিয়ে হানা দিত।
মৌসুম শেষ হলে পুনরায় ফিরে যেতো ভারতের গহীন পাহাড়ে। কালক্রমে বন্যহাতির সংখ্যা ও আগমন বাড়তে থাকে। বিশেষ করে, গত প্রায় এক দশক ধরে সীমান্তে ঘাঁটি গেড়ে বসে বন্যহাতির দল। প্রজননের মাধ্যমে সংখ্যায় বেড়ে গিয়ে বর্তমানে কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে বন্যহাতির সংখ্যা প্রায় ১২০-১৩০ এ দাঁড়িয়েছে। এসব হাতি শেরপুর সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় গহিন জঙ্গলে স্থায়ী বসতি গড়ে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে বা ফসলি জমি ও সবজি খেতে হানা দেয়। এখন বছরজুড়েই চলে বন্য হাতির তাণ্ডব।
চলতি বোরো মৌসুমে থোর আসা অবস্থায় বন্যহাতির উপদ্রব ভাগ্যক্রমে খুব একটা দেখা যায়নি। তবে ধান পেকে আসার সময় হতেই আবারও গহীন বন ছেড়ে ধান খেতে হানা দিতে শুরু করেছে। সবুজ-সোনালী ধানে মাঠ যখনই হাসছে, ঠিক তখনই কৃষকের হাসি যেন ফিকে হতে বসেছে। ইতোমধ্যেই ঝিনাইগাতি ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বেশকিছু ধানক্ষেত খেয়ে ও পায়ে মাড়িয়ে বিনষ্ট করেছে বন্যহাতির দল। আর সে ভয়েই সীমান্তের বোরো চাষীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন আধাপাকা ও কাঁচা ধান কাটতে।
শ্রমিক নিয়ে আবার কেউবা নিজেরা দলবদ্ধ হয়ে একে অপরের ধান কেটে ঘরে তুলছেন তড়িঘড়ি করে। ধার-দেনা করে কষ্টের ফসল যেভাবেই হোক ঘরে তুলতে হবে। আর তাই ফসলের মাঠে ছোট টং ঘর বানিয়ে রাতভর মশাল জ্বালিয়ে পাহারা দিচ্ছেন বন্যহাতি। দিনের বেলায় কাটছেন আধাপাকা ও কাঁচা ধান।
নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের আন্দারুপাড়া গ্রামের বোরো চাষি লুইস নেংমিনজা জানান, প্রতি রাতেই হাতি উপদ্রব চালায়। এ জন্য আমরা আধাপাকা ধান কেটে ফেলছি।
একই গ্রামের বোরো চাষি মেজাস সাংমা জানান, দিন-দুপুরেই হাতি নামছে। কাঁচা ধান খেয়ে ফেলছে। ১৩০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা লিটার ডিজেল কিনে মশাল ধরিয়ে রাতে হাতি তাড়াচ্ছি। হাতির উপদ্রবের জন্যই আমরা কাঁচা ধান কাটছি। সরকার যে ক্ষতিপূরণ দেয় তা দিয়ে আমাদের পোষায় না। অনেকে বর্গাচাষ করেন, তারা তো ক্ষতিপূরণ পানই না।
কৃষানি স্বপ্না দফো জানান, রাতে হাতি তাড়ানো লাগে। দিনে কাজ করতে হয়। ঘুমানো যায় না। সবসময় তো আর জেগে থাকা সম্ভব না। তাই হাতির ভয়ে কাঁচা ধানই কেটে ফেলছি।
স্থানীয় সাংবাদিক সুরুজ্জামান জানান, বন্য হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে গহীন পাহাড়ে অভয়ারণ্য করে ইকোট্যুরিজম করা যেতে পারে। এতে বন্যহাতির আবাসন ও খাদ্যের জোগান হবে, মানুষের জান-মালও রক্ষা পাবে। বন্য হাতি সম্পদে পরিণত হবে।
সেভ দ্যা ন্যাচার অব বাংলাদেশ শেরপুর জেলা শাখার সহসভাপতি রবিউল ইসলাম জানান, বন্যহাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব কমাতে ইকোট্যুরিজম প্রয়োজন। এতে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব কমে আসবে। একদিকে হাতির খাদ্য ও বাসস্থান তৈরি হবে, অন্যদিকে ইকোট্যুরিজমের ফলে মানুষের কর্মসংস্থানও বাড়বে।
সময়ের আলো/জোই