দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা ঝালকাঠির একসময়ের সমৃদ্ধ লবণশিল্প আজ বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। বিশেষ করে শ্রমের ন্যায্য মূল্য না মেলায় চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজারো শ্রমিক। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যে মজুরি তারা পাচ্ছেন, তা দিয়ে পরিবারের নূন্যতম ভরণপোষণ মেটানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রখর রোদে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রমের পর একজন শ্রমিকের ভাগ্যে জোটে মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। বর্তমান বাজারদরের তুলনায় এই মজুরি অত্যন্ত নগণ্য। জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে না পেরে অনেক শ্রমিক এনজিও বা মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের অভাবকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করছে।
আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং মান্ধাতা আমলের উৎপাদন পদ্ধতির কারণে ঝালকাঠির এই লবণশিল্প অনেকটা স্থবির। অনেক সময় কারখানা বা মাঠ পূর্ণ উদ্যমে সচল রাখা সম্ভব হয় না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে। বিশেষ করে মৌসুমী এই পেশায় অফ-সিজনে আয়ের কোনো বিকল্প উৎস না থাকায় শ্রমিকরা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন।
লবণ শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা নেই বললেই চলে। দীর্ঘ সময় লবণের সংস্পর্শে এবং রোদে কাজ করার ফলে তারা চর্মরোগ, চোখের সমস্যা ও মারাত্মক পানিশূন্যতায় ভোগেন। শ্রমের বিনিময়ে যা আয় হয়, তার বড় একটি অংশ চলে যায় অসুস্থতার পেছনে।
শ্রমিক রফিক সর্দার নিজের কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, সারাদিন লবণের মাঠে খাটি, কিন্তু যা পাই তা দিয়ে সংসার চলে না। চাল-ডাল কিনতেই টাকা শেষ, সন্তানদের পড়াশোনা তো এখন স্বপ্ন।
নারী শ্রমিক মালা রানী ক্ষোভের সঙ্গে জানান, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কাজ করি, কিন্তু ন্যায্য মজুরি পাই না। সবকিছুর দাম বাড়লেও আমাদের কপাল ফেরে না। আমাদের এই কষ্ট দেখার যেন কেউ নেই।
হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. কুদ্দুস হাওলাদার বলেন, শ্রমিকরা অর্থনীতির চাকা সচল রাখলেও তারা নিজেরা চরম বৈষম্যের শিকার। আমরা বারবার মজুরি কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছি। মানবিক জীবনযাপনের জন্য বাস্তবসম্মত মজুরি নিশ্চিত না করলে দীর্ঘমেয়াদে এই খাতে অস্থিরতা তৈরি হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও স্থানীয় অর্থনীতির স্বার্থেই এই খাতকে টিকিয়ে রাখা জরুরি। এজন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো, সরকারি ভর্তুকি ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মিল মালিক জানান, বর্তমানে বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ীই মজুরি প্রদান করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় আগামী বোর্ড সভায় মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে আলোচনার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
ঝালকাঠির এই লবণ শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বৃহৎ শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ রক্ষায় দ্রুত সরকারি ও নীতিনির্ধারণী হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায়, শুধু একটি শিল্পই হারাবে না, অনিশ্চয়তার অন্ধকারে তলিয়ে যাবে হাজারো পরিবার।
সময়ের আলো/জোই