বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, সেই সঙ্গে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যাও। ঝড়, বৃষ্টির মতোই বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে তিন ধরনের বজ্রপাত হয়। এক মেঘ থেকে আরেকটি মেঘ বা আন্তঃমেঘ, একই মেঘের এক স্থান থেকে আরেক স্থান বা অন্তঃমেঘ এবং মেঘ থেকে ভূমিতে।
মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশে আসার আগের দুই মাসে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বজ্রপাতের প্রকোপ অন্যান্য জেলার তুলনায় অনেক বেশি হয়। বর্ষাকালে রাঙামাটি, সুনামগঞ্জ ও চট্টগ্রাম বজ্রপাত সংঘটনের দিক থেকে প্রথম তিনটি জেলা। প্রতি বছর বর্ষার মৌসুমে বজ্রপাতের ভয়াবহতা আমাদের সবাইকে আতঙ্কিত করে তোলে। তবে এখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বেশি মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রপাতের কারণে নিহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব বেশি লক্ষ করা যায়।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়– বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০০ জনের বেশি মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারাচ্ছে। চলতি বছরের চার মাসে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের প্রকোপ আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রপাতের প্রকোপ বেশি হলেও সিলেট বিভাগের কিছু এলাকায় এর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
সরকার এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এ বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও কার্যকারিতা খুবই সীমিত। বজ্রপাতের সময় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নানা প্রকল্প চালু হলেও অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। মাল্টিপারপাস শেড নির্মাণের উদ্যোগগুলো এখনও কার্যকর হয়নি। একইভাবে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনেও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে প্রয়োজন সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ। বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে বা প্রাকৃতির উপকূলে থাকা থেকে বিরত থাকতে হবে। উপযুক্ত আশ্রয়স্থানে দ্রুত যেতে হবে, যেমন– ঘর বা কংক্রিটের স্থাপনা। তালগাছের মতো গাছ বজ্রপাত থেকে রক্ষা করতে পারে বলে মনে করা হলেও দেশের বেশিরভাগ বজ্রনিরোধক গাছের অস্তিত্ব এখন দেখা যায় না।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সময়োপযোগী সচেতনতা ও সরকারি উদ্যোগের সমন্বয়। বজ্রপাতের সময় কী করতে হবে, তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে নিয়মিত সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে এই মারাত্মক দুর্যোগের প্রভাব কমিয়ে আনা সম্ভব।
২০১৬ সালে সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। বজ্রপাত নিয়ন্ত্রণ কিংবা ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এ পর্যন্ত লাখ লাখ তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনার খবর সংবাদমাধ্যমগুলোতেও এসেছিল। তার কার্যক্রম আমরা লক্ষ করিনি। উন্নত দেশগুলো বজ্রনিরোধক খুঁটি বা পোল স্থাপন করে মানুষকে সচেতন করার মধ্য দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে এনেছে।
বাংলাদেশেও বজ্রনিরোধক খুঁটি ও আগাম সতর্কীকরণ যন্ত্র বসিয়ে এটা সম্ভব।
এ ছাড়া সতর্কতামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমেও বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা যায়। ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বজ্রপাতে ঘরের ভেতরে ফোন, কম্পিউটার ও অন্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকা, জানালা-দরজা বা যেকোনো প্রবেশদ্বার থেকে দূরে থাকা, বজ্রপাতের সময় দেয়ালে হেলান না দেওয়া ইত্যাদি সচেতনতামূলক পরামর্শ দেওয়া হয়। ঘরের বাইরে ঝুঁকি এড়াতে উঁচু স্থান এড়িয়ে চলা, নদী, পুকুর, খাল-বিল ইত্যাদি থেকে দূরে থাকা, কোনো বড় গাছের নিচে না দাঁড়ানো। বৈদ্যুতিক তারের বেড়া, ধাতব পদার্থ বা সংশ্লিষ্ট বস্তু থেকেও দূরে থাকতে হবে।
ঝড়-বৃষ্টির মতোই বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। আমরা প্রত্যাশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এবং এ ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করতে টেকসই পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।
এফআর