হবিগঞ্জে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল। এতে করে প্রায় ১১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমির পাকা ধান পানির নিচে চলে গেছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।
শনিবার (২ মে) পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২০ হাজার কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করেছে জেলা কৃষি বিভাগ। তবে কৃষকরা বলছেন, পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
অতিরিক্ত উপপরিচালক দীপক কুমার পাল জানান, এ বছর বোরো মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনের আশাও ভালো ছিল। জেলায় এক লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর বোরো ধান চাষ করা হয়েছিল। তার মধ্যে হাওরে ৪৬ হাজার ৯৫৪ হেক্টর।
তবে হঠাৎ করে ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। বিশেষ করে জেলার আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই, নবীগঞ্জ হাওর অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে পানি প্রবেশ করায় পাকা ধান কাটার আগেই তলিয়ে যায়। এতে কৃষকদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে।
এদিকে জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ দুর্যোগ মোকাবেলায় একটি জরুরি মনিটরিং সেল গঠন করেছেন বলেন বলে জানিয়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, হবিগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে মোট আবাদকৃত জমির একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে পানির নিচে চলে গেছে। তবে এরই মধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। বাকি জমির ধান কাটার আগেই পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা।
অন্যদিকে, যে-সব কৃষক ধান কাটতে পেরেছেন, তারাও পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই। টানা মেঘলা আবহাওয়া, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি আর রোদ না থাকায় কাটা ধান শুকাতে পারছেন না তারা। ফলে অনেক স্থানে ধানে পচন ধরেছে বা চারা গজিয়েছে। এতে করে উৎপাদিত ধানের গুণগত মানও কমে যাচ্ছে এবং বাজারমূল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হাওর এলাকার কৃষকরা জানান, বছরের একমাত্র ফসল হিসেবে বোরো ধানের ওপরই তাদের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে। কিন্তু এভাবে হঠাৎ পানিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। এখন ফসল হারিয়ে ঋণ পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তারা। নৌকা দিয়ে পাইকারি ধান ক্রেতারা এলাকায় আসলেও তারা ধানের গুণগত মান দেখে তারা ক্রয় করছেন না।
কৃষি বিভাগ বলছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ চলছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার বিষয়েও সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে। এর মধ্যে প্রণোদনা, বীজ ও সার সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিকল্প ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করার কথাও ভাবা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে হবিগঞ্জে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এবারের বোরো মৌসুম বড় ধরনের দুর্যোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতি ও খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সময়ের আলো/জোই