স্বপ্ন ছিল দু-মুঠো ভাতের, ফিরলেন নিথর দেহে

দিপু সিদ্দিকী, সিলেট

সারাদেশ

সময় তখন ভোর ৬টা। পুব আকাশে কেবল আলোর আভা ফুটতে শুরু করেছে। ২২ জন নির্মাণ শ্রমিকের চোখে তখন রঙিন কোনো

2026-05-03T14:23:31+00:00
2026-05-03T15:01:14+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
স্বপ্ন ছিল দু-মুঠো ভাতের, ফিরলেন নিথর দেহে
দিপু সিদ্দিকী, সিলেট
প্রকাশ: রোববার, ৩ মে, ২০২৬, ২:২৩ পিএম  আপডেট: ০৩.০৫.২০২৬ ৩:০১ পিএম
নিহতদের মরদেহ মর্গের সামনে নিয়ে অপেক্ষা করছেন স্বজনরা। ছবি : সময়ের আলো
সময় তখন ভোর ৬টা। পুব আকাশে কেবল আলোর আভা ফুটতে শুরু করেছে। ২২ জন নির্মাণ শ্রমিকের চোখে তখন রঙিন কোনো স্বপ্ন নয়, বরং সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর কয়েকশ টাকা পারিশ্রমিক পাওয়ার নিশ্চয়তা। লক্ষ্য ছিল সুনামগঞ্জে একটি বাড়ির ছাদ ঢালাইয়ের কাজ। কিন্তু সেই ছাদ আর ঢালাই করা হলো না তাদের। দক্ষিণ সুরমার নাজিরবাজারের তেলিবাজারে রাজপথ রঞ্জিত হলো তাদেরই রক্তে।

রোববার (৩ মে) ভোরেনসিলেটের দক্ষিণ সুরমায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে কাঁঠালবাহী ট্রাক ও শ্রমিকবাহী পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ৮ জন নির্মাণ শ্রমিক। এই মৃত্যু কেবল কিছু সংখ্যা নয়, বরং ৮টি পরিবারের মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়ার মর্মান্তিক গল্প। 

নিহতরা হলেন সুনামগঞ্জের বিসম্বরপুরের দুই সহোদর, আজির উদ্দিন ও আমিরউদ্দিন, ধর্মপাশার সরিষা নার্গিস, দিরাইয়ের সেচনি গ্রামের মোছা. মু‌ন্নি বেগম, দিরাই ভা‌টিপাড়া গ্রামের নুরুজ আলী, ভা‌টিপাড়া নূর নগরের ফ‌রিদুল, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের‌ শিবপুর গ্রামের পান্ডব বিশ্বাস, পুটামারা গ্রামের বদরুজ্জামান।

নিহতদের মধ্যে একজন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ফরিদুল। কয়েকদিন আগেই বাড়ি গিয়েছিলেন পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাওয়া আধা-পাকা ধানটুকু কোনোমতে কেটে ঘরে তুলতে। সেই ধানটুকু মাড়াই করে পরিবারের মুখে অন্নের নিশ্চয়তা দিয়ে আবারও ফিরেছিলেন রাজমিস্ত্রির জোগালি দিতে। ফরিদুলের স্ত্রী এখন অন্তঃসত্ত্বা, ঘরে আছে তিনটি অবুঝ সন্তান। সন্তানদের জন্য নতুন জামা কিংবা অনাগত সন্তানের মুখ দেখা হলো না তার। অভাবের তাড়নায় যে জীবনযুদ্ধে তিনি নেমেছিলেন, সেই যুদ্ধ শেষ হলো পিচঢালা রাজপথে।


নিহত ফরিদুলের ভাই জানান, ফরিদুলের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা এবং আরও তিনটি সন্তান রয়েছে। এমন করুণ মৃত্যুতে তার স্ত্রী সন্তানরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। 

নিহত ফরিদুলের সঙ্গে কাজ করা অপর নির্মাণ শ্রমিক আমিনুল জানান, সকালে একসঙ্গে আম্বরখানায় ছিলাম। পরে তারা ডিআই পিকআপে করে সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। পথিমধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়। এছাড়া অনেকে আহত হয়েছেন। 

স্থানীয় ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে সিলেটগামী একটি কাঁঠাল বোঝাই ট্রাকের সঙ্গে বিপরীতমুখী শ্রমিকবাহী পিকআপটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের প্রচণ্ডতায় পিকআপটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান অনেকে। 

সিলেট ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক শফিকুল ইসলাম ভুইঁয়া জানান, খবর পেয়ে দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে হতাহতদের সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘ হয়।

এদিকে হাসপাতালের করিডোরে এখন শুধু স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ। কেউ হারিয়েছেন বাবা, কেউ ভাই, আবার কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে। বর্তমানে আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।

দুর্ঘটনার পর ঘাতক ট্রাক ও পিকআপের চালক পালিয়ে গেলেও পুলিশ গাড়ি দুটি জব্দ করেছে। তবে এই আইনি প্রক্রিয়ায় কি ফরিদুলের অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে? কিংবা যে তিন শিশু এখনো জানে না তাদের বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, তাদের চোখের জল মোছাবে কে?

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   সিলেট  শ্রমিক  জীবনযুদ্ধ  নিহত 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: