স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্ষমতার নগ্ন স্বীকারোক্তি

শহীদুল্লাহ ফরায়জী

মতামত

রাষ্ট্রক্ষমতা সাধারণত তার নির্মমতাকে মখমলের মোড়কে আবৃত রাখে- আইন, সংবিধান এবং প্রাতিষ্ঠানিক বুলির আড়ালে লুকিয়ে থাকে তার দম্ভ ও কর্তৃত্ব।

2026-05-04T04:12:23+00:00
2026-05-04T04:12:23+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
মতামত
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্ষমতার নগ্ন স্বীকারোক্তি
শহীদুল্লাহ ফরায়জী
প্রকাশ: সোমবার, ৪ মে, ২০২৬, ৪:১২ এএম   (ভিজিট : ১৭৬)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
রাষ্ট্রক্ষমতা সাধারণত তার নির্মমতাকে মখমলের মোড়কে আবৃত রাখে- আইন, সংবিধান এবং প্রাতিষ্ঠানিক বুলির আড়ালে লুকিয়ে থাকে তার দম্ভ ও কর্তৃত্ব। ক্ষমতা খুব কমই নিজেকে নগ্নভাবে উপস্থাপন করে, বরং শৃঙ্খলা, স্থিতি এবং কল্যাণের ভাষায় নিজেকে বৈধতা দেয়। 

কিন্তু ইতিহাসের কিছু সন্ধিক্ষণে এমন কিছু উচ্চারণ বেরিয়ে আসে, যা এই পর্দাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। তখন ক্ষমতা আর নিজেকে আড়াল করে না, বরং অনাবৃত ও নির্মম সত্যে আত্মপ্রকাশ করে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্য তেমনই একটি মুহূর্ত- অন্ততপক্ষে ক্ষমতার ভাষার একটি সম্ভাব্য উন্মোচন। তার বক্তব্য- ‘সংস্কারের বাহানায় যদি নির্বাচন হতে না দেয়, সে জন্য তারা সবকিছুতে আপস করে জুলাই জাতীয় সনদেও সই করেছেন’- শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়, এটি এমন এক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত, যেখানে ক্ষমতা অর্জনই হয়ে ওঠে রাজনীতির একমাত্র নির্ধারক সত্য।

এই বক্তব্যে প্রথম যে বিপজ্জনক রূপান্তরটি ঘটে, তা হলো- সংস্কারকে ‘বাহানা’ হিসেবে চিহ্নিত করা। সংস্কার কোনো কৌশলগত বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতা। কিন্তু যখন এটিকে ‘বাহানা’ বলা হয়, তখন রাজনীতি নিজেই তার নৈতিক ভিত্তিকে সন্দেহের মুখে দাঁড় করায়।

এর ফলে একটি কৃত্রিম দ্বন্দ্ব নির্মিত হয়- সংস্কার বনাম নির্বাচন। যেখানে এই দুটিকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ প্রকৃত গণতান্ত্রিক দর্শনে এরা প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একটি দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ। সংস্কার ছাড়া নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে বৈধতা থাকে, কিন্তু ন্যায্যতা অনুপস্থিত থাকে। 

আবার নির্বাচন ছাড়া সংস্কার তার গণভিত্তি ও নৈতিক বৈধতা হারায়, হয়ে পড়ে একটি আরোপিত প্রক্রিয়া। সুতরাং, সংস্কার নির্বাচনকে অর্থবহ করে তোলে, আর নির্বাচন সেই সংস্কারকে বৈধতা ও দিকনির্দেশনা দেয়। এই বাস্তবতাকে আড়াল করেই ‘সংস্কার বনাম নির্বাচন’- এই ভ্রান্ত দ্বৈততা নির্মাণ করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনাকেই বিকৃত করে। এরপর আসে আরও গভীরতর সংকেত-‘সবকিছুতে আপস’।

রাজনীতিতে আপস কোনো স্বাভাবিক বা নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া নয়, এটি সবসময় নৈতিক সীমারেখা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যতিক্রমী অবস্থা। 

আপসের একটি স্পষ্ট সীমানা থাকে, যা অতিক্রম করলে তা আর কৌশলগত নমনীয়তা থাকে না, বরং নীতির পরিত্যাগে পরিণত হয়। যখন একজন নীতিনির্ধারক প্রকাশ্যে বলেন ‘সবকিছুতে আপস’, তখন তিনি কার্যত এই বার্তাই দেন-ক্ষমতার জন্য নৈতিক সীমারেখা আর অপরিহার্য নয়। এই মুহূর্তে আপস আর সমঝোতা নয়, এটি হয়ে ওঠে আত্মসমর্পণ, যেখানে নীতি ক্ষমতার কাছে নতজানু হয়।

এই অবস্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় গধপযরধাবষষর-এর সেই নির্মম বাস্তববাদকে, যেখানে জবধংড়হ ড়ভ ংঃধঃব নীতিকে ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু আধুনিক গণতন্ত্র ঠিক এই ধারণার সীমা নির্ধারণ করতেই গড়ে উঠেছে। ওসসধহঁবষ কধহঃ আমাদের শিখিয়েছেন- মানুষকে কখনোই কেবল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায় না; ঔড়যহ জধষিং মনে করিয়ে দেন-ন্যায়বিচার রাষ্ট্রের প্রথম গুণ, আর ঐধহহধয অৎবহফঃ সতর্ক করেছিলেন- রাজনীতি তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন তা নিজের নৈতিক কেন্দ্র হারায়।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে-যদি ক্ষমতায় আসার জন্য ‘সবকিছুতে আপস’ করা যায়, তবে ক্ষমতায় থাকার বাস্তবতায় কোন কোন ক্ষেত্রে সেই আপস কার্যকর হচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বাস্তব কাঠামোর মধ্যেই অনুসন্ধান করতে হয়। ক্ষমতায় আরোহণের সময় যে আপসকে ‘কৌশল’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তা ধীরে ধীরে রূপ নেয় কাঠামোগত সমঝোতায়। 

তখন আপসের পরিধি কেবল রাজনৈতিক কৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা বিস্তৃত হয় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন স্তরে- ন্যায়বিচারের নিরপেক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, সত্য ও রাজনৈতিক সততার মানদণ্ড এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থার কাঠামোতে।

এই আপস কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেই সীমিত থাকে না, বরং এই আপস কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, এটি বহির্মুখীও পরাশক্তির সঙ্গে আপস, ডিপ স্টেটের সঙ্গে আপস, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সঙ্গে আপস, সবকিছুই তখন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার বাস্তবতায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে।

কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল কেবল ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো রাজনৈতিক ঘটনা নয়। এর অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল রাষ্ট্রের নৈতিক পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক অঙ্গীকার। এটি ছিল এমন এক সম্মিলিত আকাক্সক্ষা, যেখানে রাষ্ট্রকে কেবল প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে নয়, বরং ন্যায়, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের নৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্গঠনের দাবি উচ্চারিত হয়েছিল।

এই আন্দোলন তাই কেবল শাসক পরিবর্তনের দাবি নয়, এটি ছিল শাসনের চরিত্র পরিবর্তনের দাবি। জনগণ কেবল নতুন মুখ চায়নি, তারা চেয়েছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতা আর নিরঙ্কুশ থাকবে না, বরং আইনের অধীন হবে, যেখানে জবাবদিহিতা হবে ব্যতিক্রম নয়, বরং স্বাভাবিক শাসননীতি।

এত রক্তপাত, ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা তাই কোনো সাময়িক রাজনৈতিক সমঝোতায় সীমাবদ্ধ করা যায় না। এর ভেতরে ছিল রাষ্ট্রকে নৈতিক ভিত্তির ওপর পুনর্নিমাণ করার এক গভীর ঐতিহাসিক প্রত্যয় যা উপেক্ষা করা মানে কেবল একটি আন্দোলন নয়, একটি যুগের নৈতিক দাবিকেই অস্বীকার করা।

এই প্রেক্ষাপটে সংস্কারকে ‘বাহানা’ হিসেবে চিহ্নিত করা আর কেবল একটি রাজনৈতিক মন্তব্য থাকে না, এটি ধীরে ধীরে সেই নৈতিক দাবিকেই সন্দেহের মুখে দাঁড় করায়, যার ওপর পুরো আন্দোলনের ঐতিহাসিক অর্থ দাঁড়িয়ে আছে।

জনগণের আত্মত্যাগ তখন আর ন্যায় ও রাষ্ট্র রূপান্তরের ঐতিহাসিক আকাক্সক্ষা হিসেবে স্বীকৃত থাকে না, বরং তা ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ, কৌশলগত সুবিধা বা রাজনৈতিক দরকষাকষির একটি উপাদান হিসেবে উপস্থিত থাকে।

এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে রাষ্ট্রে আস্থার সংকট অনিবার্য হয়ে ওঠে। কারণ গণতন্ত্র কেবল নির্বাচননির্ভর কোনো প্রক্রিয়া নয়, এটি প্রতিশ্রুতি, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার একটি সমন্বিত কাঠামো। যখন প্রতিটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার ক্ষমতার কৌশলগত উপকরণে পরিণত হয়, তখন রাজনৈতিক ভাষা তার নৈতিক ও অর্থবোধক শক্তি হারাতে শুরু করে এবং সেই সঙ্গে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে বৈধতার সংকটে নিমজ্জিত হয়।

শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি যদি রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে, তবে প্রজাতন্ত্রের স্বপ্ন, মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক অভিপ্রায় নবই ধীরে ধীরে অর্থহীনতার সীমায় এসে দাঁড়ায়।

অতএব, রাষ্ট্র যদি সত্যিই একটি নৈতিক ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চায়, তা হলে প্রথমত, ক্ষমতাকে কৌশলের হাত থেকে মুক্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। প্রতিশ্রুতি রক্ষা শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয় নয় এটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক একটি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত শাসনব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক হয়।

তৃতীয়ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করে নৈতিক নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে হবে যাতে তারা কৌশলের হাতিয়ার না হয়ে ন্যায়ের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।

চতুর্থত জনগণের আস্থাকে প্রতীকী ধারণা হিসেবে নয়, বাস্তব অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হবেÑ নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণের সাংবিধানিক সুযোগ দিতে হবে।

ক্ষমতা নয় ন্যায়, 
কৌশল নয় নীতি, 
শাসন নয় জনগণের আস্থা। 
রাষ্ট্র টিকে থাকে তখনই, যখন এই তিনটি নৈতিক ভিত্তি কেবল উচ্চারণ নয় প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে।

লেখক : গীতিকবি


  বিষয়:   স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী  ক্ষমতা 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: