আসন্ন বাজেটে জনমানুষের প্রত্যাশা

মো. শাহিন আলম

মতামত

আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর সংসদে

2026-05-08T05:18:17+00:00
2026-05-08T05:18:17+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
আসন্ন বাজেটে জনমানুষের প্রত্যাশা
মো. শাহিন আলম
প্রকাশ: শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬, ৫:১৮ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর সংসদে এটি বিএনপির প্রথম বাজেট এবং স্বাভাবিকভাবেই এতে দলটির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটার কথা। মাত্র সাড়ে তিন মাসের মধ্যে তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ বাজেট তৈরি করতে হচ্ছে। ফলে সময় যেমন কম, প্রত্যাশার চাপও তেমনই বেশি। 

গত বছরের বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দ কমানো হয়েছিল, যা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগসহ (সিপিডি) বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান উদ্বেগজনক বলে চিহ্নিত করেছিল। সুতরাং, বিএনপি সরকারের সামনে সুযোগ আছে সেই ধারা বদলানোর। তবে এই বাজেট কেমন হবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আগে দেখতে হবে বর্তমান পরিস্থিতিটা আসলে কেমন।

বিএনপি সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন অর্থনীতি অত্যন্ত ভঙ্গুর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবে ৩ দশমিক ৩ থেকে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশের মধ্যে, যা বিগত কয়েক দশকে সর্বনিম্নের কাছাকাছি। মূল্যস্ফীতিও এখন সাড়ে আট থেকে নয় শতাংশের আশপাশে ঘুরছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ধারাবাহিক চাপ তৈরি করছে। 

উচ্চ সুদের হার একদিকে দেশীয় বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় পণ্যের দাম বাড়ছে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়েও এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদিও আশার কথা হলো, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এই ধকল কাটিয়ে ওঠার জোরালো প্রচেষ্টা বর্তমানে চলমান।

এই নাজুক অর্থনীতির পাশাপাশি পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট সরকারি ঋণের বোঝা ২২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থমন্ত্রী নিজেই সংসদে স্বীকার করেছেন যে, এই ঋণ পরিশোধের চাপে সরকার এখনও কঠিন অবস্থায় রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই পাহাড়সম খেলাপি ঋণ ব্যাংক থেকে নতুন বিনিয়োগের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন করছে, আর্থিক খাতে তারল্য সংকট তৈরি করছে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করছে। এই বাজেটে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর রোডম্যাপ না থাকলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অসম্পূর্ণই থাকবে।

এর পাশাপাশি আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি বাধ্যবাধকতা হলো আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী, ভর্তুকি সংকোচন, রাজস্ব বৃদ্ধি ও বিনিময় হারের নমনীয়তা বজায় রাখা জরুরি। ফলে নতুন সরকারের বাজেট প্রণয়নের স্বাধীনতা কিছুটা হলেও সীমিত। তদুপরি দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সর্বনিম্ন। অর্থমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, রাজস্ব বাড়ানো এখন অপরিহার্য। 

এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিচালন ব্যয় কমানোর সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারি গাড়িতে জ্বালানি ৩০ শতাংশ কমানো, বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ও অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ বন্ধ এবং আপ্যায়ন ও নতুন যানবাহন ক্রয় স্থগিত করার পদক্ষেপগুলো সত্যিই প্রশংসনীয়। এটি সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলারই ইঙ্গিত দেয়। তবে প্রশ্ন হলো, এই শৃঙ্খলা কি বাজেটের মূল কাঠামোতেও প্রতিফলিত হবে?

২. বিএনপি নির্বাচনি প্রচারে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এর মধ্যে সবচেয়ে সাহসী প্রতিশ্রুতি হলো ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতিমধ্যে বলেছেন, আগামী বাজেটে কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হবে। এই লক্ষ্যটা নিছক রাজনৈতিক ঘোষণাই নয়, অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতাও। কারণ প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ নতুন কর্মী শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। 

কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ, আর বিনিয়োগ আসে আস্থার পরিবেশ থেকে। সেই আস্থার মানদণ্ড হলো সুশাসন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি এবং দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনা। এসব নিশ্চিত করা না গেলে কেবল কর ছাড় বা সহজ ঋণে বিশেষ সুফল আসবে না। তাই বাজেটে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের একটি বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ থাকা একান্ত প্রয়োজন।

একইভাবে ৩১ দফা রূপরেখায় স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি ছিল। বাস্তবে দেখা যায়, এই খাতে বরাদ্দ বহু বছর ধরে ১ শতাংশের কাছাকাছি ঘুরছে। একলাফে পাঁচ শতাংশে পৌঁছানো স্বল্পসময়ে সম্ভব নয়, এটা সবাই জানেন। তবে বাজেটে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি না হলে জন-অসন্তোষ বাড়বে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে ওষুধের দুষ্প্রাপ্যতা ও চিকিৎসকের ঘাটতি মেটাতে কার্যকর পদক্ষেপ দরকার।

কৃষি খাতের চিত্রও ভিন্ন কিছু নয়। দেশের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষিতে যুক্ত থাকলেও গত কয়েক বছরে এই খাতে উন্নয়ন বরাদ্দ কমেছে। সার, কৃষি উপকরণ, সেচ ও কোল্ডস্টোরেজ সুবিধা বিস্তার এবং কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিতে বিনিয়োগ না বাড়লে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ আয় চাপে পড়বে।

পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমানে বয়স্ক ও বিধবা ভাতার পরিমাণ মাত্র ৬৫০ টাকা, যা দিয়ে বর্তমান বাজারে এক সপ্তাহও চলা অসম্ভব। এই ভাতা বাস্তবসম্মতভাবে বৃদ্ধি করা এবং উপকারভোগী তালিকা থেকে রাজনৈতিক প্রভাব দূর করা এখন সময়ের দাবি। 

ভাতার টাকা যদি প্রকৃত দুস্থদের বদলে রাজনৈতিক ক্যাডাররা পান, তবে বরাদ্দের উদ্দেশ্যই সফল হবে না। তা ছাড়া সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অংশ হিসেবে ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাকে সর্বজনীন রূপ দিতে এবং সুফল নিশ্চিতে আসন্ন বাজেটে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বন্ধ হওয়া পাটকল, চিনিকল ও টেক্সটাইল মিলগুলো পুনরায় চালু করার যে অঙ্গীকার রয়েছে, বাজেটে তার বরাদ্দভিত্তিক প্রতিফলন থাকা জরুরি। এ ছাড়া রফতানি বৈচিত্র্য এবং শিক্ষায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক সম্প্রসারণের কথা বহু বছর ধরে বলা হচ্ছে, কিন্তু কাজ এগোয়নি। ওষুধ শিল্প, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য খাতগুলোতে প্রণোদনা ও অবকাঠামো সহায়তায় বরাদ্দ বাড়ানো এই বাজেটের সামনে একটি বড় সুযোগ, যা এবার কাজে লাগানো না গেলে এলডিসি উত্তরণের পর তৈরি পোশাক খাতে শুল্ক চাপ সামলানো কঠিন হবে।

রাজস্বের দিক থেকে দেখলে, বাংলাদেশের সংকটের গোড়া হলো করজাল সংকীর্ণ আর কর ফাঁকি ব্যাপক। যারা নিয়মিত কর দেন তাদের ওপর চাপ বাড়তে থাকে, আর যাদের দেওয়ার কথা তারা ক্ষমতার ফাঁকফোকরে বাইরে থাকেন। এনবিআর আসন্ন বাজেটের জন্য করদাতা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের কাছ থেকে মতামত নিয়েছে। ব্যবসায়ী মহল কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, হয়রানিমুক্ত পরিবেশ এবং উদ্যোক্তাবান্ধব নীতিমালার দাবি রেখেছেন। এগুলো যৌক্তিক। 

বাজারের কাঠামোতেও হস্তক্ষেপ ছাড়া মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন। আমাদের বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দীর্ঘদিনের পুরোনো সমস্যা। কৃষিপণ্য উৎপাদক পর্যায়ে কম দামে বিক্রি করেন, অথচ ভোক্তা বেশি দামে কেনেন আর মাঝের অংশটা মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যায়। এই সরবরাহ শৃঙ্খলের অসংগতি দূর না হলে বাজেটে যতই সুলভ নীতি রাখা হোক, তার ফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।

৩. এদিকে নতুন সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ বাতিল বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে, যার মধ্যে আছে বিচার বিভাগীয় নিয়োগ, পুলিশ সংস্কার এবং দুর্নীতি নজরদারি-সংক্রান্ত বিধান। বিরোধী দল ও জুলাই অভ্যুত্থানের নেতারা এটিকে সংস্কারবিরোধী পদক্ষেপ বলছেন। বিএনপি সরকার বলছে, এগুলো সংশোধন করে বাস্তবায়ন হবে। তবে বিনিয়োগ প্রশ্নে এই বিতর্কের সরাসরি প্রভাব আছে। কারণ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন দেখেই সিদ্ধান্ত নেন। 

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, অলিগার্করা বাড়তি সুবিধা পেলে টাকা পাচার হয় এবং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন অর্থমন্ত্রী এই চেহারাগুলো চেনেন বলেই জানিয়েছেন। এখন দেখার, চেনার সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহসটুকুও আছে কি না।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং রেমিট্যান্স কমার ঝুঁকি থাকবে। এ ছাড়া এলডিসি উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা কমতে থাকলে রফতানি আয়েও চাপ আসবে। একটি দায়িত্বশীল বাজেট এই ঝুঁকিগুলো স্বীকার করে এবং সামলানোর কৌশলগুলো মাথায় রেখেই এগোতে হবে। বিশেষ করে বিকল্প শ্রমবাজার, জ্বালানি বৈচিত্র্য এবং রফতানি পণ্যের বিস্তারে বাস্তবমুখী বরাদ্দ ও নীতিগত ঘোষণা জরুরি।

বিএনপি দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরেছে এবং জনমনে এখনও তাদের প্রতি প্রত্যাশার উষ্ণতা বিরাজমান। তবে সেই উষ্ণতা দৃশ্যমান থাকতেই পরিবর্তন আনতে হবে। বাজেটের অঙ্কের চেয়েও বড় কথা হলো, সাধারণ মানুষ যেন বুঝতে পারে তাদের কষ্টের কথা সরকার অনুধাবন করেছে এবং সমাধানের একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করাই হবে আসন্ন বাজেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের আলো/জেডি 



  বিষয়:   আসন্ন বাজেট  প্রত্যাশা  জাতীয় সংসদ  ২০২৬-২৭ অর্থবছর 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: