সাধারণত সাতক্ষীরা বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে সুন্দরবন কিংবা দিগন্তজোড়া চিংড়ি ঘেরের দৃশ্যপট। কিন্তু, গত এক দশকে এখানকার আম জেলাটিকে দিয়েছে ভিন্ন পরিচিতি। এবারেও প্রথম পরিপক্ব আম নিয়ে বাজারে হাজির সাতক্ষীরা জেলা।এর পেছনে বড় ভূমিকা পালন করছে ভৌগোলিক পার্থক্য। অক্ষাংশ, তাপমাত্রার তারতম্য ও নোনামাটি- এ জেলার আমকে করেছে অনন্য। ফলে গত এক দশকে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আমের বাজার ঘুরে গেছে সাতক্ষীরা জেলার দিকে।
মধুমাস হিসেবে পরিচিত জ্যৈষ্ঠ মাস শুরু না হতেই বাজারে আসতে শুরু করেছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলা সাতক্ষীরার আম।
সাতক্ষীরার আম কেন জনপ্রিয়?
কৃষি গবেষকদের মতে, সাতক্ষীরা এখন দেশের আম অর্থনীতির নতুন উৎস। ভালো স্বাদ এবং বাজারে সবার আগে আসার কারণে এ জেলার আমের জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলে মনে করেন তারা।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিষমুক্ত চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণের ফলে এখানকার আম ইউরোপের চেইন শপগুলোতেও জায়গা করে নিয়েছে।
এর ফলে এখানে আম ব্যবসার পরিধি বাড়ছে। সাতক্ষীরার অনেক কৃষকই এখন আম চাষের দিকে ঝুঁকেছেন।
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘চলতি মৌসুমে জেলায় ৪ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১২ হাজার ৩০০ চাষি আমের চাষ করেছেন।’
সাতক্ষীরার আম কেন আগে বাজারে আসে?
সাতক্ষীরার আম বাজারে আগে আসার বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন কৃষিবিদরা।
কৃষি গবেষকরা মনে করেন, এর পেছনে ভৌগোলিক কারণ রয়েছে। প্রতি ডিগ্রি অক্ষাংশ বৃদ্ধির জন্য আমের সংগ্রহকাল তিন দিন পিছিয়ে যায়। দেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী সাতক্ষীরা এলাকা ২২ দশমিক ৬০ ডিগ্রি অক্ষাংশে অবস্থিত এবং উত্তরের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের অবস্থান ২৪ দশমিক ৫৬ ডিগ্রি অক্ষাংশে। সেই হিসেবে প্রতি ডিগ্রি অক্ষাংশের পরিবর্তনে সাতক্ষীরা এলাকা থেকে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের সংগ্রহকাল অন্তত ছয় থেকে সাতদিন পরে শুরু হয়। বিশ্বজুড়েই আম উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই নিয়মটি একইরকম। অর্থাৎ, অক্ষাংশ যত বাড়বে আমের সংগ্রহকাল ততো পিছিয়ে যাবে।
এছাড়া, আমের মুকুল আসা এবং ফোটার ক্ষেত্রে তাপমাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মুকুল যখন আসে তখন তা ফুটতে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ দিন সময় লাগে। কিন্তু, তাপমাত্রা বেশি হলে মুকুল কিছুটা আগেভাগেই ফুটে যায়। সাতক্ষীরায় তাপমাত্রা বেশি থাকায় অন্য এলাকার তুলনায় আম আগেই পরিপক্ব হয়।
মাটির লবণাক্ততাও আগে আম পেকে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গবেষকদের মতে, মাটিতে লবণ থাকার কারণে যে কোনো জিনিসের বয়স কমে যায়।
এ বছর ৫ মে থেকে সাতক্ষীরায় গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ আম সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে। এরপর ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য জাতের আম সংগ্রহ করা হবে বলে জানা যায়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন জানান, নির্ধারিত সময় মেনে আম সংগ্রহ শুরু হওয়ায় আমের গুণগত মান বজায় থাকবে, যা বাজারে সাতক্ষীরার আমের সুনাম ধরে রাখতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে অপরিপক্ব ও রাসায়নিকযুক্ত আম বাজারজাত ঠেকাতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি রাখবে।
তিনি আরও জানান, এছাড়া আগামী ১৫ মে থেকে হিমসাগর, ২৭ মে ল্যাংড়া ও ৫ জুন থেকে আম্রপালি আম পাওয়া যাবে। এ বছর প্রায় ১০০ মেট্রিকটন আম ইউরোপসহ বিদেশে রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এবং প্রায় ৩০০ কোটি টাকার আম বিক্রি হবে।
আমচাষী আবু সাইদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করি। এবার গাছে ফলন ভালো হয়েছে। সরকার নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আম সংগ্রহ শুরু হওয়ায় আমরা ভালো দাম পাওয়ার আশা করছি। যদি আবহাওয়া অনুকূলে থাকে, তাহলে এই মৌসুম আমাদের জন্য লাভজনক হবে।’
স্বাদ নিয়ে ভাবনা?
অনেকের ধারণা, যেসব আম আগে বাজারে আসে, তা ভালো হয় না। ক্রেতারা ভেবে থাকেন, অপরিপক্ক আম হয়তো ফরমালিন দিয়ে পাকিয়ে বাজারে আনা হয়েছে। কিন্তু, সাক্ষীরার আম নিয়ে এই শঙ্কা নেই।
গবেষকদের মতে, সাতক্ষীরায় উৎপাদিত একই জাতের আমের সঙ্গে রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে স্বাদের ক্ষেত্রে খুব বেশি পার্থক্য থাকে না। আমের জাত এবং মাটির গুণ ভেদে স্বাদের কিছুটা পার্থক্য থাকে মাত্র। তবে, বৃষ্টির প্রভাব কম থাকলে, আমের আকারে সামান্য প্রভাব পড়তে পারে।
কৃষি গবেষক ড. মো. শরফ উদ্দিন বলছেন, ‘রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে এই সময় অধিক খরা হওয়ায় মাটিতে রসের ঘাটতি তৈরি হয়, যার ফলে শুষ্ক আবহাওয়ায় আমের আকার কিছুটা বড় হয়।’
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭০ হাজার মেট্রিক টন। এমনকি চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা থেকে ১০০ টন আম বিদেশে রফতানির লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
/মহু