এনজিওর ফাঁদে সহস্রাধিক পরিবার

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

গাইবান্ধায় একের পর এক ভুয়া সংস্থার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি ‘আল আনসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ এবং ‘তিশা

2026-05-09T00:55:50+00:00
2026-05-09T00:55:50+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
এনজিওর ফাঁদে সহস্রাধিক পরিবার
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ১২:৫৫ এএম 
এনজিওর ফাঁদে সহস্রাধিক পরিবার। ছবি : সময়ের আলো
গাইবান্ধায় একের পর এক ভুয়া সংস্থার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি ‘আল আনসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ এবং ‘তিশা ফাউন্ডেশন’- এই দুটি কথিত সামাজিক সংগঠন জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সহস্রাধিক পরিবারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে রাতারাতি উধাও হয়ে গেছে। বিনামূল্যে পাকা ঘর ও গবাদিপশুর প্রলোভন থেকে শুরু করে উচ্চ মুনাফার ঋণের আশ্বাস- ভিন্ন কৌশলে একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগীরা। বিচার ও অর্থ ফেরতের দাবিতে থানায় অভিযোগ দায়েরের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনেও নামছেন তারা।

আল আনসারের ফাঁদ : ঘর-নলকূপের স্বপ্ন দেখিয়ে দেড় কোটি লোপাট
গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের মধ্য নারায়ণপুর এলাকায় প্রথমে শিকড় গাড়ে ‘আল আনসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’। সংগঠনটির পরিচালক মাওলানা শহিদুল ইসলাম বগুড়া সদরের বৃন্দাবন পাড়ার আকবর আলীর ছেলে স্থানীয় একটি মহিলা মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আল আমিনের সঙ্গে সখ্য গড়ে এলাকায় যাতায়াত শুরু করে। নিজেকে একটি বড় সংগঠনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে সে।

এরপর শুরু হয় মূল প্রতারণার পালা। বিনামূল্যে পাকা ঘর, নলকূপ ও গবাদিপশু প্রদানের লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর কাছ থেকে ‘নিবন্ধন ফি’ ও ‘সদস্য চাঁদা’ বাবদ অর্থ সংগ্রহ করতে থাকে শহিদুল। শুধু সদর উপজেলাতেই সহস্রাধিক পরিবারের কাছ থেকে কমপক্ষে দেড় কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়। পলাশবাড়ী ও ফুলছড়ি উপজেলাতেও একইভাবে প্রতারণার জাল বিস্তার করে কয়েক হাজার মানুষের কাছ থেকে মোট প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত সময় পার হলেও প্রতিশ্রুত সহায়তা না পেয়ে যখন সদস্যরা যোগাযোগ করতে গেলেন, ততক্ষণে শহিদুল ইসলাম গা-ঢাকা দিয়েছে। স্বপ্নের ঘর আর মেলেনি, শুধু হাতছাড়া হয়েছে কষ্টার্জিত সঞ্চয়।

তিশা ফাউন্ডেশনের ফাঁদ : ঋণের আশায় সঞ্চয় দিয়ে পথে বসেছেন ব্যবসায়ীরা
একই সময়ে গাইবান্ধা পৌর এলাকার গাইবান্ধা-পলাশবাড়ী সড়কের সুখ-শান্তির বাজারে কার্যক্রম চালাতে থাকে ‘তিশা ফাউন্ডেশন’ নামের আরেকটি কথিত এনজিও। এই সংস্থার কৌশল ছিল ভিন্ন, তবে উদ্দেশ্য এক। মাত্র ১০ হাজার টাকা সঞ্চয় জমা রাখলে ১ লাখ টাকা এবং ১ লাখ টাকায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সংস্থাটির ব্রাঞ্চ ম্যানেজার জসিম মিয়াসহ কর্মকর্তারা বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঘুরে ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করত। সহজ ঋণের আশায় সদর উপজেলার অন্তত ২০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এই ফাঁদে পা দেয়। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী রতন মিয়া জানান, কর্মকর্তাদের কথায় বিশ্বাস করে তিনি একাই ৯২ হাজার টাকা সঞ্চয় জমা রাখেন। ঋণ পাওয়ার নির্ধারিত দিনে অফিসে গিয়ে দেখেন দরজায় তালা ঝুলছে, ভেতরে কেউ নেই। আর কখনো দেখা মেলেনি কর্মকর্তাদের।

শুধু রতন মিয়া নন, শত শত গ্রাহক একই দুর্ভোগের শিকার। সংস্থাটি জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে মোট কোটি টাকারও বেশি আত্মসাৎ করে উধাও হয়েছে বলে অভিযোগ। বারবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ব্রাঞ্চ ম্যানেজার জসিম মিয়ার নম্বর বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীদের স্বজনরাও। ইমরান হোসেন নামে একজন বলেন, যে বাড়ি এনজিওটি ভাড়া নিয়েছিল, তার মালিক একজন সাবেক সমাজসেবা কর্মকর্তা। অথচ তিনিও নাকি তাদের সঠিক পরিচয় জানেন না। এত বড় ক্ষতির দায় তা হলে কে নেবে?
আরও পড়ুন

পুলিশ তদন্তে, তবে লিখিত অভিযোগের অপেক্ষা
তিশা ফাউন্ডেশনের প্রতারণার বিষয়ে ভুক্তভোগীরা ইতিমধ্যে গাইবান্ধা সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। আল আনসারের বিষয়েও গ্রেফতারি অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন সদর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, প্রতারক চক্রটিকে শনাক্ত ও গ্রেফতারে কাজ চলছে। দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) শরীফ আল রাজিব বলেন, আল আনসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতারণার বিষয়টি তার আনুষ্ঠানিকভাবে জানা নেই। তবে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রত্যেক অপরাধীকে গ্রেফতার করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

সামাজিক সচেতনতার আহ্বান :
নাগরিক সংগঠন গাইবান্ধা নাগরিক মঞ্চের আহ্বায়ক অ্যাড. সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, এ ধরনের প্রতারণা রুখতে হলে পুলিশি তৎপরতার পাশাপাশি সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিচিত কোনো সংগঠনের প্রলোভনে সাড়া দেওয়ার আগে তার নিবন্ধন, কার্যক্রম ও পরিচয় যাচাই করা জরুরি। ‘বিনামূল্যে সুবিধা’ বা ‘অস্বাভাবিক মুনাফার’ প্রতিশ্রুতিই সাধারণত প্রতারণার প্রথম সংকেত।

গাইবান্ধার এই ধারাবাহিক প্রতারণার ঘটনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের স্বপ্নকে পুঁজি করে প্রতারকরা কতটা সুসংগঠিত হয়ে মাঠে নামছে। প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ এবং সাধারণ মানুষের সতর্কতাই পারে এই দুষ্টচক্র ভাঙতে। 

এএডি/


  বিষয়:   এনজিও  ফাঁদ  পরিবার 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: