ঈষিতার বয়স এখন সাত। যখন তার বয়স মাত্র দুই বছর তখনই তার মা মারা যান। মায়ের মুখচ্ছবি তাই পুরোপুরি মনে নেই ঈষিতার। মায়ের চুল, চোখ, হাসি- সবই এখন আবছা। তবু মায়ের জন্য মন কেমন কেমন করে ঈষিতার।
মা মারা যাওয়ার পর নানুর সঙ্গেই গ্রামে থাকে ঈষিতা। পাড়ার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে স্কুলে যায়। সারা দিন বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে কাটলেও সন্ধ্যা হলেই মায়ের জন্য মন খারাপ হয় তার। ঈষিতা তখন এক দৌড়ে ঘরে চলে যায়। জানালা দিয়ে আকাশ দেখে আর ভাবে- মা হয়তো আকাশের কোনো একটি তারা হয়ে লুকিয়ে আছে। তাই প্রতিদিন সে তারা গোনে আর মাকে খুঁজে বেড়ায়।
তারা গুনতে গুনতে ঈষিতার চোখে জল আসে। নানু তখন পাশে এসে ঈষিতার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তারপর পাশে বসিয়ে মায়ের ছেলেবেলার গল্প শোনান। গল্প শুনতে শুনতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে ঈষিতা।
শনিবার স্কুল খোলা। প্রথম ক্লাসে ম্যাম বললেন- ‘শোনো, শিক্ষার্থী বন্ধুরা, আগামীকাল তোমরা প্রত্যেকে তোমাদের মা-কে সঙ্গে নিয়ে স্কুলে আসবে। কারণ কাল মা দিবস। তাই আমরা সবাই মিলে মাকে নিয়ে বিশেষভাবে দিনটি উদযাপন করতে চাই।’ ম্যামের কথায় সবার চোখে-মুখে খুশির বন্যা। সবাই হাততালি দিয়ে মুখর করে তুলল শ্রেণিকক্ষ। অথচ ঈষিতার মুখে বিষাদের ছায়া। মায়ের জন্য তার প্রাণ অস্থির হয়ে উঠেছে। পেছনের সারির এক কোণে মনমরা হয়ে বসে রইল সে।
আরও পড়ুন
স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে মায়ের ছবিতে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ঈষিতা। বেগুনি রঙের শাড়ি পরা ছবিতে মাকে যেন পরীর মতো লাগছে। ঈষিতা মায়ের ছবিতে হাত বুলিয়ে দেয়। এই মিষ্টি ছবিটা এর আগে সে কখনো দেখেনি। আজ নানু ছবিটা তাকে বের করে দিয়েছেন।
রোববার খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়ে ঈষিতা। আলমারি থেকে খুঁজে খুঁজে মায়ের বেগুনি শাড়িটা বের করে। শাড়ি নাকে ধরে মায়ের ঘ্রাণ আছে কি না শুঁকে দেখে। তারপর শাড়িটা খুব যত্নে স্কুলব্যাগে ঢুকিয়ে নেয় ঈষিতা।
রোববারের স্কুলটা অন্যরকম লাগছে। শ্রেণিকক্ষগুলো ধুয়ে-মুছে পরিপাটি করা হয়েছে। শিশুদের আঁকা ছবি, বেলুন আর রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো হয়েছে শ্রেণিকক্ষের দেয়াল। সব বন্ধু ভীষণ খুশি। ওরা সবাই ওদের মায়ের হাত ধরে গায়ে গা লাগিয়ে বসেছে। ম্যাম সবাইকে শুভেচ্ছা জানালেন। এরপর ধীরে ধীরে ক্লাসের এক বেঞ্চ থেকে আরেক বেঞ্চে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তার দৃষ্টি থেমে যায় পেছনের বেঞ্চে বসে থাকা ঈষিতার ওপর। তিনি জিগ্যেস করলেন, ‘ঈষিতা, তোমার মা কোথায় সোনা? তুমি একা বসে আছো কেন?’
ঈষিতা মাথা নিচু করে জল ছলছল চোখে মায়ের বেগুনি শাড়িটা বের করে ম্যামের সামনে রাখে। বলে- ‘আমার মা নেই ম্যাম, আমি তাই আমার মায়ের শাড়ি নিয়ে এসেছি।’ ক্লাসের সবাই নিস্তব্ধ হয়ে ঈষিতার দিকে তাকিয়ে রইল। ম্যামের চোখও ভিজে গেল স্নেহের জলে। মা-হারা ছোট্ট ঈষিতাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিলেন তিনি। বললেন, আজ থেকে আমিই তোমার মা।
এএডি/