হালদার দুই পাড়ে রেণুর মহোৎসব

সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম ও আমির হামজা রাউজান

সারাদেশ

দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর দুই পাড়ের হ্যাচারিতে এখন রেণুর ছড়াছড়ি চলছে। চলছে সংগ্রহ করা মাছের ডিম

2026-05-09T02:24:30+00:00
2026-05-09T02:24:30+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
হালদার দুই পাড়ে রেণুর মহোৎসব
সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম ও আমির হামজা রাউজান
প্রকাশ: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ২:২৪ এএম 
হালদার দুই পাড়ে রেণুর মহোৎসব। ছবি : সময়ের আলো
দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর দুই পাড়ের হ্যাচারিতে এখন রেণুর ছড়াছড়ি চলছে। চলছে সংগ্রহ করা মাছের ডিম থেকে উৎপাদিত রেণু বিক্রির মহোৎসব। গেল ৪ মে থেকে সংগৃহীত মাছের ডিমের রেণু বিক্রি শুরু হয়। শুক্রবার পর্যন্ত পাঁচ দিনেই বিক্রি হয়েছে কয়েক কোটি টাকার রেণু। প্রতি কেজি রেণু গড়ে দেড় লাখ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। টাকার অঙ্কে সংগৃহীত রেণুর দাম ৫৫ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকারও বেশি। হালদা পাড়ের হ্যাচারিগুলোতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মাছচাষিদের ভিড় লেগেছে। আর এ বিক্রি কার্যক্রম তদারক করতে ছুটে এসেছেন খোদ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন। গেল ৫ মে তিনি হালদা পাড়ের বিভিন্ন হ্যাচারি পরিদর্শন করেছেন। বর্তমানে প্রথম দফায় সংগৃহীত রেণুই বিক্রি হচ্ছে। সামনে ঝড় বৃষ্টির দিনে আরও কয়েক ধাপে রেণু সংগ্রহের আশা করা হচ্ছে। তবে পরবর্তী তিথিতে প্রত্যাশিত ডিম সংগ্রহ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষকরা।

দীর্ঘদিন ধরে ডিম সংগ্রহ রেণু ও বিক্রিসহ নানা বিষয় পর্যবেক্ষণ করে আসছেন হালদা রিসার্স ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ও হালদা গবেষক অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, চলতি বছর প্রত্যাশিত ডিম সংগ্রহ হয়নি। এবার প্রথম ও দ্বিতীয় জো বা তিথিতে ডিম ছাড়েনি মা মাছ। ৩০ এপ্রিল তৃতীয় জো বা তিথিতে মা মাছ হালদা নদীতে ডিম ছেড়েছে। তারপরও প্রথম দফার ডিম সংগ্রহের মাধ্যমে প্রচুর রেণু উৎপাদন হয়েছে। এবার পাঁচ শতাধিক ডিম সংগ্রহকারী ২৫০ নৌকায় ঘুরে ঘুরে ডিম সংগ্রহ করেছেন। প্রথম দফায় ৬ হাজার কেজি ডিম আহরণ করা হয়েছে। এই ডিম থেকে ১৫৫ কেজি রেণু উৎপাদন হবে। 

আবার কবে ডিম ছাড়তে পারে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আরও তিনটি জো-তিথি রয়েছে। এসব জো-তিথিতে অনুকূল পরিবেশে আবার ডিম ছাড়তে পারে মা মাছ। এসব ডিম সংগ্রহে যথেষ্ট প্রস্তুতি আছে। আশা করছি, এসব তিথিতে বেশ ভালো ডিম সংগ্রহ হবে। তবে ডিম সংগ্রহ প্রত্যাশিত পর্যায়ে নাও হতে পারে।
আরও পড়ুন

হালদার দুই পাড়ে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, গত ৪ মে থেকে হালদার দুই পাড় রাউজান ও হাটহাজারী এলাকার হ্যাচারিগুলোতে প্রাথমিক পর্যায়ের রেণু কেনাবেচা শুরু হয়। ৫ মে থেকে পুরোদমে রেণু বিক্রি হয়। প্রথম ধাপে উৎপাদিত রেণু বিক্রি করে কয়েক কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়েছে বলে জানান হ্যাচারি মালিকরা। গত ৩০ এপ্রিল হালদা নদীতে কার্প-জাতীয় মা মাছ ডিম ছাড়ে। এবার জেলেরা ছয় হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ করেছেন।

হালদা নদী থেকে সংগৃহীত এসব ডিম ফোটানোর কাজ দ্রুত শুরু করা হয়। ডিম নেওয়া হয় দুই পাড়ের হ্যাচারি ও মাটির কুয়ায়। রাউজানের মোবারকখীল হ্যাচারি ও এনজিও সংস্থা আইডিএফ হ্যাচারি, হাটহাজারী অংশের শাহ মাদারি হ্যাচারি, মদুনাঘাট হ্যাচারি ও মাছুয়াঘোনা হ্যাচারিতে উৎপাদিত রেণু বিক্রি শুরু হয়।

রাউজান উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় জানায়,  চলতি বছর প্রতি কেজি রেণু বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত। গত বছরও প্রতি কেজি রেণু বিক্রি হয়েছিল ১ লাখ থেকে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার টাকায়। তবে ক্রেতাদের ভিড় ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এতে এবার দাম আরও বাড়তে পারে। 

হাটহাজারী শাহ মাদারী হ্যাচারি বিক্রেতা মো. ইলিয়াস বলেন, আমি প্রথম দিনে আড়াই কেজি রেণু বিক্রি করেছি। প্রতি কেজি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ধরে বিক্রি করেছি। 

অন্যদিকে আইডিএফ হ্যাচারির ব্যবস্থাপক নুরুল হাকীম বলেন, আমি এক কেজি রেণু সংগ্রহ করেছি ১ লাখ ৪০ হাজার টাকায়। আমাদের কাছে অনেক ক্রেতা এসেছে। কেনাবেচা অব্যাহত আছে।

হ্যাচারিতে আসা মাছচাষিরা জানান, গত বছরের মতো এবারও রেণুর দাম বেশ চড়া। তবে জেলে ও মৎস্য কর্মকর্তারা জানান, হালদায় পুরোপুরি ডিম ছাড়ার সময় মে মাস। কিন্তু এবার এপ্রিলে আগেভাগে ব্যাপক বৃষ্টি হওয়ায় আগেই ডিম ছেড়েছে মা মাছ। যদি সামনে আবারও ডিম ছাড়ে তখন রেণুর দাম কমতে পারে। 

রাউজান উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন ফাহিম বলেন, ৪ মে থেকে রেণু বিক্রি হলেও ৫ মে থেকে পুরোদমে বিক্রি শুরু হয়। নদী থেকে সংগ্রহ করা প্রথম ধাপের ৬ হাজার কেজি ডিম থেকে প্রায় ১৫২ কেজি রেণু পাওয়া গেছে। 

হালদা গবেষক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, হালদা নদীর সংগৃহীত ডিম থেকে উৎপাদিত রেণু বিক্রি অব্যাহত আছে। সবগুলো হ্যাচারি ও মাটির কুয়া থেকে পুরোদমে বিক্রি চলছে। প্রথম দিনে দরকষাকষির মাধ্যমে ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতি কেজি রেণু বিক্রি হয়। গেল ৫ মে মাছুয়াঘোনা হ্যাচারিতে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা থেকে সর্বনিম্ন ১ এক লাখ ৫০ হাজার পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। 

তিনি বলেন, চলতি মাসে ১৪ মে থেকে ১৯ মে পর্যন্ত অমাবস্যার জো ও ২৯ মে  থেকে ৩ জুন পূর্ণিমার  জো-তিথি আছে। আশা করছি অনুকূল পরিবেশ থাকলে মা মাছ নদীতে পুরোদমে ডিম ছাড়বে।

হালদা নদীর ডিম আহরণকারীরা বলেন, চলতি মৌসুমে নদীতে ডিম ছাড়ার দুটি জো বা তিথি চলে গেছে। পূর্ণিমার তৃতীয় জো-তিথিতে ৩০ এপ্রিল সকালে মা মাছ নদীতে প্রথমে নমুনা ডিম ছাড়ে। একই দিন দুপুরে আবার ডিম ছাড়ে। একই দিন রাত ২টার দিকে ফের ডিম ছাড়ে মা মাছ। নদীর অংকুরি ঘোনা, গড়দুয়ারায় নয়াহাট, সিপাহির ঘাট, পাতাইজ্জ্যার টেক, কাগতিয়ার টেক, সোনাইর মুখ, মাছুয়াঘোনা, আজিমারঘাট, নাপিতেরঘাট, আমতুয়া কুমারখালির টেক, রামদাস মুন্সিহাট, বারিয়াঘোনা, মদুনাঘাট প্রভৃতি এলাকায় ডিম ছাড়ে। ২০৮টি নৌকায় পাঁচ শতাধিক ডিম সংগ্রহকারী নদী থেকে ডিম আহরণ করে। নদী থেকে আহরিত ডিমগুলো হালদা নদীর মদুনাঘাট হ্যাচারি, শাহ মাদারি, মাছুয়াঘোনা হ্যাচারি, অংকুরি ঘোনা হ্যাচারি এবং মোবারকখীল হ্যাচারিতে রেণু ফোটানো শুরু হয়। এবার প্রতি কেজি রেণু ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দরে বিক্রি করা হয়। 

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন মৎস্য প্রজননকেন্দ্র হালদা নদীর রেণু উৎপাদন ও হ্যাচিং কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি ডিম সংগ্রহকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগমসহ  হালদার ডিম সংগ্রহকারী ও রেণু উৎপাদনকারীরা।

তিন কারণে কমেছে ডিম সংগ্রহ : চলতি বছর প্রথম দফায় প্রত্যাশিত হারে ডিম সংগ্রহ করতে পারেনি জেলেরা। ডিম সংগ্রহ কমে যাওয়া নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন গবেষক, জেলে ও হ্যাচারি মালিকরা। 

হালদা গবেষক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, গত বছর প্রথম দফায় ১৪ হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল। এবার ডিম সংগ্রহ হয়েছে ছয় হাজার কেজি। যা গত বছরের চেয়ে অর্ধেকেরও কম। নদীতে দূষণসহ নানা কারণে ডিম ছাড়ার পরিমাণ ছিল কম। আবার প্রস্তুতির অভাবে সংগ্রহকারী নৌকাও নদীতে ছিল কম। নৌকা প্রস্তুত ছিল না। আবার জেলেরাও প্রস্তুত ছিল না। গত বছর প্রথম দফায় ডিম সংগ্রহ করতে ৪৫০টি নৌকায় জেলেরা কাজ করেছে। এবার সেই সংখ্যা নেমে আসে ২৫০টিতে। তাই এবার ডিম সংগ্রহ কম হয়েছে।

আরও কয়েকটি তিথি বা জো আছে। ওই সময় কত ডিম সংগ্রহ হতে পারে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, পরবর্তী তিথিতে ডিম সংগ্রহ প্রত্যাশা অনুযায়ী হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। 

এএডি/


  বিষয়:   হালদা  রেণু  মহোৎসব  চট্টগ্রাম  রাউজান 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: