কারিগরি শিক্ষা ও কর্মসংস্থান

মোছা. নুরজাহান খাতুন

মতামত

বাংলাদেশে বর্তমানে বহু সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো কর্মসংস্থানের অভাব। কর্মসংস্থান হতে হলে জনগণকে কর্মক্ষম হতে হবে আগে। কর্মক্ষম এবং দক্ষ

2026-05-10T06:37:49+00:00
2026-05-10T06:37:49+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
কারিগরি শিক্ষা ও কর্মসংস্থান
মোছা. নুরজাহান খাতুন
প্রকাশ: রোববার, ১০ মে, ২০২৬, ৬:৩৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বাংলাদেশে বর্তমানে বহু সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো কর্মসংস্থানের অভাব। কর্মসংস্থান হতে হলে জনগণকে কর্মক্ষম হতে হবে আগে। কর্মক্ষম এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই। বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার প্রয়োজন। এর মাধ্যমে প্রয়োজন মানবসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অন্যান্য সম্পদের দক্ষতা বাড়িয়ে দারিদ্র্য বিমোচন, ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা। 

এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে কারিগরি শিক্ষার হার বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশে ২০৩০ ও ২০৪০ সালের মধ্যে এ হার যথাক্রমে ৩০ ও ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য দেশে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন ও তার আলোকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনসহ নতুন নতুন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হচ্ছে। তার পরও বলতে হচ্ছে, দেশে কারিগরি শিক্ষার হার কাক্সিক্ষত হারে বাড়েনি।

কারিগরি শিক্ষার্থীর বর্তমান হার ১৪ শতাংশ বলা হলেও আন্তর্জাতিক কারিগরি শিক্ষার সংজ্ঞা অনুযায়ী বাস্তবে এটা ৮.৪৪ শতাংশ। এ শিক্ষাব্যবস্থায় রয়েছে নানাবিধ সংকট। ল্যাবরেটরি ও শিক্ষক সংকট মারাত্মক। এক শিক্ষককে দিয়ে চালানো হচ্ছে দুই শিফট। 

এ নিয়ে শিক্ষকের মধ্যে ক্ষোভ বিদ্যমান। ফলে মানসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ অসম্ভব। এই শিক্ষাব্যবস্থায় মেয়েরা আরও বেশি পিছিয়ে। কারণ এই শিক্ষার সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানুষের এই শিক্ষার প্রতি অনুমান ভালো নয়।
বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষায় শ্রমবাজারের সঙ্গে অনেক কোর্স-কারিকুলামের কোনো সংগতি নেই। 

সিলেবাস এখনও যুগোপযোগী নয়, কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে কোনো সমন্বয় নেই। শিল্প-কারখানার সঙ্গে একাডেমির সমন্বয় নেই বললেই চলে। কারিগরি শিক্ষালাভ করেও যথাযথ দক্ষ হয়ে না উঠায় শিল্প-কারখানাগুলোতে তাদের চাহিদা কম। এসব কারণে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি করতে উৎসাহিত হচ্ছেন না এবং কারিগরি শিক্ষা এগোচ্ছে না।

সিঙ্গাপুর ১৯৬৫ সালে স্বাধীনতা লাভ করে আর বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে। সিঙ্গাপুর থেকে মাত্র ৭ বছরের বয়সে ছোট বাংলাদেশ। বর্তমানে সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় ৬৭,৮১০ মার্কিন ডলার আর বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ২৭৬৯ মার্কিন ডলার। সহজেই অনুমেয় সিঙ্গাপুরের আয় বাংলাদেশের আয় থেকে ২৫ গুণ বেশি। গুরুত্বপূর্ণভাবে উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুরেও কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, আমাদেরও প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব রয়েছে।

বলাই বাহুল্য, বিশ্বের অনেক দেশে এই কারিগরি শিক্ষার ওপর জোড় দিয়েই তারা তাদের বেশিরভাগ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। আমাদের আশপাশের দেশের মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাম এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সিঙ্গাপুরের কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম সেরা এবং আধুনিক। তাদের এই সাফল্যের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কৌশল ও ব্যবস্থা ছিল, যা মূলত শিল্প খাতের চাহিদা এবং বাস্তব জ্ঞান অর্জনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়েছে।

 সিঙ্গাপুরে উন্নয়নের মূল কারণ কী কী? 

১. সিঙ্গাপুরের অভাবনীয় উন্নতির মূল কারণ হলো- সুদূরপ্রসারী নেতৃত্ব, ২. দুর্নীতির কঠোর দমন, দক্ষ আমলাতন্ত্র, মেধার মূল্যায়ন এবং বিশ্বমানের শিক্ষা ও পরিকাঠামো, ৩. শিক্ষায় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ, কারিগরি ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, ৪. ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, কম করহার ও সহজ বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সিঙ্গাপুরে বিপুল বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট 

করেছে, ৫. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলার কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে, ৬. সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং তা বাস্তবায়নের দৃঢ়তাই সিঙ্গাপুরকে আজকের সিঙ্গাপুর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, ৭. প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকা সত্ত্বেও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে সিঙ্গাপুর মাত্র কয়েক দশকে একটি মৎস্যজীবী গ্রাম থেকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
 
কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে সিঙ্গাপুরের গৃহীত ব্যবস্থাগুলো হলো- ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল এডুকেশন ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত। এটা হলো সিঙ্গাপুরের বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। এটি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান করে। ২. ডুয়েল ট্রেনিং সিস্টেম বা ‘লার্ন অ্যান্ড আর্ন’ প্রোগ্রাম : সিঙ্গাপুরে তাত্ত্বিক শিক্ষার চেয়ে বাস্তব প্রয়োগের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। আইটিই শিক্ষার্থীরা কাজের সঙ্গে শিক্ষাগ্রহণ করে, যা তাদের কর্মসংস্থানের জন্য সরাসরি প্রস্তুত করে।

শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা
কারিকুলামগুলো শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সরাসরি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় যুক্ত থাকে।

পলিটেকনিক শিক্ষা
আইটিইর পর শিক্ষার্থীরা ৫টি পলিটেকনিকে যোগ দিতে পারে, যেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজনেস, ডিজিটাল মিডিয়া এবং হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের মতো বিষয়ে ডিপ্লোমা দেওয়া হয়।

স্কিলসফিউচার উদ্যোগ
এই উদ্যোগের মাধ্যমে ‘স্কিলু ফিউচার কাউন্সিল’, যা শিল্প, শ্রম ও সরকারি নেতাদের নিয়ে গঠিত, তারা বিভিন্ন সেক্টরের জন্য দক্ষতার ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করে।

শিক্ষকদের উচ্চমান ও প্রশিক্ষণ
কারিগরি শিক্ষকরা বছরে ১০০ দিনের পেশাগত প্রশিক্ষণ পান। নতুন শিক্ষকদের জন্য ৪০ সপ্তাহের কারিগরি শিক্ষার ৪০ সপ্তাহের কোর্স করা বাধ্যতামূলক।

আধুনিক অবকাঠামো
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ল্যাব ও ওয়ার্কশপ রয়েছে। সিঙ্গাপুর ‘স্কিল-টু-ওয়েজ’ ইন্টিগ্রেশন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে তাদের কারিগরি শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছে।

সিঙ্গাপুরে কারিগরি শিক্ষার হার ৫৬ শতাংশ। সিঙ্গাপুর ছাড়া অন্য অনেক উন্নত দেশেও এই কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেশ এগিয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ জার্মানিতে এ হার ৭৫ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ৬০ শতাংশ, চীনে ৫৫ শতাংশ আর বাংলাদেশে ৯ শতাংশ। খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে, কারিগরি শিক্ষা ছাড়া আমাদের মতো দেশের কর্মসংস্থান/উন্নয়ন অসম্ভব। হ্যাঁ বর্তমান সরকার এ বিষয়ে জোর দিচ্ছে।

তবে এ শিক্ষাকে সাকসেস করতে যে কাজগুলো বাংলাদেশকে করতেই হবে সেগুলো হলো- ১. কারিগরি শিক্ষার প্রতি মানুষের অনুমান চেঞ্জ করতে হবে; ২. রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে জনগণকে বোঝাতে হবে যে শুধু এমএ/এমএসসি করে জ্ঞানী হওয়া যায় না এবং কর্মদক্ষতা অর্জন করা যায় না; 

৩. এ বিষয়ে বদ্ধমূল (কারিগরিতে পড়লে সাধারণ পড়ার থেকে সম্মান কমে যায়) থাকায় নারীরা আরও কম আসে এ শিক্ষায়। তাই বদ্ধমূল ধারণা চেঞ্জ করার জন্য প্রচার-প্রচারণা করতে হবে; ৪. এই পড়া শুধু মুখস্থ নয়, এটার সঙ্গে প্রাকটিক্যাল কাজ রয়েছে। তাই উন্নত আধুনিক প্রযুক্তি দিয়েই স্টুডেন্ট তৈরি করতে হবে; ৫. কারিগরি শিক্ষার জন্য সামাজিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে হবে ; ৬. রাষ্ট্রের প্রস্তুতি দরকার সার্বিকভাবে, সত্যিই এখানে আর কোনো কম্প্রোমাইজ করা যাবে না।

সাবেক অতিরিক্ত সচিব

সময়ের আলো/আআ


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: