হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত ক্রুজ শিপ এমভি হন্ডিয়াস অবশেষে প্রায় এক মাস সমুদ্রযাত্রার পর স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের টেনেরিফে পৌঁছেছে। এরইমধ্যে জাহাজটিতে একাধিক যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। আর এরপরই নতুন এ ভাইরাসের নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।
জাহাজটি ভোরের আগে টেনেরিফের দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পবন্দর গ্রানাডিলার কাছে পৌঁছালেও সরাসরি বন্দরে ভিড়তে দেওয়া হয়নি। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধে জাহাজের চারপাশে এক নটিক্যাল মাইল ব্যাসার্ধের নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে এবং কোনো ধরনের অননুমোদিত প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
স্পেন সরকার জানিয়েছে, এই উদ্ধার অভিযানটি অত্যন্ত জটিল এবং নজিরবিহীন, কারণ এতে ২৩টি দেশের নাগরিক জড়িত। জাহাজে থাকা ১০০-এরও বেশি যাত্রী ও ক্রুকে ধাপে ধাপে নামিয়ে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তার মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য সমন্বিত আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
স্পেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোনিকা গার্সিয়া জানিয়েছেন, সাধারণ জনগণের জন্য সংক্রমণের ঝুঁকি “খুবই কম”, কারণ হান্টাভাইরাসে সাধারণত মানুষ থেকে মানুষে সহজে ছড়ায় না। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, অযথা আতঙ্ক ও গুজব পরিস্থিতি জটিল করতে পারে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
টেনেরিফে ইতোমধ্যে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্পেনের সামরিক পুলিশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইউনিট এবং মেডিকেল টিম বন্দরের আশপাশে বড় বড় অস্থায়ী চিকিৎসা শিবির স্থাপন করেছে। যাত্রীদের প্রথমে মেডিকেল টিম জাহাজে উঠে পরীক্ষা করবে, তারপর তাদের শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে আলাদা গ্রুপে ভাগ করা হবে।
এরপর প্রতিটি দেশের নাগরিকদের আলাদা আলাদা করে ছোট নৌকায় তীরে আনা হবে। সেখান থেকে তাদের জন্য প্রস্তুত রাখা চার্টার্ড বিমানে করে নিজ নিজ দেশে পাঠানো হবে। কিছু যাত্রীকে বিশেষ মেডিকেল বিমানে সরাসরি আইসোলেশন ইউনিটে নেওয়া হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রধান টেড্রোস আধানম ঘেব্রেয়েসাস পুরো অভিযান পর্যবেক্ষণ করছেন এবং স্পেনের দ্রুত ও সমন্বিত প্রতিক্রিয়াকে “কার্যকর ও দায়িত্বশীল” বলে প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, অভিজ্ঞতা বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির পর এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, টেনেরিফের ক্যান্দেলারিয়া হাসপাতালে সংক্রামক রোগ মোকাবেলার জন্য আলাদা আইসিইউ ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেখানে ভেন্টিলেটর, পরীক্ষার কিট এবং পূর্ণ সুরক্ষা সরঞ্জামসহ বিশেষ প্রশিক্ষিত মেডিকেল দল প্রস্তুত রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিছু মানুষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয় বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, আবার অনেকে বলছেন সরকার যদি ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে বড় কোনো ঝুঁকি নেই। বন্দরের কিছু শ্রমিকও শুরুতে আপত্তি জানিয়েছিলেন, কারণ তারা আশঙ্কা করেছিলেন সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের স্থানীয় প্রশাসন প্রথমে জাহাজটিকে বন্দরে ঢুকতে না দিতে চাইলে রাজনৈতিক পর্যায়েও বিতর্ক তৈরি হয়। পরে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার হস্তক্ষেপ করে এবং সমন্বিত উদ্ধার পরিকল্পনা অনুমোদন করে।
জাহাজে থাকা প্রায় ৩০ জন ক্রু সদস্য পরে জাহাজটি নিয়ে নেদারল্যান্ডসে ফিরে যাবে। তবে বাকি যাত্রীদের জন্য এখন শুরু হয়েছে দীর্ঘ ও কঠোর কোয়ারেন্টাইনের প্রক্রিয়া, যা ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড অনুযায়ী কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে।
একটি সাধারণ ক্রুজ ভ্রমণ ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে একটি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংকটে, যেখানে এখন মূল লক্ষ্য হলো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করে নিরাপদে সবাইকে নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়া।
/ইউএমএইচ