‘মা’ শব্দটি শুধু একটি ডাক নয়—এটি একটি অনুভব, আত্মিক বন্ধন এবং এক বিশাল আত্মত্যাগের প্রতীক। মা শুধুমাত্র একটি সন্তানের জন্মদাত্রী নন, তিনি একজন পথপ্রদর্শক, আশ্রয়দাতা এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার উৎস। সন্তানের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মায়ের যে আত্মত্যাগ জড়িয়ে থাকে, তা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন।
গর্ভকালীন ৯ মাসের কষ্ট, প্রসবের যন্ত্রণা, রাতের পর রাত জেগে শিশুর কান্না থামানো—এই প্রতিটি মুহূর্তে মা নিজেকে ভুলে কেবল সন্তানকে মনে রাখেন। তার শরীর ক্লান্ত হয়, মন ভার হয়, তবু তিনি থামেন না। পৃথিবীতে মায়া-মমতা-ভালোবাসা এবং বিসর্জনের মতো বোধগুলোর যদি কোনো পার্থিব রূপ থাকত, তাহলে সে হয়তো একজন মায়ের মতোই দেখতে হতো। পৃথিবীতে মা হচ্ছে এমন একমাত্র সম্পর্ক, যার সৃষ্টি স্বয়ং আত্মত্যাগকেই সংজ্ঞায়িত করেছে এর স্বমহিমায়।
আজ বিশ্ব মা দিবস। বিশ্বজুড়ে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার দিবসটি পালিত হয়। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশের বিশেষ উপলক্ষ হিসেবে পালিত হয়। একটু পেছনের দিকে তাকালেই খুঁজে পাওয়া যায় মা দিবসের ইতিহাস। ১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আনা জার্ভিস প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালনের সূচনা করেন তাঁর প্রয়াত মায়ের স্মরণে।
১৯১৪ সালে আনার অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আজ বিশ্বের প্রায় ৮০টিরও বেশি দেশে এই দিনটি পালিত হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, এই দিনটি ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকতার রূপ নিচ্ছে। ফুল, উপহার, কার্ড- এসব কিনেই দায় সারছেন অনেকে। অথচ মা চান সন্তানের সাথে সুমধুর সম্পর্ক, কিছু ভালো মুহূর্ত, একটু কোমল কথোপকথন, হাতের মুঠোয় সন্তানের হাত।
আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, সন্তান বড় হওয়ার পর মায়ের সাথে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়। কর্মব্যস্ত জীবনে, শহরের কোলাহলে মায়ের ফোন ধরার সময় থাকে না। অথচ সেই মা দিনের শেষে একাকী ঘরে বসে সন্তানের কথাই ভাবেন। তিনি অভিযোগ করেন না, শুধু দোয়া করেন। "মা কখনো বলেন না 'আমি এতটুকু করেছি'—কারণ তিনি জানেন, সন্তানের জন্য সবটুকু দেওয়াটাই তার আনন্দ।
আজকের আধুনিক সমাজে দেখা যাচ্ছে, মা দিবস এলেই সোশ্যাল মিডিয়া সয়লাব হয়ে যায় মায়ের ছবি আর আবেগমাখা পোস্টে। রেস্তোরাঁগুলোতে ভিড় জমে, ফুলের দোকানে লম্বা লাইন পড়ে, দামি উপহারের বিক্রি বাড়ে। কিন্তু পরদিন থেকেই সেই উচ্ছ্বাস মিলিয়ে যায়। মা আবার একা হয়ে পড়েন তাঁর চার দেয়ালের ভেতর। এই যে একদিনের আড়ম্বর আর বছরের নীরব অবহেলা-এই বৈপরীত্যই আজকের সমাজের সবচেয়ে বড় নৈতিক সংকট।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি আসলেই মাকে ভালোবাসি, নাকি ভালোবাসার একটি সামাজিক অভিনয় করি? যে সন্তান মা দিবসে শত টাকার কেক কেনেন, তিনি কি মায়ের অসুস্থতার দিনে হাসপাতালে সময় দেন? যে তরুণী মায়ের সাথে ছবি তুলে ক্যাপশন দেন "Best Mom Ever", সে কি তার মাকে একটি ফোন করেন? এই প্রশ্নগুলোর সৎ উত্তর আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে এবং সেই অস্বস্তিই আমাদের জাগ্রত করার জন্য যথেষ্ট।
বাংলাদেশে গত এক দশকে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বহুগুণে বেড়েছে। একসময় যে দেশে বৃদ্ধ মা-বাবাকে সন্তানের কাছে রাখাটাই ছিল সংস্কৃতির অংশ, সেখানে আজ বৃদ্ধাশ্রমগুলো পরিপূর্ণ। পরিসংখ্যান বলছে, বৃদ্ধাশ্রমে আসা মায়েরা সন্তানের সিদ্ধান্তে আসেন ৭০%, গত দশ বছরে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে তিনগুণ, বয়স্ক মায়েরা মানসিক একাকিত্বে ভোগেন ৬৫%। এই প্রবণতা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। যে মা নিজের যৌবন উজাড় করে সন্তান মানুষ করেছেন, সেই মা কি বৃদ্ধ বয়সে অপরিচিত মানুষের মাঝে দিন গোনার যোগ্য?
অনেক সন্তান যুক্তি দেয়, তারা চাকরি, ব্যস্ততা, ছোট ফ্ল্যাটে মাকে রাখার মতো যথেষ্ট জায়গা নেই। কিন্তু এই যুক্তিগুলো আসলে অজুহাত মাত্র। যে সন্তান বিদেশ ভ্রমণে হাজার টাকা খরচ করতে পারেন, তিনি কি সত্যিই মায়ের জন্য একটু সময় বের করতে পারেন না? যে দম্পতি রেস্তোরাঁয় প্রতি সপ্তাহে যান, স্ত্রী-নিজ সন্তানকে নিয়ে শপিং করেন, তারা কি মাকে একটু গল্পের সঙ্গী করতে পারেন না? বাস্তব কথা হলো- ‘ইচ্ছাশক্তি থাকলে পথ বের হয়, না থাকলে অজুহাত বের হয়।’
আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের পরস্পরের কাছাকাছি এনেছে, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মায়ের কাছ থেকে দূরে সরিয়েছে। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো, সন্তান মায়ের পাশে বসে দশ মিনিট কথা বলেন না। সোশ্যাল মিডিয়ায় শত শত বন্ধুর সাথে যোগাযোগ রাখা তরুণ-তরুণী পাশের ঘরে থাকা, মায়ের কাছে যাওয়ার সময়টুকু পর্যন্ত নেই। এটি কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, এটি একটি সভ্যতার সংকট।
শহরমুখী অভিবাসন এই সমস্যাকে আরও গভীর করেছে। গ্রামে থাকা বৃদ্ধা মায়েরা মাসের পর মাস একা থাকেন, অসুস্থ হন, কিন্তু সন্তানকে বিরক্ত না করার ভয়ে জানাতেও পারেন না। তারা ভাবেন, ছেলে বা মেয়ে ব্যস্ত, তাদের বিরক্ত করা ঠিক হবে না। এই নিঃশব্দ কষ্ট বহন করতে করতে একদিন তারা চলে যান এবং তখন সন্তান অনুশোচনায় ভোগেন; কিন্তু সেই অনুশোচনার আর কোনো মূল্য থাকে না।
শুধু বৃদ্ধা মায়েরা নন, আধুনিক সমাজে কর্মজীবী মায়েরাও গভীরভাবে অবহেলিত। তিনি অফিসে পুরুষ সহকর্মীর মতো একই পরিশ্রম করেন, কিন্তু বেতন পান কম। বাড়িতে ফিরে সংসারের সমস্ত দায়িত্ব তার কাঁধেই পড়ে, কারণ সমাজের প্রচলিত ধারণায় রান্নাঘর মায়ের দায়িত্ব, সন্তান লালন-পালন মায়ের কাজ। এই দ্বিগুণ বোঝা বহন করতে করতে কর্মজীবী মায়েরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, কিন্তু সমাজ তাঁর এই কষ্টকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। কর্মক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়েও বৈষম্য রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে সন্তান জন্মের পর মায়েরা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হন, কখনো চাকরিই হারান। এই অন্যায় কাঠামোর বিরুদ্ধে সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরও সোচ্চার হতে হবে।
এই অবহেলার চিত্র বদলাতে হলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র তিন স্তরেই পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। সমাজকে বৃদ্ধাশ্রম-সংস্কৃতির পরিবর্তে যৌথ পরিবারের মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার করতে হবে। রাষ্ট্রকে বয়স্ক মায়েদের সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মাতৃস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হবে।
মায়েদের প্রতি প্রকৃত সম্মান দেখাতে হলে শুধু আবেগঘন স্ট্যাটাস বা ফুল উপহার দিলেই হবে না। প্রয়োজন তাদের অধিকার নিশ্চিত করা। পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মায়ের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। গৃহস্থালির কাজের মূল্য স্বীকার করতে হবে। কর্মজীবী মায়েদের জন্য নিরাপদ ও সহানুভূতিশীল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
সমাজের প্রতি আহ্বান, বৃদ্ধাশ্রম-সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক মনে করা বন্ধ করুন। পাড়ার একাকী বৃদ্ধা মায়ের খোঁজ নিন, তাকে একটু সঙ্গ দিন। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণকে সামাজিক মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করুন, কেবল মা দিবসে নয় বরং প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত মায়ের জন্য হোক। ফুল শুকিয়ে যাবে, শুভেচ্ছাবার্তা হারিয়ে যাবে সময়ের স্রোতে। কিন্তু একজন মায়ের প্রতি ন্যায্য আচরণ, সম্মান এবং ভালোবাসা থেকে যায় আজীবন। তাই আসুন, মা দিবসে শুধু ফুল কিংবা শুভেচ্ছা বার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটা সন্তান তার মায়ের প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করি।
লেখক : শিক্ষক ও মোটিভেশনাল বক্তা
সময়ের আলো/আআ