ঢাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার বিস্তার- এসব আর কেবল প্রাকৃতিক সমস্যা নয়; বরং প্রকৌশল পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। জলবায়ু পরিবর্তন এখন ভবিষ্যতের নয়, এটি বর্তমানের প্রকৌশল চ্যালেঞ্জ। প্রশ্ন হলো- আমরা কি সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগতভাবে প্রস্তুত?
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। কিন্তু সমস্যার বড় অংশই প্রকৌশল নকশা ও নগর ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির সঙ্গে জড়িত। ঢাকার ড্রেনেজ সিস্টেম এখনো অনেকাংশে পুরোনো নকশার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে বর্তমান বৃষ্টিপাতের তীব্রতা ও নগর ঘনত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলাফল- স্বল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা এবং নগর স্থবিরতা।
এই বাস্তবতায় জলবায়ু সহনশীল শহর গঠন করতে হলে প্রকৌশল সমাধানগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, আধুনিক হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিং ও ডেটা-ভিত্তিক ড্রেনেজ ডিজাইন প্রয়োগ করা জরুরি, যাতে অতিবৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা যায়। দ্বিতীয়ত, ‘পারমিয়েবল পেভমেন্ট’ ও ‘রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে শহরের পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যা-সহনশীল অবকাঠামো, উঁচু ভিত্তির ভবন এবং সাইক্লোন-রেজিস্ট্যান্ট ডিজাইন বাধ্যতামূলক করা উচিত।
এছাড়া, সেন্সর-ভিত্তিক স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহার করে নগরের ড্রেনেজ, পানি প্রবাহ এবং অবকাঠামোর অবস্থা রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এই ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং সমাধান শুধু সমস্যা কমায় না, বরং আগাম সতর্কতা দিয়ে ক্ষতি প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
তবে বাস্তবতা হলো- আমাদের অনেক প্রকল্পেই এখনো ‘ডিজাইন ফর টুডে’ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যেখানে ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া হয় না। এটি একটি বড় প্রকৌশলগত দুর্বলতা। এখন সময় এসেছে ‘ডিজাইন ফর দ্য ফিউচার’ ধারণা বাস্তবায়নের, যেখানে প্রতিটি অবকাঠামো প্রকল্প জলবায়ু সহনশীলতার মানদণ্ডে যাচাই করা হবে।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রকৌশল শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে বিনিয়োগ বাড়ানো অপরিহার্য। পাশাপাশি প্রকৌশলীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আরও গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে প্রকল্পগুলো বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
অতএব, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে টেকসই নগর গঠনের চাবিকাঠি হলো উন্নত প্রকৌশল। সঠিক প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক নকশা এবং দায়িত্বশীল বাস্তবায়নই পারে বাংলাদেশের শহরগুলোকে সত্যিকারের জলবায়ু সহনশীল করে তুলতে।