বাংলাদেশের কৃষির অবিচ্ছেদ্য অংশ ধান। যেহেতু ধান আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য, তাই দেশের ৭৫-৮০ শতাংশ জমিতে ধানের চাষ হয়। আমাদের খাবারের প্লেটের সিংহভাগে থাকে ভাত। তাই খাদ্য নিরাপত্তা বলতে আমরা মূলত ধান বা চালের নিরাপত্তাকেই বুঝি। সোনালি ধান শুধু একটি ফসল নয়, এটি আমাদের স্বপ্ন, আমাদের পরিচয়, আমাদের সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। বাংলার মাঠ-ঘাট বছরের অধিকাংশ সময় সবুজ ধানের চাদরে ঢাকা থাকে। সময়ের ব্যবধানে সেই সবুজ ধানই রূপ নেয় পাকা সোনালি ফসলে- যা সম্ভাবনা, প্রাচুর্য এবং জীবনের প্রতীক। মাঠ-ঘাটে যখন পাকা ধানের ঢেউ ওঠে, তখন চারপাশের প্রকৃতি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। বিবর্ণ ভূমি ঢেকে যায় সোনালি আভায়। সেই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়- এটাই আমাদের সত্যিকারের ‘সোনার বাংলা’।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে এখন রোল মডেল। দুর্যোগসহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনীতে শীর্ষে বাংলাদেশের নাম। স্বাধীনতার পর ধানের উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি। পাল্টে গেছে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার চিত্র। দ্রুত নগরায়ণ, মানুষের মাথাপছিু আয় বৃদ্ধি এবং রুচি ও অভ্যাস পরর্বিতনরে সঙ্গে দেশীয় ধানের অনেক জাত মাঠ থেকে হারিয়ে গেলেও ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক হয়ে নিজস্বগুণে টিকে আছে কিছু দেশীয়, যেগুলো ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা অঞ্চলের পরিবেশ, আবহাওয়া ও সংস্কৃতি যদি কোনো একটি পণ্য উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকা রাখে, তা হলে সেটিকে ওই দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কোনো পণ্য জিআই স্বীকৃতি পেলে তা বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডিং করা সহজ হয়। এই পণ্যের আলাদা কদর বাড়ে।
আরও পড়ুন
ওই অঞ্চল বাণিজ্যিকভাবে পণ্যটি উৎপাদন করার অধিকার এবং আইনি সুরক্ষাও পায়। আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ববিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্রপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) নিয়ম মেনে বাংলাদেশের শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে পেটেন্টস, ডিজাইন এবং ট্রেডমার্ক বিভাগ (ডিপিডিটি) এই স্বীকৃতি ও সনদ দিয়ে থাকে। যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অথবা সংস্থা জিআইয়ের জন্য আবেদন করে সেটার মেধাস্বত্ব তাদের দেওয়া হয়।
দেশে ২০১৩ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন প্রথমবারের মতো পাস হয়। ২০১৫ সালে আইনের বিধিমালা তৈরির পর জিআই পণ্যের নিবন্ধন নিতে আহ্বান জানায় ডিপিডিটি। সেই মোতাবেক প্রথমবারের মতো জিআই পণ্য হিসেবে ২০১৬ সালে স্বীকৃতি পেয়েছিল জামদানি। এরপর ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ৫৫টি পণ্যকে জিআই পণ্য স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফলে এই পণ্যগুলো বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পাবে। নিবন্ধিত জিআই পণ্যগুলোর মধ্যে চারটি ধান বা চালের নাম রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- কালিজিরা, কাটারিভোগ, রাতাবোরো এবং তুলসীমালা চাল।
কালিজিরা নাম থেকেই বোঝা যায় এটি দেখতে কালো বর্ণের। দানার আকৃতি ছোট হওয়ায় একে দেখতে অনেকটা কালিজিরা নামক মসলার মতো দেখায়। তাই কালিজিরা নামীয় মসলার সঙ্গে বাহ্যিক সাদৃশ্য থাকার কারণেই এই ধানের নাম কালিজিরা।
কালিজিরা ধানের আদি উৎপত্তিস্থল ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে অবস্থিত ময়মনসিংহ অঞ্চল। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত উইলিয়াম উইলসন হান্টার সম্পাদিত A Statistical Account of Bengal নামক গেজেটে ময়মনসিংহ অঞ্চলে কালিজিরা ধানের চাষাবাদ সম্পর্কে প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ছাড়া বিশিষ্ট ধান বিজ্ঞানী ড. তুলসী দাসের Aromatic Rices বইটিতেও ময়মনসিংহ অঞ্চলে কালিজিরা ধানের চাষাবাদের উৎস সম্পর্কে প্রমাণ পাওয়া যায়। ময়মনসিংহ অঞ্চলের আবহাওয়া এবং কৃষি পরিবেশগত অবস্থা সুগন্ধি জাতের ধান চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী বিধায় যুগ যুগ ধরে ওই অঞ্চলের কৃষকের জমিতে কালিজিরা জাতের ধান চাষ হয়ে আসছে। কালিজিরা ধানের আদি উৎপত্তিস্থল ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত ময়মনসিংহ অঞ্চল হলেও কালের বিবর্তনে এই ধানের অতুলনীয় স্বাদ, গন্ধ এবং গুণাগুণের জন্য পরবর্তীতে এই ধান সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কালিজিরা ধানটি রোপা আমন মৌসুমে চাষাবাদ করা হয়। এই চালের মোহনীয় সুগন্ধ এবং অপূর্ব স্বাদের জন্য এটা বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে পোলাও, পায়েস কিংবা ফিরনি ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহার হয়ে থাকে।
জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত সুগন্ধি ধানের মধ্যে কাটারিভোগ আরেকটি অন্যতম জনপ্রয়ি চাল। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) জিনব্যাংকের তথ্যানুযায়ী ১৯৯৭ সালের অক্টোবর মাসে দিনাজপুর থেকে কাটারিভোগ ধান ব্রি জিনব্যাংকে সংগ্রহ করা হয়। অর্থাৎ চালটির মূল উৎপত্তিস্থল দিনাজপুর।
নদীর অববাহিকায় অবস্থিত দিনাজপুরের মোট জমির শতকরা ৮২ ভাগে ধান চাষ করা হয়। দিনাজপুরে উৎপাদিত আমন ধানের মধ্যে কাটারিভোগ অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা দিনাজপুর পরিবেশগত কারণে এই জাত চাষাবাদের জন্য উপযোগী। সরু ও সুগন্ধিযুক্ত কাটারিভোগ ধান বেশি পরিমাণে ও বাণিজ্যিকভাবে দিনাজপুর জেলার চিরির বন্দর উপজেলায়ই চাষাবাদ করা হয়ে থাকে।
দিনাজপুর জেলার চিরির বন্দর এলাকায় কৃষক মো. মোকলেছুর রহমান বলেন- প্রাচীনকাল থেকেই এই কাটারিভোগ ধানের জাতটি দিনাজপুরের চাষ হয়ে আসছে। কৃষক তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন- নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ করলে কাটারিভোগ ধানের ঘ্রাণ কিছুটা কমে যায়। শুধু সবুজ গোবর সার দিয়ে এ ধান চাষ করলে তা গুণেমানে উৎকৃষ্ট হয়ে থাকে। এই কাটারিভোগ ধানের জাতটি দিনাজপুর ব্যতীত অন্য এলাকায় চাষ করলেও সুগন্ধ কমে যায়। কাটারিভোগ ধানের গড় জীবনকাল ১৩২ দিন। গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৩.২ টন অথবা একরপ্রতি ৩২ মণ । এ কাটারিভোগ ধানের জাতটির মরফোলজিক্যাল ও মলিকুলার বৈশিষ্ট্যায়ন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে সম্পন্ন হয়েছে।
শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী চাল তুলসীমালাও জিআই পণ্য। যা ২০২৪ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর অনন্য স্বাদ ও সুগন্ধের কারণে একে শেরপুরের ‘সাদা সোনা’ বা ‘জামাই আদুরি চাল’ও বলা হয়। তুলসীমালা আলোক সংবেদনশীল আমন ধান। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এই ধান লাগানো হয়। অক্টোবর মাসের শেষ থেকে নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি ফুল আসে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত ধান কাটা হয়। তুলসীমালা ধান গাছের উচ্চতা ১১০-১৮৫ সেমি, গোছাপ্রতি গড় কুশির সংখ্যা ৮-১০টি। শিষের গড় দৈর্ঘ্য ২২-২৪ সেমি। শিষে দানার গড় সংখ্যা : ১৪০-১৮০টি। এটি খরাসহিষ্ণু।
সর্বশেষ গত বছর কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী রাতাবোরো চাল জিআই সনদ পায়। এটি একটি সুগন্ধি চাল, যা রান্নার পর ঘরে ঘ্রাণ ছড়িয়ে দেয়। এটি হাওড় অঞ্চলের উচ্চ পুষ্টিগুণসম্পন্ন স্থানীয় ধান থেকে তৈরি চাল। এই চালের ভাত সরু, ছোট, ঝরঝরে ও অত্যন্ত সুস্বাদু। এতে দ্বিগুণ খাদ্য-আঁশ ও ২০-২৫ শতাংশ অ্যামাইলেজ থাকায় তা সহজে হজমযোগ্য, যার ভাত ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষ উপকারী। সরকারি নজরদারির অভাবে বিলুপ্তির হুমকিতে থাকলেও বর্তমানে জিআই স্বীকৃতির কারণে এর কদর বেড়েছে। রাতাবোরো চালের গুণাগুণ হচ্ছে- চালটি দেখতে ডিম্বাকৃতির ও মোটা। রান্না করার পর ভাত হয় কিছুটা লম্বা আকৃতির। ভাত খেতে মিঠা স্বাদের। সাধারণ ভাত খাওয়ার পাশাপাশি খিচুড়ি ও পায়েসের জন্য এটি জনপ্রিয়।
রাতাবোরো চালে ভিটামিন বি-১, বি-৩, বি-৬ এবং ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস, ফাইটিক অ্যাসিড, ফাইবার, অ্যাসেনশিয়াল পলিফেনলস, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম, সেলেনিয়াম, কপার প্রভৃতি খনিজ পদার্থ অপেক্ষাকৃত বেশি মাত্রায় থাকে। অল্পমাত্রায় জিঙ্কও বিদ্যমান। রাতাবোরো চাল নিম্ন গ্লাইসেমিক ইনডেক্স জিআই ফুড।
রাতাবোরো চালের উচ্চ আঁশযুক্ত উপাদান পিত্তথলির পাথর হওয়ার ঝুঁকিও কমায়, হজমে সহায়তা করে, গ্যাস শোষণ প্রতিরোধ করে, দীর্ঘক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখে এবং অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ থেকে বিরত রাখে। ফলে এটি নিয়মিত খেলে হজম প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হয়। এ চালে আরও আছে সেলেনিয়াম নামের একটি উপাদান যা হার্টের জন্য উপকারী, হাইপারটেনশন ও অন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। রাতাবোরো নিয়মিত আহারে হাড়কে শক্ত এবং স্বাস্থ্যকর রাখে ও দেহের চর্বি সংশ্লেষণ এবং স্থূলতা নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক।
কালিজিরা, কাটারিভোগ, তুলসীমালা ও রাতাবোরো ধানসহ আমাদের এতিহ্যবাহী জাতগুলোর ফলন কম কিন্তু এগুলোর খ্যাতি বিশ্বজোড়া। আধুনিক উচ্চ ফলনশীল সুগন্ধি ধানের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে এগুলোর আবাদ এলাকা সংকুচিত হয়েছে। সঠিক বিপণন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে জিআই চালের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস দেশ-বিদেশে জড়িয়ে দিতে হবে। তা হলেই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের চাল রফতানি করে আরও অধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।
যোগাযোগ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), গাজীপুর
এএডি/