কাঁটাতার থেকে কুমির : সীমান্তের নতুন বাস্তবতা

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

মতামত

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি। ফুলবাড়ী সীমান্তে ১৫ বছরের কিশোরী ফেলানী খাতুন কাঁটাতারে আটকে যায়। বিএসএফের গুলি তার শরীর ভেদ করে

2026-05-13T03:16:03+00:00
2026-05-13T03:16:03+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
কাঁটাতার থেকে কুমির : সীমান্তের নতুন বাস্তবতা
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
প্রকাশ: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ৩:১৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি। ফুলবাড়ী সীমান্তে ১৫ বছরের কিশোরী ফেলানী খাতুন কাঁটাতারে আটকে যায়। বিএসএফের গুলি তার শরীর ভেদ করে যায়। সেই শরীর সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে তারের বেড়ায় ঝুলে থাকে। ছবিটি সারা পৃথিবী দেখেছে। বিচার আজও হয়নি। ১৫ বছর পরও ক্ষতিপূরণ মেলেনি।

এ ঘটনার ১৫ বছর পর, ২০২৬ সালে এসে সেই একই সীমান্তের নদীপথে এবার বিষধর সাপ আর কুমির ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে। গত মার্চে বিএসএফের সদর দফতর থেকে মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোতে একটি নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। যেসব নদীপথে বেড়া দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে সরীসৃপ মোতায়েনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বলা হয়েছে। 

বিএসএফের উপ-মহাপরিদর্শক নিজে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। এটি কোনো মাঠ কর্মকর্তার একক সিদ্ধান্ত নয়, এটি সরকারি নথিতে লেখা পরিকল্পনা।

এই পরিকল্পনা কি আসলে কাজ করবে? পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, না। কুমির সুন্দরবন ও আসামের নির্দিষ্ট জলাভূমিতে বেঁচে থাকে। সীমান্তের নদীতে জোর করে সরিয়ে দিলে তারা নিজেরাই আগে মারা যাবে। 

বিষধর সাপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের বাইরে ছেড়ে দিলে সেটি কোথায় যাবে, তা কেউ বলতে পারে না। তা হলে কেন এই পরিকল্পনা? কারণ এটি নিরাপত্তার সমাধান নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। বাংলাদেশের মানুষকে কতটা মানবিকভাবে দেখা হচ্ছে, সেটির প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি।

ঠিক এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার এসেছে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে শপথ নেওয়ার পরদিনই মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ৪৫ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফকে জমি হস্তান্তর করা হবে। 

এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য শুধু প্রশাসনিক নয়। শপথের পরের দিনই, প্রথম বৈঠকেই এই বিষয়টি এলো, এর মানে হলো এটি ছিল অগ্রাধিকার তালিকার একেবারে ওপরে। স্বাস্থ্য নয়, শিক্ষা নয়, কর্মসংস্থান নয়, প্রথম বার্তাটি গেল সীমান্তে।

বলা হয়েছে, ‘রাজ্যের জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে গেছে।’ এই একটি বাক্যে পুরো নির্বাচনি প্রচারের সারমর্ম ধরা আছে। ‘জনতাত্ত্বিক কাঠামো’ মানে জনসংখ্যার গঠন। 

এই ভাষায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকে দোষী সাব্যস্ত করার একটি পরিচিত কৌশল আছে। কথাটি সরাসরি বলা হয় না, কিন্তু শ্রোতা বুঝে নেন। নির্বাচনের মাঠে এই বাক্যটি ভোট এনেছে, এখন প্রশাসনের টেবিলে এসে সেটি নীতিতে রূপ নিচ্ছে।

এই দুটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কুমিরের পরিকল্পনা কেন্দ্রের, বেড়া নির্মাণের তাড়া রাজ্যের। কিন্তু দুটি একই দিকে হাঁটছে। 

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের মোট ৪,০৯৭ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ২,২১৬ কিলোমিটারই পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। অর্থাৎ মোট সীমান্তের অর্ধেকেরও বেশি এই একটি রাজ্যের সঙ্গে। এই বিশাল অংশের রাজ্যে এখন কেন্দ্রের নীতির সম্পূর্ণ অনুগত একটি সরকার।

আগে অন্তত একটি টানাপোড়েন ছিল। তিস্তা চুক্তিতে বাধা দেওয়া হতো। বাংলাভাষী সংহতির কথা উঠত। দিল্লির বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে দাঁড়ানো হতো। সেই টানাপোড়েনটা কার্যকর ছিল, কারণ দিল্লি চাইলেই রাজ্যকে টপকে যেতে পারত না। 

ভূমি হস্তান্তর রাজ্যের বিষয়, বেড়ার জন্য জমি রাজ্য না দিলে কেন্দ্র এগোতে পারত না। সেই সাংবিধানিক বাধাটিই একসময় বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করেছিল, হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে নয়, কিন্তু কার্যত।

সেই বাফারটি এখন আর নেই। রাজ্য এখন কেন্দ্রের হাত ধরে হাঁটছে। এর অর্থ হলো বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের অভ্যন্তরীণ দরকষাকষির জায়গাটি সংকুচিত হয়ে গেছে। 

আগে দিল্লির কোনো সিদ্ধান্ত রাজ্যের আপত্তিতে আটকে যেত। এখন সেই সম্ভাবনা প্রায় নেই। বাংলাদেশের কূটনীতিকদের এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই সামনের দিনগুলোর পরিকল্পনা করতে হবে । 

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। যে দেশ ‘অনুপ্রবেশ’ ঠেকানোর কথা বলছে, সেই দেশ কি নিজেই মানুষ ঠেলে দিচ্ছে না? ২০২৫ সালের মে থেকে আগস্টের মধ্যে দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক এবং রোহিঙ্গা উভয়ই আছে। 

একই সপ্তাহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লিতে সম্পর্ক মেরামতের আলোচনা করছিলেন, আর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে একজন বাংলাদেশি নাগরিক প্রাণ  হারাচ্ছেন। কথার টেবিলে এক বাস্তবতা, মাঠে সম্পূর্ণ আরেক।

আমার মতে, এই দ্বৈধতাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সুযোগ। এই স্ববিরোধিতা আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরা গেলে ভারতের অবস্থান দুর্বল হয়। কারণ ‘অনুপ্রবেশ ঠেকানো’ আর ‘মানুষ ঠেলে দেওয়া’ একসঙ্গে চলতে পারে না।

তা হলে বন্যার মৌসুমে এই পরিকল্পনার পরিণতি কী হবে? বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত সীমান্তঘেঁষা জেলাগুলো প্রতি বছর পানিতে ডোবে। সেই পানিতে কুমির ভেসে এলে সেটি কোন গ্রামে ঢুকবে, কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। 

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই প্রাণীগুলো বাংলাদেশি আর ভারতীয়র মধ্যে পার্থক্য করবে না। সীমান্তের দুপারের জেলে, কৃষক, নৌকার মাঝি, যারা শতাব্দী ধরে এই নদীকে জীবিকা হিসেবে চিনেছেন, তাদের কথা একবারও ভাবা হয়নি।

আন্তর্জাতিক আইন এ ক্ষেত্রে পরিষ্কার। কোনো রাষ্ট্র প্রতিবেশীর সীমান্তে বন্যপ্রাণী দিয়ে মৃত্যুফাঁদ তৈরি করতে পারে না। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও পরিবেশ আইন উভয়েরই লঙ্ঘন। 

আধুনিক বিশ্বে শিকারি প্রাণী দিয়ে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পাহারার কোনো নজির নেই। বাংলাদেশ চাইলে এই বিষয়টি জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে তুলতে পারে। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এই পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক প্রত্যাহার দাবি করা যায়। আন্তর্জাতিক আদালতের দরজা খোলার সুযোগও আছে।

কূটনৈতিক পরিসংখ্যানের বাইরে একটা সহজ হিসাব আছে। বাংলাদেশ ও ভারত মিলে চুয়ান্নটি অভিন্ন নদী ভাগ করে নেয়। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ এ বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। তিস্তা চুক্তি এখনও অনিশ্চিত। পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার এখন সেই নদীগুলোর উজানে বসে আছে। 

নদীতে কুমির ছাড়লে শুধু মানুষ নয়, সেই পানির ওপরও দরকষাকষির জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিএসএফের হাতে ৬২৫ জনেরও বেশি বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছে। 

নিহতদের মধ্যে ২৫ জন শিশু ও কিশোর। আহত হয়েছে ৮০৮ জন। একটি ঘটনারও বিচার হয়নি। এই হিসাব শুধু তথ্য নয়, এটি একটি প্যাটার্ন। সেই প্যাটার্নই এখন নতুন রূপ নিচ্ছে।

ফেলানীর মৃত্যুর পর চুপ থাকা হয়েছিল। পুশইনেও বিশেষ প্রতিবাদ হয়নি। কিন্তু এবার যদি কুমিরের পরিকল্পনায়ও নীরব থাকা হয়, তা হলে পরের দাবিটি আর কোন জায়গা থেকে করা যাবে? এ

কটি দেশ তখনই প্রতিবেশীর কাছ থেকে সম্মান পায়, যখন নিজের মানুষের নিরাপত্তায় সে পিছু হটে না। এটি কোনো আবেগের কথা নয়, এটি কূটনীতির মূল ভিত্তি। সীমান্তে নতুন মৌসুম এসেছে। এই মৌসুমে প্রতিটি নীরবতার একটি মূল্য আছে এবং সেই মূল্য এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি।

লেখক : বিশ্লেষক ও প্রাবন্ধিক

/এসএকে
  বিষয়:   কাঁটাতার  কুমির  সীমান্ত  বাংলাদেশ  ভারত 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: