সড়ক প্রশস্তকরণে হুমকিতে কৃষিজমি

সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

সারাদেশ

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) চলমান সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প ব্যয়

2026-05-13T11:44:32+00:00
2026-05-13T11:44:32+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
সড়ক প্রশস্তকরণে হুমকিতে কৃষিজমি
সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ১১:৪৪ এএম 
কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে সড়ক নির্মাণ কাজে ব্যবহার। ছবি : সময়ের আলো
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) চলমান সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প ব্যয় কমাতে এবং দ্রুত কাজ শেষ করতে সড়কের দুই পাশের ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে সড়ক নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে একদিকে কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়ছে।

স্থানীয় কৃষক, সচেতন নাগরিক, পরিবেশকর্মী এবং কৃষি সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ— এই কাজের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে ‘প্রকল্পের অংশ’ বলছেন। এ নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।


এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ‘চট্টগ্রাম বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ (সিডিডব্লিউএসপি)’ প্রকল্পের আওতায় সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদ থেকে সাতকানিয়া রাস্তার মাথা পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ কোটি ৪৭ লাখ ৭৯ হাজার ৮০৭ টাকা। দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি পায় কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার গোহোষপাড়া এলাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বসুন্ধরা।

প্রকল্প অনুযায়ী সড়কটির বিদ্যমান ১২ ফুট প্রস্থ বাড়িয়ে ১৮ ফুটে উন্নীত করার কথা রয়েছে। ২০২৫ সালের জুন মাসে কাজ শুরু হয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কার্যাদেশ পাওয়ার কয়েক মাস পর প্রকৃত কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে সাতকানিয়া রাস্তার মাথা পর্যন্ত সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশের অনেক কৃষিজমি থেকে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও জমিতে ৫ থেকে ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে। এসব জমির অনেক অংশে চলতি মৌসুমে চাষাবাদ করা সম্ভব হয়নি।

কৃষকদের ভাষ্য, মাটি কাটার ফলে জমির উপরিভাগের উর্বর স্তর নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ধান, শাকসবজি কিংবা অন্যান্য ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এক্সকেভেটর দিয়ে মাটি কেটে সড়কের কাজে নেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জমির মালিকদের যথাযথ সম্মতি ছাড়াই মাটি কাটা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় কৃষক আবদুল হালিম বলেন, ‘আমার জমির একাংশ থেকে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। এখন সেখানে পানি জমে থাকে। আগের মতো চাষ করা যাচ্ছে না। আমরা গরিব মানুষ, প্রতিবাদ করলেও কেউ শোনে না।’

কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, টপসয়েল বা উপরিভাগের মাটি হচ্ছে জমির সবচেয়ে উর্বর অংশ। সাধারণত মাটির উপরিভাগের ৫ থেকে ১০ ইঞ্চি অংশকেই টপসয়েল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই স্তরে থাকে জৈব উপাদান, খনিজ, পুষ্টি এবং অণুজীব, যা ফসল উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘বৃষ্টি, পলি, উদ্ভিদের পচন এবং জৈব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই উর্বর স্তর তৈরি হয়। কিন্তু উন্নয়ন কাজের নামে যখন এই মাটি কেটে নেওয়া হয়, তখন জমির উৎপাদনক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘টপসয়েল হলো জমির সবচেয়ে উর্বর স্তর। এটি কেটে ফেললে জমির উৎপাদনক্ষমতা কমে যায়। তবে আমরা যতটুকু জেনেছি, সীমিত পরিসরে মাটি কাটা হচ্ছে। কোনও কৃষক লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখব।’

পরিবেশবিদদের মতে, টপসয়েল কাটা শুধু কৃষির জন্য নয়, পরিবেশের জন্যও বড় হুমকি। কারণ উপরিভাগের মাটি সরিয়ে নেওয়ার ফলে জমির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয়। এতে বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। এছাড়া মাটি ক্ষয়, ধস এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিও হতে পারে।

কাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বসুন্ধরার স্বত্বাধিকারী ফাগুন বড়ুয়া বলেন, ‘আমরা এই প্রকল্পের প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ করছি। এখানে কোনও লুকোচুরির প্রশ্নই আসে না। আপনারা চাইলে এ বিষয়ে এলজিইডি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’

স্থানীয়দের অভিযোগের তীর এখন এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে’র দিকে। তাদের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা পুরো কাজ তদারকি করলেও কৃষিজমির টপসয়েল কাটার বিষয়টি বন্ধে কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। বরং অনেকের মতে, তার নীরব সম্মতিতেই এ কাজ চলছে।

জানতে চাইলে এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে বলেন, ‘সড়কটি ১২ ফুট থেকে ১৮ ফুটে উন্নীত করা হচ্ছে। তাই পার্শ্ববর্তী কৃষি ও অনুর্বর জমি থেকে সীমিত পরিসরে মাটি কাটা হচ্ছে। এটি প্রকল্পের প্রাক্কলনে উল্লেখ আছে। এখানে নিয়মের বাইরে কোনও কাজ করা হয়নি।’

/মহু


  বিষয়:   চট্টগ্রাম  সাতকানিয়া  সড়ক  অভিযোগ  কৃষিজমি 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: