পাপ এক ভয়ংকর মরণঘাতী রোগ, যা মানুষের জীবনে ক্ষুদ্র বিন্দু হয়ে প্রবেশ করে এবং ধ্বংস ও বিনাশ সাধন করে বের হয়। মানুষের ভয়াবহ পাপকর্মগুলো শুরু হয় খুব সাধারণ একটি বিষয়ের মাধ্যমে, তা হচ্ছে ‘দৃষ্টিপাত’। দৃষ্টির মাধ্যমেই মানুষ পাপের জগতে পা বাড়ায়।
আসলে দয়াময় আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত এই দৃষ্টিশক্তি; যা স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য। দৃষ্টিহীন মানুষগুলোই উপলব্ধি করতে পারে দৃষ্টিশক্তির প্রয়োজনীয়তা। মহামূল্যবান এ নেয়ামতের সঠিক ব্যবহারের প্রতি আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আপনি ঈমানদার পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য রয়েছে পবিত্রতা। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত। আর আপনি ঈমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গ হেফাজত করে। তারা যেন সাধারণত প্রকাশমান অঙ্গ ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে।’ (সুরা নুর : ৩০-৩১)
উল্লিখিত আয়াতে দৃষ্টি সংযত ও যৌনাঙ্গ হেফাজতের ব্যাপারে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। কেননা দৃষ্টির মাধ্যমেই ব্যভিচার ও ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপকর্মের সূচনা হয়, আর এর পরিসমাপ্তি বা পূর্ণতা পায় যৌনাঙ্গের মাধ্যমে।
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) সহিহ মুসলিম থেকে একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন, হজরত জারির ইবনে আবদুল্লাহ বাজালি (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হঠাৎ কোনো নিষিদ্ধ বস্তুর ওপর দৃষ্টি পড়া সম্পর্কে জিগ্যেস করলাম। তিনি আমাকে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে ফেলতে নির্দেশ দিলেন। কারণ এর মাধ্যমেই সূচনা হয় পাপের জগতে প্রবেশ।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন তিন ধরনের চোখ ব্যতীত সব চোখ কাঁদবে- ১. যে চোখ হারাম বস্তু দেখা থেকে বিরত থাকে। ২. যে চোখ আল্লাহর রাস্তায় জাগ্রত থাকে। ৩. যে চোখ থেকে আল্লাহর ভয়ে অশ্রু নির্গত হয়; যদিও তা মাছির মাথা পরিমাণ হয় (দুররে মানসুর)। হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, কোনো মুসলমানের দৃষ্টি যদি রমণীর সৌন্দর্যের প্রতি পড়ে এবং সে আল্লাহর ভয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়, তা হলে সে ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে। (মুসনাদে আহমদ)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, মহান আল্লাহর বাণী, দৃষ্টি হলো শয়তানের বিষাক্ত তীরগুলো থেকে একটি তীর, যে ব্যক্তি আমাকে ভয় করে তা হেফাজত করবে, আমি তাকে এমন ঈমান দান করব যার মিষ্টতা সে নিজের হৃদয়ে অনুভব করতে পারবে (তাবারানি)।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলে আকরাম (সা.) ইরশাদ করেন, চোখের জিনা হলো দেখা। জিহ্বার জিনা বলা। কানের জিনা হলো শোনা। হাতের জিনা ধরা। পায়ের জিনা হাঁটা। অন্তর কামনা বা লালসা সৃষ্টি করে, আর যৌনাঙ্গ তা সত্য বা মিথ্যায় পরিণত করে (বুখারি ও মুসলিম)।
মোটকথা, আত্মশুদ্ধি অর্জন, চরিত্র গঠন ও মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে দৃষ্টি হেফাজতের গুরুত্ব অপরিসীম। পক্ষান্তরে ইভটিজিং, ধর্ষণ ও ব্যভিচারের মতো অপরাধের প্রথম ধাপ হলো কুদৃষ্টি। অতএব, দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ ব্যতীত গুনাহ থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।
বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের চোখকে হারাম বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত হতে বিরত রাখতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে পাপ হতে আত্মরক্ষা করতে পারবে না।
সময়ের আলো/জেডি